Published : 12 Jun 2026, 01:07 AM
নতুন অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে ‘অতি বেশি উচ্চাভিলাষী’ বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
তার মতে, টাকা আসবে কোথা থেকে, তা-ই সবচেয়ে ‘বড় প্রশ্ন’।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
এই বাজেট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে আহসান মনসুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উচ্চাভিলাষী। ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায় উচ্চাভিলাষী। বর্তমান অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনও উচ্চাভিলাষী। সব মিলিয়ে অতি বেশি উচ্চাভিলাষী বাজেটে দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।
“সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে—টাকা আসবে কোত্থেকে। সংকটের এই সময়ে রাজস্ব বাড়বে কীভাবে?”
সাবেক গভর্নর বলেন, “অর্থমন্ত্রী অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং বৈশ্বিক ও দেশীয় পরিস্থিতির মধ্যে এই বাজেট দিয়েছেন। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যগুলোর কারণে এটি একটি সম্প্রসারণমূলক রাজস্ব পরিকল্পনায় পরিণত হয়েছে, যার বাস্তবায়ন অত্যন্ত কঠিন হবে।”
তার মতে, এই বাজেট তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
“প্রথমত, বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কঠিন হবে, কারণ চলমান সংস্কারগুলোর সুফল আগামী তিন থেকে পাঁচ বছরের আগে বাস্তবে দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা কম।
“দ্বিতীয়ত, রাজস্ব আদায়ে যে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অতিরিক্ত আশাবাদী বা বাস্তবতার তুলনায় বেশি উচ্চাভিলাষী বলে মনে হয়।
“তৃতীয়ত, বাজেটের অর্থায়ন এখনও একটি উদ্বেগের বিষয়, কারণ ব্যাংকিং খাতের অবস্থা নাজুক এবং বিদেশি অর্থায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।”
গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের টানা দেড় দশকের শাসন অবসানের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের দায়িত্ব পান অর্থনীতিবিদ আহসান এইচ মনসুর। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ২৫ ফেব্রুয়ারি তাকে সরিয়ে মোস্তাকুর রহমানকে গভর্নর নিয়োগ দেওয়া হয়।
গত সাড়ে তিন মাস অনেকটা আড়ালেই ছিলেন সাবেক এই গভর্নর। বৃহস্পতিবার বাজেট দেওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে কথা বলেন তিনি।
আহসান মনসুর বলেন, “ব্যাংকিং ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে রয়েছে, এবং সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী তারল্য (লিকুইডিটি) পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
“ব্যাংকগুলো কীভাবে পর্যাপ্ত তহবিল সংগ্রহ করবে এবং সরকার শেষ পর্যন্ত অর্থের জোগান বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত মুদ্রা সৃষ্টি (টাকা ছাপানো) করবে কি না—এসব বিষয় নিয়ে এখনও প্রশ্ন রয়ে গেছে।”
প্রস্তাবিত বাজেটে বিদেশি ঋণের লক্ষ্য নিয়ে নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আহসান মনসুর।
তিনি বলেন, “বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিদেশি ঋণপ্রবাহ ২৫ শতাংশের মতো কমবে বলে মনে হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় নতুন বাজেটে ১ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকার বেশি বিদেশি ঋণ পাওয়ার লক্ষ্য অবাস্তব।”
“এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আইএমএফ এবং অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার কাছ থেকে ঋণ পাওয়া ক্রমেই আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।”
ব্যাংকিং খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “বাজেটে খাতটির সমস্যাগুলো যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে সেগুলোর সমাধানে সুস্পষ্ট ও নির্দিষ্ট সংস্কার উদ্যোগের অভাব রয়েছে।
“ব্যাংক রেজল্যুশন আইন প্রণয়ন এবং সুশাসন শক্তিশালী করার মতো প্রস্তাবগুলো ইতিবাচক হলেও এসব বাস্তবায়নের জন্য বাজেটে কোনো সুনির্দিষ্ট ‘রোডম্যাপ’ তুলে ধরা হয়নি।”
তার মতে, “শুধু বক্তব্য বা ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রকৃত ও কার্যকর সংস্কার এখনই শুরু করতে হবে, যদিও এর সুফল পেতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।”