প্যান্ডোরা ক্রেডিট: অ্যাপভিত্তিক ঋণে প্রতারণার ফাঁদ

অ্যাপ ডাউনলোড করলেই বেহাত হয় ব্যক্তিগত তথ্য, তারপর সেই তথ্য ব্যবহার করে টাকার জন্য দেওয়া হয় চাপ।

উত্তম সেন গুপ্তবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Jan 2023, 07:01 PM
Updated : 13 Jan 2023, 07:01 PM

ফেইসবুকে বিজ্ঞাপন দেখে কৌতুহলী হয়েছিলেন শাকিল আহমেদ খান, অ্যাপ ডাউনলোড করে সহজ শর্তে ছোট ঋণের প্রস্তাব পেয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। এরপর এমএফস নম্বরে যখন টাকা চলে এল, তখন তিনি রীতিমত খুশি। কিন্তু এখন পস্তাতে হচ্ছে চট্টগ্রামের এই তরুণকে।   

সুদসহ সেই টাকা শোধ করার পর এখন তাকে আরও টাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে। মোবাইল ফোনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সেখান থেকে স্ত্রীর ছবি সরিয়ে তা ‘আপত্তিকর ভাবে এডিট’ করে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে হুমকি।

শাকিলের মত আরও অনেকেই অ্যাপ ভিত্তিক ঋণ সেবা প্যান্ডোরা ক্রেডিট (phandora credit) এর ফাঁদে পা দিয়ে এখন পুলিশের শরণাপন্ন হয়েছেন হয়রানি থেকে রেহাই পাওয়ার আশায়।

চট্টগ্রামে এ ধরনের কয়েকটি অভিযোগের তদন্ত করছে মহানগর পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের সাইবার ক্রাইম শাখা। ফাঁদে পা দিয়ে কেউ এ মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করলেই তার ব্যক্তিগত তথ্য চলে যাচ্ছে প্রতারকদের হাতে। এমনকি মেইল ও ফেইসবুক অ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণও প্রতারকরা পেয়ে যাচ্ছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করার জন্য বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় প্রস্তাব দেওয়া হয়। সেই ফাঁদে পা দিয়েই ভুক্তভোগীরা নিজেদের অজান্তে তাদের তথ্য দিয়ে দিচ্ছেন প্রতারকদের হাতে। বিদেশ থেকে এসব অ্যাপ পরিচালনা করা হয় বলে প্রতারকদের ধরাও কঠিন।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছে মূলত তরুণ বয়সীরা। তাদের সহজ শর্তে অল্প টাকা ঋণ দেওয়ার লোভ দেখিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে প্রতারকরা। আর তাদের চাহিদা মত টাকা পরিশোধ না করলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভিন্ন অপত্তিকর ছবি পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।”

ভুক্তভোগী শাকিল আহমেদ খান জানান, চার হাজার টাকা ঋণ নিয়ে পাঁচ হাজার টাকা পরিশোধ করেছেন তিনি। তারপরও তাকে আরও টাকার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

এ ঘটনায় তিনি গত ৩ জানুয়ারি হালিশহর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। বিষয়টি এখন তদন্ত করছে মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে শাকিল বলেন, প্যান্ডোরা ক্রেডিট অ্যাপের বিজ্ঞাপন তিনি দেখেছিলেন ফেইসবুকে। অ্যাপটি ইনস্টল করার সাথে সাথে কাস্টামার কেয়ার থেকে ফোন করে ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়।  

“এরপর তারা আমার নগদ অ্যাকাউন্ট নম্বরে ৭০০ টাকা পাঠিয়ে দেয়। কিছুদিন পর ফোন করে সেই টাকা শোধ করতে বলে। সুদসহ আমার নগদ নম্বরে এক হাজার ৪০৯ টাকা রাখতে বলে তারা। এরপর একটি লিংক পাঠিয়ে দিয়ে আমাকে সাবমিট অপশনে ক্লিক করতে বলে। সেটা করতেই অ্যাকাউন্ট থেকে সব টাকা কেটে নেওয়া হয়।”

পরে একইভাবে চার হাজার ২০ টাকা পাঠানো হয়েছে শাকিলকে। সুদসহ তিনি পরিশোধ করেছেন পাঁচ হাজার ৯ টাকা। কিন্তু এরপর আরও টাকার জন্য চাপ দিতে শুরু করে প্রতারকরা।  

