২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

কর্ণফুলীর চরে পাখিদের রাজ্যে বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব

চর বাকলিয়ায় বর্জ্য থেকে বিদ্যুতের প্ল্যান্ট করলে কর্ণফুলী নদী ‘মারাত্মক হুমকিতে পড়বে’ এবং চরের উদ্ভিদ ও জীব বৈচিত্র্য ‘ধ্বংস হয়ে যাবে’ বলে পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা।

কর্ণফুলীর চরে পাখিদের রাজ্যে বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব

চর বাকলিয়াতে চরে বেড়ায় শত শত মহিষ। নদীর তীর ঘেষে খাবারের খুঁজে উড়ে বেড়ায় গো-বক, সাদা বক, কালো মাথা কাস্তে চরা ও কয়েক প্রজাতির মাছরাঙা।

মিঠুন চৌধুরী মিঠুন চৌধুরী

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 16 Apr 2024, 01:41 AM

Updated : 16 Apr 2024, 10:27 AM

কর্ণফুলী নদীর মাঝখানে শত বছর ধরে তিলে তিলে জেগে ওঠা চর বাকলিয়ার জংলা বনে গড়ে উঠেছে হাজারো পাখির অভয়ারণ্য। সেই চরের একটি অংশে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্ল্যান্ট করতে চায় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, যা ভয় জাগাচ্ছে পরিবেশবাদীদের মনে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বলছেন, ওই চরে বিদ্যুৎ প্ল্যান্টটি নির্মাণ করবে একটি চীনা কোম্পানি। আর সিটি করপোরেশন জমি দেবে এবং বর্জ্য সরবরাহ করবে।

সেজন্য ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে ওই চরের ৩৫ একর জমি বরাদ্দ চেয়েছে সিটি করপোশেন। তবে ভূমি মন্ত্রণালয় এখনও সিদ্ধান্ত জানায়নি।

পরিবেশবাদীরা বলছেন, মানুষের বসতিহীন ওই চরে রয়েছে ১৫৫ প্রজাতির উদ্ভিদ; যার মধ্যে ১১৩টি ওষুধি প্রজাতির। হাজার হাজার গাছে ঘেরা এই চর হয়ে উঠেছে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়।

সেখানে আছে বিপন্ন প্রজাতির কালো মাথা কাস্তেচরা, লাল লতিকা হট্টিটি, সাদা বক, গো-বক, কয়েক প্রজাতির মাছরাঙার মত নানা প্রজাতির পাখি। মৌসুমে অনেক অতিথি পাখিও আসে। স্থানীয়রা প্রতিদিন চড়ানোর জন্য চরে নিয়ে যান শত শত মহিষ।

সেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট করলে কর্ণফুলী নদী ‘মারাত্মক হুমকিতে পড়বে’ এবং চরের উদ্ভিদ ও জীব বৈচিত্র্য ‘ধ্বংস হয়ে যাবে’ বলে পরিবেশবাদীদের আশঙ্কা। সে কারণে তারা প্রকল্পটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছেন।  

আন্দোলনকারীরা বলছেন, চট্টগ্রামের মূল ভূখণ্ড থেকে বার্জে করে চরে বর্জ্য পরিবহন করতে গিয়ে যদি তা নদীতে ছড়ায়, তাহলে উজানের হালদা নদীও দূষণের কবলে পড়বে। তাতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রধান কার্প জাতীয় মাছের এই প্রাকৃতিক প্রজনন কেন্দ্রও ক্ষতির মুখে পড়বে।

Image

কর্ণফুলী নদীর মাঝে জেগে ওঠা চর। আউটার রিং রোড-২ থেকে চরটি খালি চোখে দেখা যায়। চরের পাশে নদীতে অসংখ্য লাইটার জাহাজ চলাচল ও অবস্থান করে।

ওই চরে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিলের আহ্বান জানিয়ে আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছেন। সেই সঙ্গে কর্ণফুলী তীরে বিলুপ্তির হুমকিতে থাকা ৮১ প্রজাতির উদ্ভিদ রক্ষায় প্রকল্প গ্রহণ এবং চর ঘিরে ইকো ট্যুরিজম প্রকল্প নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলছেন, ওই স্মারকলিপি প্রধানমন্ত্রীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এরপর সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

নদীর বুকে এক চর

বাংলাদেশের সমুদ্র-বাণিজ্যের কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর এই কর্ণফুলীরই তীরে। বঙ্গোপসাগরের মোহনার অদূরে নদীতে যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর, তার উজানে রয়েছে শাহ আমানত সেতু; যা তৃতীয় কর্ণফুলী সেতু নামে পরিচিত। 

