সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালু হওয়ায় বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও গতি ফেরার আশা জেগেছে।
Published : 24 Jul 2024, 02:14 PM
কোটা আন্দোলন ঘিরে ঘটে যাওয়া সহিংসতার জেরে মহাসড়কে পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ হওয়া এবং ইন্টারনেট সেবা না থাকায় চট্টগ্রাম বন্দর ও অফডকে থাকা আমদানি-রপ্তানি পণ্যবাহী কন্টেইনারের সংখ্যা বেড়ে গেছে।
তবে মঙ্গলবার থেকে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। বুধবার সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালু হওয়ায় বন্দরে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমেও গতি ফেরার আশা জেগেছে।
ব্যবসায়ীরা এখন আমদানি ও রপ্তানির সকল পণ্য খালাস করতে পারছেন বলে দাবি করেছেন চট্রগ্রাম কাস্টমস হাউজের উপ কমিশনার ইমাম গাজ্জালী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “কাল (মঙ্গলবার) পর্যন্ত ম্যানুয়ালি পচনশীল মাল শুল্কায়ন করেছি। আজ (বুধবার) ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট পরিষেবা চালু হওয়ায় সকল কার্যক্রম স্বাভাবিক হচ্ছে।”
চট্টগ্রাম কাস্টমস সিএন্ডএফ এজেন্ট এসোসিয়েশনের সভাপতি মো. আকতার হোসেন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমস হাউজে সমস্যা হচ্ছে না। সমস্যা হল আমরা শিপিং এজেন্টদের থেকে ডিউ না পাওয়ায় মাল খালাস করতে পারছি না। তারা নাকি ইন্টারনেট পাচ্ছে না।“
এ বিষয়ে জানতে চাইলে, ইমাম গাজ্জালী বলেন, “কারো পে অর্ডার ও চালান না থাকলে আমরা অঙ্গীকারনামা নিয়ে মাল খালাস করতে দিচ্ছি।”
চট্টগ্রামের ১৯টি অফডকে রপ্তানি পণ্যবাহী প্রায় পাঁচ হাজার কন্টেইনার জমে আছে। এর পাশাপাশি তৈরি পোশাক কারখানাগুলো থেকে নতুন কোনো রপ্তানি পণ্য গত কয়েক দিনে অফডকে আসেনি। অফডকগুলো থেকে আমদানি পণ্যবাহী কন্টেইনার শিল্প-কারখানার পাঠানোর কাজও আটকে ছিল।
বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "বন্দরের সবগুলো জেটিতে জাহাজ থেকে পণ্য ওঠা-নামার কাজ স্বাভাবিকই ছিল৷ কিন্তু ডেলিভারিতে সমস্যা হয়ে যায়। সে কারণে বন্দরে থাকা কন্টেইনারের সংখ্যা বেড়ে গেছে।"
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহন চলাচল শুরু হওয়ায় এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাস্টমসে কিছু পণ্যের শুল্কায়ন ম্যানুয়ালি করতে শুরু করায় অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু পুরো স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে আরও এক সপ্তাহের মত সময় লাগতে পারে।
বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, "শনি থেকে সোমবার ডেলিভারি কম হওয়ায় কন্টেইনার জমে গিয়েছিল। এটা আরো বাড়লে হয়ত সমস্যা হত। কিন্তু মহাসড়কে যানবাহন চলতে শুরু করায় মঙ্গলবার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
"বন্দরের ভেতরে সকল কার্যক্রম যেমন- জাহাজ থেকে কন্টেইনার লোড-আনলোড, জাহাজের আসা-যাওয়া সবই স্বাভাবিক ছিল এবং আছে। তবে ইন্টারনেট ডাউন থাকায় টার্মিনাল অপারেটিং ম্যানুয়ালি করতে হচ্ছে। এতে কর্মীদের বেগ পেতে হচ্ছে।"
যেভাবে চলেছে বন্দর
চলতি মাসের শুরুতে শুরু হওয়া কোটাবিরোধী আন্দোলন সহিংস হয়ে ওঠে গত ১৫ জুলাই থেকে। এরপর থেকে স্থানে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ এবং জ্বালাও-পোড়াও ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে যাত্রাবাড়ী. শনির আখড়াসহ রাজধানীজুড়ে।
এ কারণে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে পণ্য নিয়ে চলাচলকারী বহু যানবাহন ঢাকার প্রবেশপথে আটকা পড়ে। এক পর্যায়ে শুক্রবার রাতে সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়।