“এক পর্যায়ে তারা আমার মোবাইল থেকে আমার এবং আমার স্ত্রীর বিভিন্ন ছবি সংগ্রহ করে সেগুলো ‘আপত্তিকর ভাবে এডিট’ করে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে শুরু করে। পাশাপাশি আমার আত্মীয়-স্বজনদের ফোন করে বিভিন্ন হুমকি দে্ওয়া শুরু করে।”

গত ২৭ ডিসেম্বর নগরীর পাঁচলাইশ থানায় একই ধরনের একটি অভিযোগ করেন এক নারী।

মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের এসআই সাইদুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ মোবাইল অ্যাপটি ডাউনলোড করার পরপরই মোবাইলে থাকা কন্ট্যাক্ট লিস্ট, ছবি, মেইল, ফেইসবুক আইডির তথ্য চলে যায় প্রতারকদের হাতে।

“তারা ভুক্তভোগীদের মোবাইল থেকে পাওয়া ব্যক্তিগত ছবি দিয়ে কিংবা ছবি এডিট করে স্বজনদের পাঠিয়ে বিব্রত করে।”

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, অ্যপটি ডাউনলোড করার পর প্রথম ক্লিকেই চলে যায় লোন আবেদনের অপশনে। সেখানে কিছু তথ্য চাওয়া হয়। সেগুলো দিলে তাদের প্রথমকে কিছু টাকা পাঠিয়ে প্রলুব্ধ করা হয়। পরে সে টাকা সুদসহ পরিশোধ করতে হয় ভুক্তভোগীদের। ওই টাকা পরিশোধ করলে দেওয়া হয় আরও টাকা। সেগুলো নিয়েই মূলত বিপদে পড়েন ভুক্তভোগীরা।

কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের এসআই রাসিব খান বলেন, “একটি অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে প্রতারকরা কল স্পুফিংয়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের কল করে। আবার টাকা পরিশোধের জন্য কোন মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টের নম্বরও তারা দেয় না। তারা একটি লিংক পাঠায়, সেখানে সাবমিট অপশনে ক্লিক করলে টাকা কেটে নেয়। এসব কারণে তাদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে উঠেছে।”

এই প্রতারকরা অ্যাপ ইনস্টলকারীদের ২০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত সহজশর্তে ঋণ দেওয়ার প্রলোভন দেখায় জানিয়ে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, “বিভিন্ন ধরনের অনলাইন প্রতারণার বিষয়ে তদন্ত করতে গিয়ে আমরা দেখছি, মূলত বিদেশ থেকেই কোনো চক্র এ ধরনের অ্যাপলিকেশনগুলো পরিচালনা করে। দেশে তাদের কিছু এজেন্ট থাকে, যাদের মাধ্যমে তারা দেশের ভুক্তভোগীদের সাথে যোগাযোগ করে বিভিন্ন ধরনের লোভনীয় অফার দেয়।”

‘প্যান্ডোরা ক্রেডিট’ মোবাইল অ্যাপলিকেশনটিও প্রতারণার জন্য এ ধরনের ‘দেশীয় এজেন্টদের’ ব্যবহার করছে বলে মনে করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা। তিনি বলেন, “আমরা তদন্ত শুরু করেছি। যারা এটি পরিচালনার সাথে জড়িত, তাদের খুঁজতে কাজ চলেছে।”

মূলত অসেচতনার কারণে মানুষ এ ধরনের প্রতারণার শিকার হচ্ছে মন্তব্য করে আসিফ মহিউদ্দিন বলেন, “প্রলোভনে পড়ে তারা বিভিন্ন লিংকে প্রবেশ করে। যার মাধ্যমে তাদের ফেইসবুক, মেইলসহ বিভিন্ন আইডি হ্যাকড হচ্ছে।”

ফেইসবুক, মেইল, হোয়াটস আপে কোনো অপরিচিত ব্যক্তি কিংবা মেইল থেকে কোনো লিংক এলে সেগুলোতে প্রবেশ না করার পরামর্শ দেন এই পুলিশ কর্মকর্তা। আর কেউ যদি ফাঁদে পা দিয়ে প্রতারণার শিকার হন, দ্বিধা না করে নিকটস্থ থানায় জিডি করে তা নিয়ে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সাথে যোগাযোগ করতে বলছেন তিনি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক