Published : 14 Oct 2025, 02:15 PM
টানা ১৮ দিনের প্রচারণা শেষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ এবং হল সংসদ নির্বাচনের জন্য ব্যালট বাক্স পৌঁছে যাচ্ছে কেন্দ্রগুলোয়।
এছাড়া সংবাদকর্মীদের ভোটের খবর সংগ্রহের জন্য অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড এবং যানবাহনের পাস দেওয়াসহ শেষ মহূর্তের কাজ গুছিয়ে নিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নির্বাচন কমিশনের সদস্যরা। নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশ ও র্যাব সদসরা মোতায়েন আছেন ক্যাম্পাসে।
নির্বাচন কমিশন সচিব অধ্যাপক এ কে এম আরিফুল হক সিদ্দিকী জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকাল থেকে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ব্যালেট বাক্স পৌঁছানো হচ্ছে।
সাড়ে তিন দশক পর বুধবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ এবং হল সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত টানা ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ হাজার ৫১৬ শিক্ষার্থী ভোট দিয়ে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবেন। যেখানে ছাত্রী ভোটার প্রায় ১১ হাজার ৩২৯ জন।

বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, বাণিজ্য (বিবিএ), নতুন কলা ভবন, আইটি ভবনের ৬০টি কক্ষে প্রায় ৭০০ বুথে ভোট গ্রহণ অনুষ্টিত হবে।
এর পাশাপাশি দৃষ্টিহীনদের জন্য চাকসু ভবনের দ্বিতীয় তলায় ভোট কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। এ কেন্দ্রে শুধু দৃষ্টিহীন শিক্ষার্থীরা দুই নির্বাচন কমিশনারের তত্ত্বাবধানের তাদের পছন্দের প্রতিনিধি মনোনয়নে ভোট দেবেন।
বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও কেন্দ্রের রিটার্নিং কর্মকর্তা অধ্যাপক মো. আল আমীন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা বুথ স্থাপনসহ সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি। আমরা ব্যালট বক্স পেয়েছি। বুধবার ভোট শুরুর আগে ব্যালট পেপার কেন্দ্রে আসবে।”
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, ওএমআর ব্যালট শিটে শিক্ষার্থীরা ভোট দেবেন। চাকসুতে থাকছে চার পৃষ্ঠার এবং হল ও হোস্টেল সংসদের থাকছে এক পৃষ্ঠার ব্যালট।
নির্বাচন ঘিরে গেল দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে প্রচার-প্রচারণার হাঁকডাকে ক্যাম্পাস সরগরম থাকলেও এদিন ফাঁকা দেখা গেছে।
ভোট ঘিরে নিরাপত্তার জন্য ক্যাম্পাসে সাদা পোশাকে এবং পোশাক পরা মিলিয়ে শতাধিক র্যাব সদস্য অবস্থান নিয়েছেন। তারা চাকসু ভবন পরিদর্শন করেছেন এবং ক্যাম্পাসে টহল দিচ্ছেন। পাশাপাশি আছেন পুলিশ সদস্যরাও।

এদিন চাকসু ভবনে শেষ মুহুর্তের ব্যস্ততা চলছে। ভবনের নিচতলায় সংবাদকর্মীদের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড এবং যানবাহনের পাস দেওয়া হচ্ছে। চাকসু কার্যালয়ের দোতলায় থরে-থরে সাজিয়ে রাখা হয়েছে চাকসু এবং হল সংসদের ব্যালটবাক্স।
কলার ঝুপড়ি এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে নির্বাচন সংক্রান্ত শেষ মুহূর্তের শলাপরামর্শ সেরে নিচ্ছেন প্রার্থী এবং শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাইয়ান মোতাসিম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রচার-প্রচারণা শেষ। আমরা প্রথমবারের মত চাকসু ভোট দিতে যাচ্ছি। এটার উত্তেজনাটাই অন্যরকম। এখন শুধুই ভোটের অপেক্ষা।”
শিক্ষার্থী রিতু চাকমা বলেন, “আশা করছি এবার একটা স্বচ্ছ নির্বাচন হবে। শিক্ষার্থীরা ভোটের মাধ্যমে তাদের পছন্দের প্রার্থীদের ভোট দিতে পারবেন এবং নির্বাচিত করতে পারবেন।”
অন্ধ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্রেইল পেপার না দেওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছেন ছাত্র ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট সমর্থিত ‘দ্রোহ পর্ষদের’ সমাজসেবা ও পরিবেশ সম্পাদক প্রার্থী সোহেল রানা।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমরা প্রশাসনকে অনেক আগে থেকেই স্মারকলিপি দিয়ে এসেছি, যেন ব্রেইল পদ্ধতিতে ভোট দিতে পারি। ব্রেইল পেপার যেন আমাদের জন্য সরবরাহ করা হয়। প্রশাসন সেটি করতে পারেনি। তারা আগামী বছর সেটি করবে বলেছে। এটা হতাশাজনক। আমরা দ্বিধায় আছি আদৌ ভোট দিতে পারব কিনা।

