১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩ আশ্বিন ১৪৩৩

রাউজানে একের পর এক খুন, রাজনীতি নাকি ‘দখলবাজির’ দ্বন্দ্ব?

“পালিয়ে গেল মানে শেষ কথা না, আজ না হয় কাল গ্রেপ্তার হতে হবে,” বলেছেন পুলিশ সুপার।

রাউজানে একের পর এক খুন, রাজনীতি নাকি ‘দখলবাজির’ দ্বন্দ্ব?
চট্টগ্রামের রাউজানে শনিবার ভোররাতে গুলিতে নিহত কাউসার জামান বাবলুর মরদেহ হাসপাতাল থেকে দুপুরে বাড়ি আনা হয়। এ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে স্থানীয় লোকজন সড়ক আটকে বিক্ষোভ দেখান।

উত্তম সেন গুপ্ত

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Apr 2026, 09:46 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:31 PM

এক সময় চট্টগ্রামের ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ তকমা পাওয়া রাউজানে আবার একের পর এক খুনের ঘটনা ঘটছে। মাঝে দেড় দশক ‘শান্ত’ থাকলেও গেল প্রায় ২১ মাসে অন্তত ২৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর রোববার পর্যন্ত এ উপজেলায় খুন হওয়া ব্যক্তিদের ১৭ জনই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

সবশেষ রোববার রাতে উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের শমসের পাড়ায় নাছির উদ্দিন ও শনিবার ভোররাতে জঙ্গল রাউজান এলাকায় কাউসার জামান বাবলু নামে একজনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তারা দুইজনই যুবদলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে স্থানীয়দের বরাতে সেখানকার সাংবাদিকরা বলছেন।

এর আগে ২৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নের অলি মিয়ার হাটে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় ৪ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি আবদুল মজিদকে। 

আর ৫ জানুয়ারি বাড়ির কাছে মোটরসাইকেলে আসা কয়েকজন খুন করে যুবদল নেতা জানে আলম শিকদারকে।

হত্যাকাণ্ডের বাইরেও বিভিন্ন সময়ে মারামারি ও হামলায় বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এ উপজেলায়। 

খুনের ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয়েছে অন্তত ২০০ জনকে। বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আসামি গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও থামছে না খুন-খারাবি। 

স্থানীয় সাংবাদিক ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলেছেন, রাউজানের হত্যাকাণ্ডগুলো যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি আধিপত্য বিস্তার ও নিজ স্বার্থের দ্বন্দ্ব পরিণতি। পাহাড়ের মাটি কাটা ও ছড়া থেকে বালু উত্তোলন নিয়ে মূলত এই বিরোধ।

রাউজানে খুনোখুনি বন্ধে আইন-শৃঙ্খলা বহিনী বিশেষ অভিযান শুরু করেছিল, পুলিশ যার নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন ফর দ্য পিস অব রাউজান’। অভিযানে বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও মূল অপরাধীদের কেউ ধরা পড়েনি।

গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর রাউজানে বর্তমান সংসদ সদস্য গিয়াস উদ্দিন কাদের ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা গোলাম আকবর খোন্দকারের অনুসারীদের মধ্যে বেশ কয়েকবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছিল। 

গত বছরের ২৯ জুলাই দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর চট্টগ্রাম উত্তর জেলার আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। সেইসঙ্গে ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর পদ স্থগিত করেছিল বিএনপি। 

বিএনপির দুইপক্ষের সংঘর্ষ নিয়ে উত্তেজনা ছড়ালেও স্থানীয় সাংবাদিকরা বলছেন, গত জানুয়ারিতে গিয়াস উদ্দিন কাদেরের মনোনয়ন নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে রাউজানের রাজনীতি বিএনপির স্থানীয় সংসদ সদস্যের পক্ষে। বিরোধী পক্ষে যারা ছিলেন তারাও এখন সংসদ সদেস্যর পক্ষে কাজ করছেন। 

রাউজানে গেল বছর গোলাম আকবর খন্দোকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গোলাম আকবরের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

রাউজানে গেল বছর গোলাম আকবর খন্দোকার ও গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় গোলাম আকবরের গাড়ি ভাঙচুর করা হয়।

তারা বলছেন, ২০০৯ সাল থেকে রাউজানে হত্যাকাণ্ডসহ কিছু ঘটনা ঘটলেও তা এত ব্যাপক আকারে হয়নি। আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীর নিয়ন্ত্রণে ছিল পুরো এলাকা। যে কোনো কাজ তার ইশারা ছাড়া করা ‘সম্ভব ছিল না’। 

তখন বিএনপি নেতাকর্মীরা এলাকাছাড়া ছিলেন। যারা এলাকায় থাকতে পেরেছেন, তারা কোনো ধরনের দলীয় কার্যক্রম চালাতে পারতেন না।