এই সেতুর উজানে কালুরঘাট এলাকায় প্রথম কর্ণফুলী সেতু, যেটি কালুরঘাট সেতু নামেই পরিচিত। প্রায় একশ বছর আগে ওই সেতু স্থাপনের পর থেকে শাহ আমানত সেতু ও কালুরঘাট সেতুর মাঝের অংশে নদীর বুকে চর জাগতে শুরু করে।

Image

চর বাকলিয়ায় দেখা যায় লাল লতিকা হট্টিটি ও সাদা বক।

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, শাহ আমানত সেতু থেকে আনুমানিক দেড় কিলোমিটার উজানে নদীর মাঝখানে চর বাকলিয়া। ১৯৩০ সালে, অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলে কালুরঘাট সেতু নির্মাণের কারণে পলি জমে ধীরে ধীরে নদীর মাঝখানে এই চর জেগে ওঠে।

সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ চরের পশ্চিম দক্ষিণ পাশে কিছুটা খনন করেছে। চরের মোট আয়তন প্রায় ১০৫ একর বলে স্থানীয়দের অনুমান। বর্তমানে চরটি সরকারি ১ নম্বর খাস খতিয়ানে ভুক্ত।

এই চরে বর্জ্য শোধণাগার করতে ২০২৩ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (সিসিসি) অনুকূলে খাসজমি দীর্ঘ মেয়াদে বন্দোবস্ত দিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে একটি আবেদন করা হয়।

কর্ণফুলী নদীর উত্তর পাড়ে শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্মাণাধীন দ্বিতীয় আউটার রিং রোড প্রকল্পের কাজ চলছে।

এই সড়ক ধরে কালুরঘাটের দিকে এগিয়ে ‘চট্টগ্রাম সৎসঙ্গ বিহার’ সংলগ্ন অংশে দাঁড়ালে খালি চোখে নদীর বুকে জেগে ওঠা চরটি দেখা যায়। নদীর ধার ধরে এগিয়ে গেলে পূর্ব বাকলিয়ার শেষ সীমা পর্যন্ত নদী তীর থেকে দেখা যায় চরটি।

আর নদীর দক্ষিণ তীরে পটিয়া উপজেলার লাখেরা থেকে শুরু করে বোয়ালখালী উপজেলার চর খিজিরপুর অংশ পর্যন্ত অংশে নদী বক্ষে চর বাকলিয়ার বিস্তার। চরটির আকৃতি অনেকটা লেজওয়ালা ঘুড়ির মত। নদীতে যেখানে চর জেগেছে, সেখানে নদীর প্রস্থ আশপাশের ‍তুলনায় কমে প্রায় অর্ধেক হয়েছে।  

চরের মাঝের অংশে গাছপালা বেশি। বেশকিছু জায়গায় ঘন জঙ্গলের আকার ধারণ করেছে। কোথাও কোথাও আবার ঝোপের দেখা মেলে। নদীর তীর ঘেষা অংশে গাছপালা তুলনামূলক কম। শেষ বিকেলে গাছে গাছে হাজার হাজার পাখির দেখা মেলে।

Image

চর বাকলিয়ায় ২০২২ সালে উদ্ভিদ সমীকা করে ইকো নামের একটি বেসরকারি সংস্থা।

এক চরে ১৫৫ প্রজাতির উদ্ভিদ

বেসরকারি উন্নয়ন ও গবেষণা সংস্থা- ইফেক্টিভ ক্রিয়েশন অন হিউম্যান ওপিনিয়ন (ইকো) ২০২২ সালে তাদের একটি গবেষণায় চর বাকলিয়ার উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের তথ্য তুলে ধরে।

গবেষণায় নেতৃত্বদানকারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, চর বাকলিয়ায় মোট ১৫৫ প্রজাতির উদ্ভিদ শনাক্ত করেছিলেন তারা। এর মধ্যে ৬৪ প্রজাতির বৃক্ষ, ২০ প্রজাতির বিরুৎ, ৫৭ প্রজাতির গুল্ম, ১২ প্রজাতির লতানো উদ্ভিদ ও পরাশ্রয়ী উদ্ভিদ ২ প্রজাতির।

