Published : 02 Sep 2026, 03:45 PM
হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন ও কমিশন গঠন, বৈষম্যমূলক আইন বিলুপ্ত এবং অধিকার নিশ্চিত করাসহ ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদ বাংলাদেশ।
বুধবার চট্টগ্রামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলন থেকে প্রধানমন্ত্রীর কাছে এসব দাবি জানানো হয়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণের জন্মতিথি জন্মাষ্টমী উপলক্ষে শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামে শোভাযাত্রা হবে। সে বিষয়ে জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটি।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক আর কে দাশ রুপু সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বলেন, “স্বাধীনতার পর থেকে হিন্দুরা বিভিন্নভাবে নির্যাতন, শোষণ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রত্যেকটি সরকারের সময় সাম্প্রদায়িক হামলা, বৈষম্যের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু আমরা সনাতনীরা কোনো বিচার পাইনি।
“কোনো সাম্প্রদায়িক ঘটনার বিচার গত ৫৫ বছরে হয়নি। আওয়ামী লীগের আমলে ২০২১ সালে কুমিল্লার পূজা মণ্ডপে মিথ্যা গুজব ছড়িয়ে হামলা হয়েছে। সেই ঘটনার জেরে সারাদেশে হিন্দুদের উপর হামলায় ৭ জন খুন হয়েছে।”
২০২১ সালের কুমিল্লার ঘটনার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল। ওই ঘটনায় কুমিল্লায় হামলায় আহত দিলীপ দাস পরে মারা যান এবং চাঁদপুর, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায়ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
একইভাবে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর, রামু ও রংপুরসহ বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কথাও মনে করিয়ে দেন আর কে দাশ।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও হিন্দুদের উপর বিভিন্ন এলাকায় ‘নির্যাতন’ হয়েছে।
“সেই সাথে ময়মনসিংহের ভালুকায় গার্মেন্টস শ্রমিক দিপুকে মিথ্যা অভিযোগে পুড়িয়ে মারা হয়েছে। আমরা মনে করেছিলাম, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে হিন্দুদের উপর নির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ হবে। কিন্তু গত ছয় মাসে বিভিন্ন জায়গায় সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে এবং শুধু হিন্দু বলে বিভিন্ন পেশার মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছে।”
ময়মনসিংহের ভালুকায় পোশাকশ্রমিক দিপু চন্দ্র দাসকে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে হত্যা করা হয় এবং পরে তার মরদেহে আগুন দেওয়া হয়। এ ঘটনায় পুলিশ একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে।
রংপুরে একই পরিবারের চারজন নিহত হওয়া, বিভিন্ন স্থানে হিন্দুদের শ্মশান ও জমি দখল এবং ‘ইসকন’ ট্যাগ দিয়ে হিন্দুদের হয়রানি ও চাকরিচ্যুতির ঘটনাকে হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘চরম হতাশা ও আতঙ্ক’ তৈরি করেছে বলে লিখিত বক্তব্যে দাবি করা হয়।
পরিষদের সাধারণ সম্পাদক বলেন, “বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মহোদয় অত্যন্ত আন্তরিক। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, সকল ধর্মের মানুষকে নিয়ে তিনি মডেল রেইনবো নেশন গড়ে তুলবেন।
“তার সদিচ্ছা থাকলেও সরকারের ভিতর ও বাইরে থাকা একদল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর কারণে তা হচ্ছে না। ফলে আমরা মনে করি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরাসরি সদয় দৃষ্টি প্রয়োজন।”
লিখিত বক্তব্যে পরিষদের পক্ষ থেকে ১৫টি দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সংবিধানের আলোকে সব ধর্মের মানুষের মত হিন্দুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, জাতিগত সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রণয়ন ও সংখ্যালঘু কমিশন গঠন, বৈষম্যমূলক সব আইন বিলুপ্ত করা এবং হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন।
অন্যান্য দাবির মধ্যে রয়েছে সরকারি চাকরিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে হিন্দুদের অধিকার নিশ্চিত করা ও পদায়নে বৈষম্য দূর করা, পার্বত্য ভূমি কমিশন আইন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন, সমতলের আদিবাসীদের জন্য পৃথক ভূমি কমিশন গঠন এবং দেবোত্তর সম্পত্তি সংরক্ষণ আইন প্রণয়নের ব্যবস্থা করা।
বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে সব সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের বিচার, ধর্মীয় সভার নামে হিন্দু ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনাকারীদের আইনের আওতায় আনা এবং হিন্দুদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবিও জানিয়েছে পরিষদ।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে করা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হিন্দুদের মুক্তি এবং তাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা থেকে অব্যাহতির দাবিও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
পরিষদের কার্যকরী সাধারণ সম্পাদক বিপ্লব দে পার্থর সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি চন্দন তালুকদারসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, শুক্রবার সকাল ৯টায় নগরীর আন্দরকিল্লা মোড় থেকে জন্মাষ্টমীর শোভাযাত্রা শুরু হবে।
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী শোভাযাত্রার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। চট্টগ্রামে জন্মাষ্টমী উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির আয়োজনে ৪৩ বছর ধরে এই শোভাযাত্রা হয়ে আসছে।