অভ্যুত্থানে ক্ষমতার পালাবদলের পর রাউজানের চিত্র পাল্টে যায়। আবার শুরু হয় খুনোখুনি।

সেখানকার সাংবাদিকরা বলছেন, যারা খুন হয়েছেন তাদের বেশিরভাগই এলাকায় ‘আধিপত্য বিস্তার’ করার চেষ্টা করেছিলেন। আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপির লোকজন এলাকায় থাকতে পারেননি। এখন তারা ফিরে এসে আধিপত্য বিস্তারে মরিয়া হয়ে উঠেছেন, যে কারণে খুন-খারাবি বেড়ে গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ভৌগলিক পরিবেশের কারণেই এলাকাটি অপরাধপ্রবণ। এ ধরনের ঘটনা সেখানে নতুন কিছু না। অপরাধ করে পালানোর সুযোগও একটি বিষয়।” 

তিনি মনে করেন, রাউজানে যারা খুন হচ্ছেন তাদের অতীত কর্মকাণ্ডও ভালো ছিল না। মূলত ‘ব্যবসার দ্বন্দ্ব’ নিয়ে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। 

গত বছরের ২২ এপ্রিল রাউজান উপজেলার গাজীর পাড়া এলাকায় অটোরিকশা স্টেশনে প্রকাশ্যে গুলি করে খুন করা হয় মো. ইব্রাহীম নামে এক যুবদল কর্মীকে। 

৬ জুলাই কদলপুর ইউনিয়নে একটি দোকানে বসে গল্প করার সময় বোরকা পড়ে এসে সন্ত্রাসীরা সেলিম নামে এক যুবককে গুলি করে পালিয়ে যায়। 

২৫ অক্টোবর বিকালে রাউজান পৌর সদরের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে রাশিদার পাড়া এলাকায় কবরস্থানে ওঁৎ পেতে থাকা কিছু লোকের গুলিতে খুন হয় আলমগীর ওরফে আলম নামে এক যুবদল কর্মী। তারা আলমকে খুন করে মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়। 

আলমগীরকে ‘যুবদলের নেতা‘ দাবি করে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক সংসদ সদস্য গোলাম আকবর খোন্দকার।

তার পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “আলমগীর আওয়ামী লীগের শাসনামলে ১২ বছর কারাগারে ছিলেন। সম্প্রতি তিনি কারাগার থেকে ছাড়া পান।”

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার চালিতাতলী পূর্ব মসজিদের কাছে গত বছর বিএনপি প্রার্থীর জনসংযোগের সময় সরোয়ার হত্যাকাণ্ড ঘটে।

চট্টগ্রাম নগরীর বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার চালিতাতলী পূর্ব মসজিদের কাছে গত বছর বিএনপি প্রার্থীর জনসংযোগের সময় সরোয়ার হত্যাকাণ্ড ঘটে।

এ তিনটি খুনের পরে আলোচনায় আসে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী রায়হানের নাম। চট্টগ্রামে জোড়া খুনসহ বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আলোচনায় আসেন তিনি। চট্টগ্রামে সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলারও অন্যতম আসামি রায়হান। বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডে রায়হানের নাম এলেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিদেশে বসে চট্টগ্রামের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করা সাজ্জাদ হোসেন ওরফে বড় সাজ্জাদের অন্যতম অনুসারী রায়হান। 

রাউজানে হত্যাকাণ্ডগুলোর প্রত্যেকটি আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। তাদের মতে, বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা নিয়েই মূলত বিরোধ এখানে।

সোমবার চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার নাজির আহমেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, “রাউজানের কিছু হত্যকাণ্ড আধিপত্য বিস্তার নিয়ে, আর কিছু বালুর মহল নিয়ে। তবে অপরাধ যে কারণেই হোক না কেন সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে।” 

পুলিশ সুপার বলেন, “পালিয়ে গেল মানে শেষ কথা না, আজ না হয় কাল গ্রেপ্তার হতে হবে। রাউজানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন আছে। সেখানে অভিযান চলমান আছে।” 

গত নভেম্বরে এক সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. সাইফুল ইসলাম সানতু বলেছিলেন, “অপরাধ বিশ্লেষণ করে দেখেছি, রাউজানে ছয়টির মত গ্রুপ বর্তমানে বিভিন্ন ধরণের কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত হচ্ছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ‘টার্গেট কিলার’ বা ভাড়াটে খুনি হিসেবে কাজ করে।

“তারা যদি পরবর্তীতে আবারো কোনো অপরাধ সংঘটন করতে যায়, আমরা সর্বোচ্চ কঠোর অবস্থানে যাব। রাউজানসহ চট্টগ্রামে হয় সন্ত্রাসী থাকবে, না হয় পুলিশ থাকবে। জনগণের নিরাপত্তা যারা ভঙ্গ করবে তাদের আমরা থাকতে দিব না।”