“১৫৫ প্রজাতির মধ্যে ১১৩টি প্রজাতিই ওষুধি। চরের আশেপাশের স্থানীয়রা প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এইসব ওষুধি গাছের উপর অনেকটা নির্ভরশীল। কারণ দিন দিন লোকালয় থেকে অনেক উদ্ভিদই হারিয়ে যাচ্ছে।”

নিরবচ্ছিন্নভাবে এই চরের গাছপালাকে বাড়তে দিলে এটি ওষুধি গাছের এক সুবিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হবে বলে মনে করেন মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল। 

এই চরে গাছপালার মধ্যে- পাহাড়ি শিমুল, বেগুণি হুরহুরি, প্রাজাসেন্ট্রা, হরগোজা, ভূঁই উকড়া, ঝুমকো লতা, আকন্দ, স্বর্ণলতা, ঘাগড়া, শিয়াল কাঁটা, শিরিষসহ নানা প্রজাতির উদ্ভিদ আছে। এছাড়া দেশীয় আম, জাম, কাঁঠাল, নারিকেলসহ নানা রকমের ফলজ গাছও আছে।

Image

কর্ণফুলী নদীর মাঝে জেগে ওঠা চর। আউটার রিং রোড-২ থেকে চরটি খালি চোখে দেখা যায়। চরের পাশে নদীতে অসংখ্য লাইটার জাহাজ চলাচল ও অবস্থান করে।

চরে গবেষণার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে ড. মোহাম্মদ ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “মনুষ্যসৃষ্ট দূষণে প্রতিনিয়ত একটু একটু করে হত্য করা হচ্ছে চট্টগ্রামের প্রাণ কর্ণফুলী নদীকে। শিল্প-কারখানাসহ নানাবিধ উৎসের বর্জ্যের ভাগারে পরিণত হয়েছে কর্ণফুলী। যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে জনজীবন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের উপর।

“কিন্তু বিপরীতে নদীর উজানে এত বিশাল জায়গা জুড়ে জেগে উঠা চর বাকলিয়া জীববৈচিত্র্যের জন্য যেন আশীর্বাদ। প্রাকৃতিকভাবে জেগে উঠা সবুজে ঘেরা এ চর- মনুষ্যসৃষ্ট দূষণের বিপরীতে নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় যেন প্রকৃতির এক নীরব প্রতিবাদ।”

এই চরে নদীর তীর ঘেষা অংশে দেখা মেলে হরেক রকম মাছরাঙার। আছে কাঠবিড়ালি এবং নানা রকম পাখি।

মাছের খোঁজে আসা বিপন্ন প্রজাতির কালো মাথা কাস্তেচরা, লাল লতিকা হট্টিটি, সাদা বক, গো-বকসহ নানা প্রজাতি পাখি বাসা বেঁধেছে চরের বড় গাছে। শীতে আসে অতিথি পাখিরা। চরটিতে শীতের দিনে অনেকে নৌকা নিয়ে বেড়াতেও আসে।

প্রাণ-প্রাচুর্য্যের চরে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ?

বন্দর নগরীতে সংগৃহীত বর্জ্য হালিশহরের আনন্দবাজার এবং বায়েজিদের আরেফিন নগর এলাকায় সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত দুটি খোলা স্থানে ফেলা হয়। এরমধ্যে আনন্দবাজারে ১৫ একর এবং আরেফিন নগরে ১৯ একর জমি আছে সিটি করপোরেশনের। দুটি ল্যান্ডফিলেই জমি এখন প্রায় শেষের পথে।

২০২২ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চট্টগ্রামে বর্জ্য বিষয়ক একটি সমীক্ষা পরিচালিত হয়। সমীক্ষার তথ্য অনুসারে, নগরীতে প্রতিদিন আনুমানিক ২১০০ টন বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার ৬৮ শতাংশই গৃহস্থালী।

Image

চর বাকলিয়ায় আছে ১৫৫ প্রজাতির উদ্ভিদ। এরমধ্যে ১১৩ প্রজাতিই ওষুধি।

এরমধ্যে ৮০ শতাংশ বর্জ্য সিটি করপোরেশন সংগ্রহ করতে পারে। বাকি ২০ শতাংশ বর্জ্য নগরীর নালা, খাল হয়ে নদীতে পড়ে।

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ২০১৯ সাল থেকে বেশ কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। বেশ কয়েকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান এমন প্রকল্পে তাদের আগ্রহের কথা জানিয়ে সিটি করপোরেশনের কাছে জমিও চেয়েছে।