এছাড়া মহাখালীর ডেটা সেন্টারে আগুন দেওয়ার পর দেশব্যাপী ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে যায়। এতে চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রপ্তানি পণ্যের শুল্কায়নে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এসকুইডা ওয়ার্ল্ড নামের যে সফটওয়্যার ব্যবহার করে, সেটির কার্যক্রমও থমকে যায়।
ফলে শনিবার সকাল থেকে বন্দর ও অফডক থেকে আমদানি পণ্যবাহী কন্টেইনার খালাস এবং রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার বন্দরে আসা একরকম থেমে যায়।
দেশের আমদানি-রপ্তানির সিংহভাগ হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। আমদানি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের জেটি থেকে এবং বেসরকারি অফডকগুলো থেকে ডেলিভারি দেওয়া হয়।
আর রপ্তানি পণ্য বিশেষ করে তৈরি পোশাক, কারখানা থেকে চলে যায় বেসরকারি অফডকে। সেখানে শুল্কায়ন প্রক্রিয়া শেষে বন্দরে এনে জাহাজে তোলা হয়। এ কাজে অফডকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক খালি কন্টেইনারের সরবরাহও নিশ্চিত করতে হয়।
চট্টগ্রামে ১৯টি বেসরকারি ইনল্যান্ড কন্টেইনার ডিপোতে (অফডক) এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সরাসরি কোন কন্টেইনার ডেলিভারি হয়নি। আর অফডক গুলোতে গিয়েছিল মাত্র ৪১৫ টিইইউএস (টুয়েন্টিফিট ইকুইভ্যালেন্ট ইউনিট- ২০ ফুট দৈর্ঘ্যর কন্টেইনারকে একক ধরে) কন্টেইনার।
সোমবার সকাল পর্যন্ত (আগের ২৪ ঘণ্টায়) চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে নেমেছে ২১০৭ টিইইউএস কন্টেইনার।
আর জাহাজে ওঠানো হয়েছে ২৯৭২ টিইইউএস কন্টেইনার। এরমধ্যে খালি কন্টেইনার ১০৯৬ টিইইউএস। বাকি ১৮৭৬ টিইইউএস কন্টেইনার ছিল রপ্তানি পণ্যের।
মঙ্গলবার বন্দর থেকে সরাসরি ডেলিভারি হয়েছে মাত্র ৬৫টিইইউএস কন্টেইনার আর অফডকে গেছে ১১১০ টিইইউএস কন্টেইনার।
স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের জেটিগুলোতে সব মিলিয়ে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টিইইউস কন্টেইনার থাকে।
মঙ্গলবার সকাল পর্যন্ত (আগের ২৪ ঘণ্টায়) চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে জাহাজ থেকে নেমেছে ৯৪৮ টিইইউএস কন্টেইনার।
মঙ্গলবার দিন শেষে বন্দরে থাকা কন্টেইনারের ছিল ৪১৬২০ টিইইউএস। বন্দরের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৫৩৫১৮ টিইইউএস।
আর জাহাজে উঠানো হয়েছে ২০৪৪ টিইইউএস কন্টেইনার। এরমধ্যে খালি কন্টেইনার ৮২৪ টিইইউএস। বাকি ১২২০ টিইইউএস কন্টেইনার ছিল রপ্তানি পণ্যের।
স্বাভাবিক হতে ‘সময় লাগবে’
বেসরকারি কন্টেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডা'র সদস্য সচিব রুহুল আমিন সিকদার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, দৈনিক ৭০০-৮০০ টিইইউএস রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার কারখানা থেকে ডিপোগুলোতে আসে। সার্বিক পরিস্থিতির কারণে রপ্তানি পণ্যের নতুন কোনো কন্টেইনার গত কয়েকদিনে ডিপোতে পৌঁছাতে পারেনি।
দৈনিক রপ্তানি পণ্যের ১৮০০-২২০০ টিইইউএস কন্টেইনার ডিপো থেকে বন্দরে যায়। কিন্তু এখন ১৯ টি ডিপোতে আগে আসা মোট ৫০০০ রপ্তানি পণ্যের কন্টেইনার জমে আছে।
প্রতিদিন গড়ে ৩৫০০-৪০০০ টিইইউএস আমদানি পণ্যের কন্টেইনার বন্দর থেকে অফডক হয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানের কল-কারখানার উদ্দেশ্যে চলে যায়। কিন্তু গত কয়েকদিন যানবাহন চলাচল না থাকায় তা শূন্যের কোঠায় নেমেছিল বলে জানান রহুল আমিন।
তিনি বলেন, "যত দ্রুত কাস্টমসের শুল্কায়ন প্রক্রিয়া ডিজিটালি করা সম্ভব হবে এবং তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানির জন্য আমরা অফডকে পাব, তত দ্রুত গতিতে জাহাজীকরণের সব প্রক্রিয়া শেষ করার চেষ্টা করব।
"তবে তখন বন্দরে চাপ বাড়বে। তাই স্বাভাবিক গতিতে শুল্কায়ন ও পণ্য আনা-নেওয়া শুরু হলে তারপর সবকিছু আবার আগের পর্যায়ে ফিরতে ৭-৮ দিন সময় লাগতে পারে।"