সচেতন নাগরিক কমিটি চট্টগ্রামের সভাপতি প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার মনে করেন, রাউজানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর ইচ্ছাশক্তির বিষয়। 

“আমাদের রাষ্ট্রের একটা ‘ম্যানেজ থেরাপি’ কারণে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী নিষ্ক্রিয় হয়ে থাকে।”

তিনি বলেন, “রাউজানের সাধারণ মানুষ উন্নত সংস্কৃতিমনা ও শান্তি প্রিয়। কিন্তু রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে দীর্ঘদিন সন্ত্রাসের জনপদ হয়ে উঠেছিল।” 

গেল বছর রাউজানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করে। কিন্তু ওই এলাকায় থামছে না খুনোখুনি।

গেল বছর রাউজানে পুলিশ অভিযান চালিয়ে বেশকিছু অস্ত্র উদ্ধার করে। কিন্তু ওই এলাকায় থামছে না খুনোখুনি।

নব্বইয়ের দশকে রাউজানে  দুই ভাই টিটু-মিঠু হত্যাকাণ্ড, ছাত্রলীগ নেতা ইকবাল ও জামিল হত্যাকাণ্ড, তার আগে ১৯৮৯ সালে উত্তর জেলা ছাত্রলীগ নেতা ফখরুদ্দীন মো. বাবর ও রাউজান কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি মজিবুর রহমান খুনের ঘটনা সারাদেশে আলোচিত ছিল। 

সেসব হত্যাকাণ্ডের কথা তুলে ধরে দেলোয়ার মজুমদার বলেন, এরপর আর তেমন বড় কোনো ঘটনা সেখানে ঘটেনি। কিন্তু দীর্ঘদিন একক রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও আধিপত্যের কারণে মানুষ নিষ্পেষিত ছিল। 

তার মতে, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের কারণে দলের ভেতর ও দলগুলোর মধ্যে কোন্দল হয়ে থাকে। রাউজানে একক দুর্বৃত্তায়নের (আওয়ামী লীগের সময়) অবসানের পর সেখানে অনেকেই ফিরতে শুরু করেছেন। এ কারণে আবার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে। 

স্থানীয় একাধিক সাংবাদিক বলেন, রাজনীতির বিরোধের জেরে মারামারি ও গুলি ছোড়ার মতো ঘটনা হয়েছে বেশি। কিন্তু রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত থাকা যে ১৭ জন রাউজানে খুন হয়েছেন, তাদের মধ্যে তিন থেকে চারজন রাজনৈতিক কারণে খুন হয়ে থাকতে পারেন। বাকি প্রত্যেকেই আধিপত্য বিস্তার নিয়ে প্রতিপক্ষের হামলায় নিহত হয়েছেন।

তারা বলছেন, গেল বছরের ৬ জুলাই কদলপুর ইউনিয়নে যুবদল নেতা মুহাম্মদ সেলিম উদ্দিনকে হত্যা করা হয়। একটি অটোরিকশায় আসা হত্যাকারীদের মধ্যে দুইজন ছিলেন বোরকা পরা। রোববার রাতে খুন হওয়া নাছির সেই হত্যা মামলার আসামি ছিলেন। তাদের মধ্যে বালু উত্তোলন, মাটি কাটা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ ছিল। 

নাছির হত্যাকাণ্ডের পর পুলিশও বলেছিল, তিনি হত্যাসহ ছয়টি মামলার আসমি ছিলেন।

রাউজান থানার ওসি সাজেদুল ইসলাম বলেন, “প্রত্যেকটি ঘটনায় মামলা হয়েছে। আমরা সেগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছি। সবশেষ দুইটি হত্যাকাণ্ডের পরপরই আমরা অভিযান করে পাঁচজনকে ধরেছি।” 

কয়টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে? জবাবে ওসি বলেন, “বেশকিছু মামলা, সেগুলো দেখে বলতে হবে, কোন মামলায় কতটুকু অগ্রগতি হয়েছে।”

আগের খবর:

চট্টগ্রামে এত খুনোখুনি কেন?

রাউজানে 'টার্গেট কিলিংয়ে' যুক্ত ছয়টি গ্রুপ: পুলিশ

রাউজানকে 'সন্ত্রাসমুক্ত' করতে বিশেষ অভিযানে পুলিশ

রাউজানে যুবদল কর্মীকে গুলি করে হত্যা

তিন দিনের ব্যবধানে রাউজানে ফের খুন, এবার যুবদলকর্মী

'ভাড়াটে খুনি' দিয়ে রাউজানে ব্যবসায়ীকে হত্যা, বলছে পুলিশ