এরপর বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সাথে সমঝোতা স্মারকও সাক্ষর করে সিটি করপোরেশন। কিন্তু প্রয়োজনীয় জমি দিতে না পারায় সেসব উদ্যোগ থমকে যায়।

তারপর গত বছর বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানির পাঁচটি প্রস্তাব স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠায় সিটি করপোরেশন।

এরমধ্যে চীনা কোম্পানি সেভিয়া-চেক-অর্চাড জেভি (CEVIA-CHEC-ORCHARD JV) কর্ণফুলীর বুকে জেগে ওঠা চর বাকলিয়াতে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রস্তাব দেয়।

জানতে চাইলে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ মুহম্মদ তৌহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের কাছে পাঁচটি প্রস্তাব এসেছিল। সেগুলো আমরা মন্ত্রণালয়ের পাঠিয়ে দিই। এরপর এই প্রস্তাবটির বিষয়ে উদ্যোগ নিতে বলা হয়।”

এরপর সিটি করপোরেশন ওই প্রকল্পের জন্য ৩৫ একর জমি চেয়ে গত বছর ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে। সেই চিঠি পেয়ে চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার বন্দর মৌজার বিএস ১ নম্বর খতিয়ানের ৫৪৪ দাগের পতিত শ্রেণির এই জমির বিষয়ে বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) গত বছর জুলাইয়ে জেলা প্রশাসনকে একটি প্রতিবেদন দেয়।

ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার পক্ষ থেকে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে গত বছরের ২৩ জুলাই একটি চিঠি দেওয়া হয়।

চিঠিতে বলা হয়, “বোয়ালখালীর সহকারী কমিশনারের (ভূমি) প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায় ওই ৩৫ একর জমি একটি বিচ্ছিন্ন চর। চরে চলাচলের কোনো রাস্তা নেই। মূল ভাগের সাথে ব্রিজ নির্মাণ করে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব নয় মর্মে প্রতীয়মান হয়।

“CEVIA-CHEC-ORCHARD JV প্রতিষ্ঠানের সাথে মৌখিক আলাপে জানা যায়, ওই সংস্থা বার্জ শিপের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীর মাধ্যমে প্রকল্প এলাকায় বর্জ্য পরিবহন করবে।”

চিঠিতে এই পরিস্থিতি উল্লেখ করে- ওই চরে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা, বার্জের মাধ্যমে বর্জ্য পরিবহনে পরিবেশগত সমস্যাসহ অন্য সমস্যা রয়েছে কিনা এবং চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অনাপত্তি রয়েছে কিনা তা জানাতে বলা হয় সিটি করপোরেশনকে।  

Image

চর বাকলিয়ায় লাল লতিকা হট্টিটি।

এর পরের অগ্রগতি জানতে চাইলে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রকল্প প্রস্তাব অনুসারে আমরা বর্জ্য সরবরাহ করব এবং জমি দেব। ওই চীনা প্রতিষ্ঠান বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা পিডিবিকে বিক্রি করবে। আমরা জমি বরাদ্দ চেয়েছি। এখনো পাইনি। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।”

এ প্রকল্প নিয়ে আপত্তি জানিয়ে কর্ণফুলী গবেষক অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইদ্রিস আলী বিডনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নদী ভরাট হয়ে জেগে ওঠা চরটি কর্ণফুলীকে দুই ভাগ করেছে। উন্নয়নের নাম দিয়ে এই চর বা দ্বীপে বিষাক্ত বর্জ্য শোধনাগার স্থাপনের পরিকল্পনা হবে আত্মঘাতী। যা কর্ণফুলীকে হত্যা করবে।”

আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ওমর ফারুক রাসেল বলেন, “নদীর মাঝে জেগে ওঠা চরটির দুই প্রান্তের বিভিন্ন অংশ এখনো জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যায়। আবার ভেসে ওঠে। চরে কোনো অবকাঠামো করা হলে চরের স্থায়ীত্বও নষ্ট হতে পারে।

“প্রকল্প হলে নদীর দূষণ হবে ব্যাপক। চরের উদ্ভিদ নষ্ট হবে। গাছের উপর নির্ভরশীল পাখি, পোকামাকড় ও অন্যান্য জীবজন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হবে। চরের পুরো ইকোসিস্টেম নষ্ট হবে। এমনকি উজানে হালদার মুখ। জোয়ারের সময় সেখানেও বর্জ্য চলে যেতে পারে।” 