“তারা আমাদের পরিবারের লোকদের সঙ্গে এনে ভোট দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। যেখানে দুজন কমিশনার উপস্থিত থাকবে। যেটা আদৌ সম্ভব না।”
১৯৭৩ সালের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী, প্রতি বছর ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা। যদিও ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এখন পর্যন্ত ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়েছে মাত্র ছয়বার।
বুধবার সপ্তমবারের মত এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
এর আগে চাকসুর সর্বশেষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৯০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি।
গেল ২৮ অগাস্ট চাকসু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। এরপর ১ সেপ্টেম্বর খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যাচাই-বাছাই শেষে ১১ সেপ্টেম্বর চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা হয়।
একই মাসের ১৪ তারিখ শুরু হয় মনোনয়ন পত্র বিতরণ; যা শেষ হয় ১৭ সেপ্টেম্বর। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে ২১ সেপ্টেম্বর প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা প্রকাশ করা হয়।

সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হয়। এরপর নির্বাচনের জন্য ১২ অক্টোবর দিন ঠিক করা হলেও পরে শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে সেটি পিছিয়ে ১৫ অক্টোবর করা হয়।
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর অনুষ্ঠেয় চাকসু নির্বাচনে মোটা দাগে ১৩টি প্যানেল থেকে সহ-সভাপতি পদে ২৪ জন, সাধারণ সম্পাদক পদে ২২ জন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে ২১ জন, খেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১২ জন, সহ খেলাধুলা ও ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১৪ জন, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ১৭ জন, সহ সাহিত্য সংস্কৃতি ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ১৫ জন, দপ্তর সম্পাদক পদে ১৭ জন, সহ দপ্তর সম্পাদক পদে ১৪ জন, ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক পদে ১৩ জন, সহ ছাত্রী কল্যাণ সম্পাদক পদে ১০ জন, বিজ্ঞান ও তথ্য প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ১১ জন, গবেষণা ও উদ্ভাবন সম্পাদক পদে ১২ জন, সমাজসেবা ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ২০ জন, স্বাস্থ্য সম্পাদক পদে ১৫ জন, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে ১৭ জন, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ১৬ জন, যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক পদে ১৭ জন, সহ যোগাযোগ ও আবাসন সম্পাদক পদে ১৪ জন, আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক পদে ৯ জন, পাঠাগার ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ২০ জন এবং পাঁচ নির্বাহী সদস্য পদের বিপরীতে প্রার্থী হয়েছেন ৮৫ জন।
আর, হল সংসদ নির্বাচনে ৯টি ছাত্র হলে ৩৫০ জন বিভিন্ন পদে লড়বেন। আর, পাঁচটি ছাত্রী হলে বিভিন্ন পদে লড়বেন ১২৩ জন। শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেলে বিভিন্ন পদে লড়বেন ২০ জন প্রার্থী।
যেভাবে দিতে হবে ভোট
* নির্ধারিত কেন্দ্রে প্রবেশের পর শিক্ষার্থীরা দায়িত্বরতদের পরিচয়পত্র দেখাবেন, ছবিযুক্ত ভোটর তালিকার সাথে মিলিয়ে দেখার পর নির্বাচনী কর্মকর্তা স্বাক্ষর করে মোট পাঁচটি ব্যালেট পেপার দেবেন।
• ১-৪ নম্বর ব্যালেট চাকসু এবং ৫ নম্বর ব্যালেট হল বা হোস্টেলের।
• ব্যালেট নিয়ে গোপন কক্ষে প্রবেশের পর নির্ধারিত কলম ব্যবহার করে পছন্দের প্রার্থীর পাশে সম্পূর্ণ বৃত্ত ভরাট করতে হবে।
• প্রতিটি পদের জন্য একটি করে বৃত্ত ভরাট করতে হবে।
• চাকসুর নির্বাহী সদস্য পদে পাঁচটি, হল সংসদের জন্য তিনটি করে ভোট প্রদান করা যাবে।
• ভোট কক্ষে ১,২,৩,৪ নম্বর লেখা এবং হলের নাম লেখা ব্যালেট বাক্স থাকবে।
• ভোট সম্পন্ন করার পর নম্বর অনুযায়ী বক্সে ব্যালেট পেপারগুলো ফেলতে হবে। যেমন-১ নম্বর ব্যালেট ১ নম্বর বক্সে, ৪ নম্বর ব্যালেট ৪ নম্বর বক্সে।
• হল সংসদের নাম লেখা বক্সে হলের ব্যালেটটি ফেলতে হবে।
কারা কোন কেন্দ্রে ভোট দেবেন
• আইটি ভবন: সোহরাওয়াদী হলের শিক্ষার্থীরা।
• নতুন কলা ভবন: শাহজালাল, এফ রহমান ও আলাওল হল।
• বিজ্ঞান অনুষদ ভবন: শাহ আমানত, মাস্টার দা সূয্য সেন হল।
• সমাজ বিজ্ঞান অনুষদ ভবন: নওয়াব ফয়েজুন্নেসা, শামসুন নাহার, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং অতীশ দীপঙ্কর হল।
• বাণিজ্য অনুষদ (বিবিএ) ভবন: প্রীতিলতা, বিজয় ২৪, শহীদ ফরহাদ হোসেন হল ও শিল্পী রশিদ চৌধুরী হোস্টেল