Published : 01 May 2026, 08:50 AM
চট্টগ্রাম নগরীর মেহেদীবাগ এলাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে আয়ার কাজ করা অঞ্জলি আইচ প্রতিদিন আট ঘণ্টা কাজের বিনিময়ে মাসে বেতন পান ৫৪০০ টাকা।
এর সঙ্গে মাঝে মাঝে সামান্য বকশিস মিললেও কম বেতনের সঙ্গে ছুটিসহ অন্যান্য সুবিধা তাদের নেই বললেই চলে।
অঞ্জলির মত চট্টগ্রামের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাজ করা নার্স, ওর্য়াড বয়, পরিচ্ছন্নকর্মী থেকে শুরু করে সব পর্যায়ের কর্মীদের অবস্থা অনেকটা একই।
নগরীর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে কিছু ‘সুযোগ-সুবিধা’ থাকলেও বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে তেমন কিছুই নেই বলে দাবি এসব পেশায় যুক্তদের।
তারা বলছেন, এ খাতের সংশ্লিষ্টদের জন্য সুনির্দিষ্ট মজুরি র্বোড না থাকায় তাদের বেতন বা অন্যান্য সুবিধা চলে প্রতিষ্ঠানের ইচ্ছে মত।
অঞ্জলি আইচ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখন ঠিকাদারের অধীনে একটি হাসপাতালে কাজ করি। প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে এক মাস টানা কাজ করতে পারলে ছুটি মেলে দুই দিন। মাসিক বেতন ৫ হাজার ৪০০ টাকা।

“কোনো উৎসব বোনাস, ছুটি কিছুই নেই। কাজে আসতে না পারলে বেতন কেটে রাখা হয়। আর বিভিন্ন উৎসবে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে যে হাজার বা ৫০০ টাকা বকশিস দেওয়া হয়, সেটা দিয়ে চলতে হচ্ছে।”
দুর্মূল্যের বাজারে কীভাবে সংসার চলে প্রশ্নে তিনি বলেন, “রোগীদের স্বজনরা অনেক সময় বকশিস দেয়, সেখান থেকে কিছুটা রোজগার হয়। আর কাজ করলে কিছু টাকাতো পাচ্ছি, না করলে এটাও পেতাম না।
“আগে একটা হাসপাতালের অধীনে কাজ করতাম। সেখানে ১২ ঘণ্টা দৈনিক কাজ করতাম, সপ্তাহে একদিন ছুটি পেতাম। বেতন পেতাম ১২ হাজার টাকা। তবে সেটি হাসপাতাল ভেদে কম-বেশিও হয়।”
আয়াদের মত বেসরকারি হাসপাতালে একই পদমর্যাদার অন্য সব কর্মীর বেতনেরও একই অবস্থা বলে দাবি তাদের।
তাদের ভাষ্য, শিফটিং চাকরি হওয়ার কারণে তারা অনেকেই একাধিক হাসপাতালে কাজ করেন।
চট্টগ্রামের আরেকটি বেসরকারি হাসপাতালে ওয়ার্ড বয়ের কাজ করা আবদুন নূর বলছেন, ১৫ বছর ধরে হাসপাতালে কাজ করলেও তার বেতন এখনও ১০ হাজারের কম।
তিনি বলেন, “গত দুই বছর ধরে কোনো ইনক্রিমেন্ট হচ্ছে না। আট ঘণ্টা করে শিফটিং ডিউটি হওয়ায় দুইটা হাসপাতালে কাজ করতে হয়।
“তবে আমাদের কিছু ছুটি-ছাটা থাকলেও যারা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে, তাদের অবস্থা আরও করুণ। ছয় থেকে সাত হাজার টাকা বেতন পান তারা। কোন ছুটি থাকে না।”
অথচ জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী, সরকারি হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ড বয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে বিবেচিত হন। ২০তম গ্রেড অনুযায়ী তাদের মাসিক বেতন ১৮ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে।
অথচ একই কাজ করে বেসরকারিতে ওয়ার্ড বয়, আয়া, পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অনেকের আয় অর্ধেকেরও কম।
চিকিৎসকদের পর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যারা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন সেই নার্সদেরও একই অবস্থা, বলছেন মেহেদীবাগ এলাকার আরেকটি হাসপাতালের র্নাস সামিনা আক্তার।
তিনি বলেন, “নার্সদের চাকরি করতে হয় সকালে সাড়ে ছয় ঘণ্টা, দুপুরের শিফটে সাড়ে সাত এবং রাতের শিফটে ১১ ঘণ্টা। সব মিলিয়ে তারা বেতন পান ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা। সরকারি হাসপাতালে নার্সদের একটা বেতন কাঠামো থাকলেও বেসরকারি খাতে তা নেই। আমরা যারা পুরনো, তাদের বেতন কিছুটা বেশি হলেও যারা নতুন তাদের বেতন ১২/১৩ হাজার টাকা। ফলে অনেককেই একাধিক হাসপাতালে কাজ করতে হয়।”
অথচ বেতন স্কেল অনুযায়ী, সরকারি সিনিয়র স্টাফ নার্সরা ১০তম গ্রেডে ১৬ হাজার থেকে ৩৮ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন পান। নার্সিং সুপারভাইজার বা সমমানের পদধারীদের বেতন আরো বেশি।
ফলে চিকিৎসক বাদে বেসরকারিতে স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বেতনের এই বৈষম্য নিয়ে ক্ষোভ বাড়ছে।
বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মোট ৫৮০টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার আছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে এ সংখ্যা ২৯০টি বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
এসব প্রতিষ্ঠানে নার্সের কাজ করেন প্রায় ১২ হাজার জন। ওয়ার্ড বয় ও আয়া কাজ করেন ছয় হাজারের মত।
বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, “মে দিবস আসে-যায়, সবাই নিজেদের অধিকারের কথা বলে। কিন্তু আমাদের কোনো অধিকার বলতে যেন কিছু নেই।”
স্বাস্থ্য খাতে বেসরকারি সেবা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত বলে দাবি করেন তিনি।
মিজানুর বলেন, “বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কর্মরত খুব কম লোক আছে, যারা একাধিক হাসপাতাল ও ডায়গনস্টিক সেন্টারে কাজ করেন না। আট ঘণ্টা করে শিফটিং ডিউটির কারণে দিনে ১৬ ঘণ্টা চলে যায় কর্মক্ষেত্রে। ফলে এসব স্বাস্থ্যকর্মী পরিবারকে সময় দিতে পারেন না।
“এ খাতে কোনো বেতন স্কেলও নাই। মালিকপক্ষ যেভাবে পারে সেভাবে বেতন নির্ধারণ করে কাজে নেন। ২০১৮ সাল থেকে বেতন স্কেলের জন্য আন্দোলন করে আসছি।”
বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান কর্মচারী ইউনিয়ন মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য ২০১৮ ও ২০২১ সালে শ্রম অধিদপ্তরে স্মারকলিপি দেওয়ার তথ্য দেন মিজানুর।
তিনি বলেন, “২০২২ সালের অক্টোবরে শ্রম মন্ত্রণালয় থেকে ১৪টি খাতে মজুরি বোর্ড গঠনের জন্য সদস্য চেয়ে গেজেট প্রকাশ করেছিল। আমরা শ্রমিকদের পক্ষে নামের তালিকা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেটি ভেস্তে যায়।
“একইভাবে অন্তবর্তী সরকারের সময়েও একটি তালিকা চাওয়া হয়েছিল। আমরা তালিকা দিয়েছিলাম কিন্তু সেটার আর কোনো খবর নেই।”