Image

চর বাকলিয়ায় ২০২২ সালে উদ্ভিদ সমীকা করে ইকো নামের একটি বেসরকারি সংস্থা।

আন্দোলনে পরিবেশবাদীরা

এ প্রকল্প বাতিলের দাবিতে ছয়টি সংগঠনের মোর্চা ‘কর্ণফুলী রক্ষায় জনগণের প্রতিবাদ মঞ্চ’ গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে আন্দোলন শুরু করেছে।

২৪ মার্চ চরে করা সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ মঞ্চের আহ্বায়ক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মাহফুজুর রহমান সিটি মেয়রের উদ্দেশে বলেন, “জনগণের দাবি মেনে বর্জ্য শোধনাগার প্রকল্প স্থাপন বন্ধ করুন। মেয়র সাহেব আমাদেরকে বাধ্য করবেন না।

“মুক্তিযোদ্ধা, যুব সমাজ সাম্পান মাঝিরা লাঠি বৈঠা নিয়ে আপনার কার্যালয় ঘেরাও করবে। দেশকে ধ্বংস করে কার স্বার্থে কিসের এই প্রকল্প?”

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি সাংবাদিক চৌধুরী ফরিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “চট্টগ্রাম শহরে বর্জ্য পরিশোধন করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রয়োজন আছে সেটা সত্য। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সেজন্য নদীর মাঝে একটা শতবর্ষী চর ধ্বংস করে সেটা করতে হবে। এটা নগরীর উপকণ্ঠে কোনো এলাকায় করা হোক। 

“কর্ণফুলী নদী হল বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকা শক্তি। নানা কারণে নদী এমনিতে বিপর্যস্ত। বার্জে করে প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্য চরে নিলে তার কত শতাংশ নদীতে পড়বে? ওই চরের জীব বৈচিত্র্য আর থাকবে না।”

চট্টগ্রাম নদী ও খাল রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক আলিউর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফার ডটকমকে বলেন, “২০১৯ সালে হাই কোর্ট নদীকে জীবন্ত সত্তা ঘোষণা করেছে। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ (ক) অনুসারে পরিবেশ সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীব বৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার বাধ্যবাধতা আছে। সে হিসেবে নদীর মাঝে জেগে ওঠা চরে বর্জ্য শোধন প্রকল্প অবৈধ।”

২০২২ সালে বেসরকারি সংস্থা ইকো’র গবেষণার ফলাফল উদ্ধৃত করে আলিউর রহমান বলেন, কর্ণফুলী নদীর তীরে এবং চর বাকলিয়া মিলিয়ে যে ৫২৮ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া গিয়েছিল তার মধ্যে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে আছে ৮১ প্রজাতির উদ্ভিদ।

“চরে অবিলম্বে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে এসব বিলুপ্ত প্রায় উদ্ভিদ প্রজাতি সংগ্রহ করে তা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহার করে চরে এটি ইকো ট্যুরিস্ট স্পট গড়ে তোলা হোক।”

২৪ এপ্রিলের মধ্যে চর বাকলিয়ায় ওই প্রকল্প বাতিল ঘোষণা না করলে সিটি করপোরেশন ঘেরাও কর্মসূচি এবং প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে হুশিয়ার করেন আলিউর রহমান।

Image

চর বাকলিয়ায় নদীর তীর ঘেষে খাবারের খুঁজে উড়ে বেড়ায় গো-বক, সাদা বক, কালো মাথা কাস্তে চরা ও কয়েক প্রজাতির মাছরাঙা।

সবশেষ গত সপ্তাহে জেলা প্রশাসকের কাছে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে স্মারকলিপি দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাশার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কিছু প্রশ্ন আছে। পরিবেশবাদীরা মানববন্ধন করেছেন। আমাকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। স্মারকলিপিটি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে পাঠাব।

“পরে সরকার এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে এখন আমার মন্তব্য করার কোনো সুযোগ নেই।”

ওই চরে বিদ্যুৎ প্রকল্পের বিরোধিতায় যে আন্দোলন গড়ে উঠেছে, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, “আন্দোলনের বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। শহরে আসলে জমির সংকট আছে। আগেও কয়েকবার উদ্যোগ নিয়ে জমির ব্যবস্থা না হওয়ায় করা সম্ভব হয়নি।

“এখানে (চর বাকলিয়া) না হলে অন্য কোথাও করতে হবে। এ বিষয়ে এখনো অনেক কিছু বাকি। এখনই চূড়ান্ত কিছু বলতে পারছি না।”