Published : 21 Nov 2025, 01:02 AM
বৈশ্বিক জাহাজের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে অভিজ্ঞ ও সস্তা শ্রমশক্তি বাংলাদেশের আছে জানিয়ে খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জাহাজ নির্মাণ শিল্পকে এখন ‘দাঁড় করাতে’ প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন।
চট্টগ্রামে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডে বৃহস্পতিবার তিনটি নতুন জাহাজ হস্তান্তর অনুষ্ঠানে এমন বক্তব্যই উঠে এল। আরব আমিরাতভিত্তিক কোম্পানি মারওয়ান শিপিং লিমিটেডের জন্য নতুন জাহাজ তিনটি বানিয়েছে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড।
হস্তান্তর অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান বলেন, “জাহাজ রপ্তানি খাতে বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জের চেয়ে সুবিধাটা বেশি। ইউরোপে শিপ বিল্ডিং অনেক আগেই প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন জাপান এবং কোরিয়া শ্রমিক ঘাটতিতে ভুগছে খুব বেশি।
“তাদের জাহাজ নির্মাণের মত শ্রমঘন শিল্প চালুর মত শ্রমশক্তি নেই। তারা বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শ্রমিক নিয়ে যাচ্ছে। সেই কারণে শিপ বিল্ডিংটা চলে আসে চায়নাতে। সেখানেও শ্রমিকের খরচ বাংলাদেশের তুলনায় পাঁচ-ছয়গুণ বেশি। তার ফলে শিপ বিল্ডিংটা শিফট হয়ে যায় ভিয়েতনাম, ফিলিপিন ও ইন্দোনেশিয়ায়।”

সেই জোয়ারের শুরুর সময় বাংলাদেশ ধরতে পারেনি জানিয়ে সোহেল হাসান বলেন, “কিন্তু এখনো সুযোগ আছে। বিভিন্ন সময় সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে আমরা বলেছি। ভারত সাংঘাতিকভাবে এই খাতের কাজ ধরতে ৭৭ হাজার কোটি টাকা তারা দিয়েছে জাহাজ নির্মাণ খাতে।
“আমরা সেরকম কিছু চাইছি না। কিন্তু ব্যবসা সহজীকরণের বিষয়ে সরকার যেন একটু সচেতন হয়। এটা বিনিয়োগ নির্ভর খাত। একটি শিপ ইয়ার্ডে কম করে পাঁচশ-ছয়শ কোটি টাকা বিনিয়োগ প্রয়োজন। সরকার যদি কম খরচে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের (লো কস্ট লংটার্ম ফিন্যান্সিং) ব্যবস্থা করে।”
বিশ্বের অন্যান্য দেশে জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যে ধরনের সুযোগ পায় তা পেলে বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প ‘দাঁড়িয়ে যাবে’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নতুন জাহাজ নির্মাণে বৈশ্বিক চাহিদার কত শতাংশ বাংলাদেশ থেকে পূরণ করা সম্ভব হচ্ছে, এমন প্রশ্নের উত্তরে ক্যাপ্টেন সোহেল হাসান বলেন, “১ শতাংশও না। আমাদের মার্কেট অসীম। আমরা নিজেরা বছরে ১০-১২টা জাহাজ তৈরি করতে পারি। দেড়শ-দুইশ মিলিয়ন ডলার আমরাই করতে পারি।
“বর্তমানে একটা নরওয়েজিয়ান ফিশিং ট্রলার করছি, ২৫ মিলিয়ন ডলার। ওরকম ১০টা জাহাজ এক বছরে সহজে করা যায়। ২০০-২৫০ মিলিয়ন ডলার একটি জাহাজ নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সম্ভব। বাংলাদেশে আরো ভাল জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান আছে।”

বৈশ্বিক চাহিদা পূরণে দেশি জাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশীদারত্ব প্রয়োজন জানিয়ে তিনি বলেন, “দেশিয় প্রতিষ্ঠানগুলো কতটুকু পারবে, সেটার একটা সীমা আছে। এই খাতকে আরো বড় করতে হলে বিদেশি পার্টনার নিতে হবে।
“যদি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা সৃষ্টি করা যায়, তাহলে এই খাতে বিদেশি বিনিয়োগ হবে। বন্দরের লালদিয়া টার্মিনালে এপি মোলারের বিনিয়োগ একটা বড় অগ্রগতি। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদে আস্থা পাবে। আস্থা জাগাতে পারলে জাপান, কোরিয়া ও ভিয়েতনামের জাহাজ নির্মাতারা বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট হবে।”
এর আগে অনুষ্ঠানে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ও এফবিসিসিআই এর প্রশাসক আব্দুর রহিম খান বলেন, “রপ্তানি বহুমুখীকরণ নিয়ে আমরা খুব চিন্তায়। বাংলাদেশের রপ্তানি কেবলমাত্র রেডিমেড গার্মেন্টস নির্ভর। এজন্য সরকার বিভিন্ন নীতি- ফিসক্যাল ও নন ফিসক্যাল সব উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছি। যাতে সুফল পাই।
“সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ যুক্ত হওয়ার কারণে আমাদের এক্সপোর্ট বাক্সেটে জাহাজ রপ্তানির মত খাত আছে। জাহাজ রপ্তানি আমাদের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে। কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করছে। এই খাতের অগ্রযাত্রা আমাদের স্বপ্নকে বাস্তব রূপায়নে সহযোগিতা করবে।”

মারওয়ান শিপিং লিমিটেডের কাছে বৃহস্পতিবার যে তিনটি ল্যান্ডিং ক্রাফট হস্তান্তর করেছে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, সেগুলো হচ্ছে-‘মায়া’, ‘এসএমএস এমি’ ও ‘মুনা’। এগুলো আরব আমিরাতের সাগরে জ্বালানি ক্ষেত্রে যন্ত্র পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হবে।
আটটি জাহাজ নির্মাণে ২০২৩ সালে মারওয়ান শিপিং লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড। এর মধ্যে রয়েছে দুটি টাগবোট, চারটি ল্যান্ডিং ক্রাফট এবং দুটি ট্যাংকার।
অনুষ্ঠানের আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আব্দুল্লাহ আলী আব্দুল্লাহ আলহমৌদি বলেন, “দুই দেশের দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে এই বাণিজ্যিক সম্পর্ক আমাদের মধ্যেকার বন্ধুত্বকে আরো সুদৃঢ় করবে। আশা করি ভবিষতে বাংলাদেশ থেকে আরো জাহাজ আরব আমিরাতে রপ্তানি হবে।”
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন একটি রপ্তানি পণ্যের উপর নির্ভরশীল হয়ে আছে মন্তব্য করে ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ডের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, “আমাদের উচিত ভিন্ন রপ্তানি পণ্য ও রপ্তানি গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হওয়া।
“জাহাজ নির্মাণ একটি শ্রম ঘন ও উচ্চ প্রযুক্তির ভারি শিল্প। জাহাজ রপ্তানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখা সম্ভব।”
এর আগে চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘রায়ান’ নামের একটি ল্যান্ড ক্রাফট এবং জুলাই মাসে ‘খালিদ’ ও ‘ঘায়া’ নামের দুটি টাগবোট মারওয়ান শিপিং লিমিটেডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ল্যান্ডিং ক্রাফটগুলো সাগরের জ্বালানি ক্ষেত্রে যন্ত্র পরিবহনের কাজে ব্যবহার করা হবে বলে অনুষ্ঠানে জানানো হয়।
ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১১টি দেশে ৩৬টি জাহাজ রপ্তানি করেছে, যেগুলোর বাজার মূল্য ১৩৮ মিলিয়ন ডলার।