Published : 03 Apr 2026, 12:56 AM
ইরান যুদ্ধের কারণে সূচি অনুযায়ী তেলের জাহাজ আসতে না পারায় অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ সংকটে পড়ার শঙ্কায় পড়েছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ব জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)।
আগের মজুদের পরিমাণ কমে আসায় দৈনিক পরিশোধনের পরিমাণও কমিয়ে তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টনে নামিয়ে আনা হয়েছে। চট্টগ্রামে অবস্থিত এ পরিশোধনাগার দৈনিক গড়ে চার থেকে সাড়ে চার হাজার টন তেল পরিশোধনে সক্ষম।
বর্তমানে ইআরএলে অপরিশোধিত তেলের মজুদ ২০ হাজার টনে নামার তথ্য মিলেছে। ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেছেন, এ পরিমাণ তেল দিয়ে পাঁচ থেকে ছয় দিনের মত উৎপাদন কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। এরপর অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ না এলে পরিশোধন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির আরেক কর্মকর্তা বলেন, সবশেষ গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ টন আমদানি করা অপরিশোধিত তেল দেশে আসে। সেই চালানের মজুদই এখন শেষ পর্যায়ে। এরপর ইরান যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ হলে বাংলাদেশের অপরিশোধিত তেলের মূল উৎস মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে তেল আসা বন্ধ হয়ে যায়।
ইআরএল ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মার্চে তেলের যে জাহাজ আসার কথা ছিল হরমুজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেটি আসতে পারছে না। ‘এমটি নরডিক পোলাক্স’ নামের ওই জাহাজ এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে মাস খানেক ধরে সৌদি আরবের রাস্তানুরা বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষা করছে।
তবে সামনের কয়েক দিনের মধ্যে অপরিশোধিত তেল না পেয়ে ইআরএলের পরিশোধন কাজ বন্ধ হয়ে গেলেও দেশে জ্বালানি সংকট না হওয়ার কথা বলেছেন জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, অপরশোধিত তেলের সরবরাহ ঠিক রাখতে সরকার কাজ করছে। জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য শুধু ইআরএলের ওপর সরকার র্নিভরশীল নয়। তারা মোট চাহিদার একটা অংশ সরবরাহ করে থাকে। পরিশোধিত তেল আমদানির মাধ্যমে বাকিটা মেটানো হয়।
ইআরএলের কারণে এখনই জ্বালানি নিয়ে শঙ্কিত হওয়ার কারণ না থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “সাপ্লাই চেইন ঠিক আছে। বর্তমানে যা আছে তা দিয়ে চলতি মাসে কোনো সংকট হবে না।”
চলতি মাসে অপরিশোধিত তেলবাহী দুটি জাহাজ দেশে আসার তথ্য দিয়ে মনির হোসেন বলেন, “এর একটি আগামী ১৮ এপ্রিল আসবে এবং অপরটি ১২ বা ১৩ এপ্রিলের মধ্যে দেশে আসবে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক মাসে বেশ কিছ তেল ও জ্বালানিবাহী জাহাজ দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামে ভিড়েছে। বর্তমানে সেগুলোর মধ্যে অপরিশোধিত কোনো তেলের জাহাজ নেই। তবে পরিশোধিত তেলের জাহাজ রয়েছে; যেগুলো বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) ব্যবস্থাপনায় তেল সরবরাহকারী কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনায় যাবে। গত ২৬ ও ৩১ মার্চ বিকল্প উৎস থেকে পরিশোধিত জ্বালানি তেল নিয়ে দুটি জাহাজও চট্টগ্রাম বন্দরে এসেছে।
এদিকে যুদ্ধের মধ্যেও পারস্য উপসাগরে থাকা ছয় বাংলাদেশি জাহাজ ‘দ্রুত সময়ে’ হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত। তার সরকারের অনুমোদন পেলে ‘এমটি নরডিক পোলাক্স’ নামের জাহাজটি দ্রুত সময়ে হরমুজ প্রণালি পার হতে ছাড় পাবে বলে তুলে ধরেন তিনি।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে তিন থেকে পাঁচ বছর পরপর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ‘শাটডাউন’ ছাড়া অপরিশোধিত তেলের অভাবে ইআরএলে উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি কখনো।

ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় প্রথমবারের মতো উৎপাদন বন্ধের মত ঝুঁকিতে পড়েছে রাষ্ট্রীয় শোধনাগারটি।
এ বিষয়ে ইআরএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাতকে বেশ কয়েকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।
যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ ধরনের সংকট মোকাবেলার পাশাপাশি দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নতুন শোধনাগার তৈরি এবং পরিশোধন সক্ষমতা বাড়ানোর কথা অনেকদিন থেকে আলোচনা হচ্ছে। ইআরএলের দ্বিতীয় ইউনিট চালুর প্রকল্প নেওয়া হলেও অর্থায়নের অভাবে তা এগোচ্ছে না।
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল প্রয়োজন হয়। চাহিদার ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আনা হয়। বাকি ৮০ শতাংশ পরিশোধিত তেল আমদানি করা হয় সিঙ্গাপুর, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন উৎস থেকে।
সৌদি আরব ও আরব আমিরাত থেকে আমদানি করা অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েল পরিশোধন করা হয় ইআরএলে শোধনাগারে। পরিশোধন করে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, জেট ফুয়েলসহ ১২ ধরনের জ্বালানি তেল পাওয়া যায়। এসব তেল বিপিসির সরবরাহকারী সংস্থার মাধ্যমে ডিপো থেকে সরবরাহ হয়ে থাকে।
বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত ডিজেলের মজুদ ছিল ১ লাখ ২৭ হাজার ৮১০ টন, যা দিয়ে আগামী ১০ দিনের চাহিদা মেটানো যাবে। অকটেন মজুদ আছে ৯৪০৭ টন, যা দিয়ে চলবে আট দিন। মজুদ থাকা ১২ হাজার ৮১০ টন পেট্রোল দিয়ে চলবে ৯ দিন।
অপরদিকে ৬২ হাজার ৮৮৯ টন ফার্নেস অয়েল দিয়ে চলবে ২৬ দিন। জেট ফুয়েলের মজুদ আছে ২৮ দিনের; মোট ৪৩ হাজার ৪৯ টন।