Published : 14 Sep 2026, 03:05 PM
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার ভার বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বন্দর রক্ষা কমিটি।
সোমবার সকালে নগরীর বারিক বিল্ডিং মোড় থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ মিছিল শেষে অনুষ্ঠিত সমাবেশ থেকে এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
সোমবারের বিক্ষোভ মিছিল বন্দর ভবন পর্যন্ত যাওয়ার কথা থাকলেও পুলিশের বাধায় বন্দরের দুই নম্বর গেইট এলাকায় মিছিলটি থামিয়ে দেয়। সেখানেই সমাবেশ হয়।
সেখানে বন্দর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, “আমরা বারবার বলেছি, আমাদের এই আন্দোলন সরকারবিরোধী আন্দোলন নয়; এই আন্দোলন জনগণের পক্ষে এবং জনগণের সরকারকে জনগণের পক্ষে টেনে আনার আন্দোলন।
“আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতীকী অনশন, প্রেস কনফারেন্স, গোল টেবিল বৈঠক, সাংবাদিক সম্মেলন, মানববন্ধন, মিছিল সব করেছি। করার পরে আজকে প্রথম বিক্ষোভ মিছিল করলাম।
“পুলিশের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে, মিছিল এখানে শেষ করার জন্য। এটি বন্দরের রোড। গাড়ির চাপ আছে। উনাদের অনুরোধে আজকের কর্মসূচি এখানে স্টপ করেছি, মানুষের যেন দুর্ভোগ না হয়।”
দেলোয়ার মজুমদার বলেন, আগামী ৫ অক্টোবর সকাল ১১টায় বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু হবে।
“সেদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আমরা সেখানে অবস্থান করব। তার আগে যদি আমাদের দাবি মেনে নেওয়া হয়, তাহলে তার আগেই অবস্থান শেষ হবে। তা না হলে সন্ধ্যা পর্যন্ত কর্মসূচি পালন করে, পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।”
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের বিভাগীয় সাধারণ সম্পাদক কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, “নিউমুরিং টার্মিনাল যদি বিদেশিদের দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধ না করে, তাহলে ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি হবে। এর মধ্যে যদি সরকারের অবস্থান পরিবর্তন না করে, তাহলে সেখান থেকে বৃহত্তর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
“আমরা সরকারকে অনুরোধ করব, ডিপি ওয়ার্ল্ডের এই চুক্তি থেকে সরে আসার জন্য। এটা বিদেশিদেরকে সন্তুষ্ট করার জন্য হচ্ছে। যেখানে আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সবার আগে বাংলাদেশ। সবার আগে বাংলাদেশ যদি হয়—নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নৌবাহিনী এখন পরিচালনা করছে, তারাই এটা পরিচালনা করবে। আমরা এটাই চাই। বিদেশি কোনো কোম্পানিকে আমরা দিতে দেব না।”
এর আগে বারিক বিল্ডিং মোড়ে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি) চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই দেশের স্বার্থে হতে পারে না।
“চট্টগ্রাম বন্দরের সম্পদ ও অবকাঠামো জনগণের সম্পদ। বন্দরের সক্ষমতা ও পরিচালনার সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থও জড়িত। তাই এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দেওয়ার আগে দেশের স্বার্থ, শ্রমিকদের অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।”
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এ এম নাজিম উদ্দিন বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর শুধু একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। এনসিটি ও সিসিটি পরিচালনার নামে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়া হলে ভবিষ্যতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
“দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় বন্দর পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বন্দরের আয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধির নামে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়, যাতে শেষ পর্যন্ত দেশের জনগণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরকারকে সরে আসতে হবে।”
জাতীয়তাবাদী শ্রমিকদল নেতা কাজী শেখ নুরুল্লাহ বাহার বলেন, “স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নেওয়া জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম বন্দর দেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনাল এনসিটি ও সিসিটি বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের হাতে দীর্ঘমেয়াদে ইজারা দেওয়া দেশের জনগণ মেনে নেবে না।
“বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, আধুনিকায়ন ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার নামে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে দেওয়া কোনো সমাধান হতে পারে না। বরং বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি সংযোজন এবং দক্ষ জনবল নিয়োগের মাধ্যমে বন্দরের কার্যক্রম আরও গতিশীল করা সম্ভব।”
বন্দর রক্ষা কমিটির সদস্য সচিব ফজলুল কবির মিন্টুর সঞ্চালনায় সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক আব্দুল বাতেন, সহসম্পাদক ইব্রাহীম ফরাজী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুর রহমান, ডক জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সভাপতি মো. হারুন, সাধারণ সম্পাদক তসলিম হোসেন সেলিম, টিইউসি চট্টগ্রাম জেলা কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ইফতেখার কামাল খান, ন্যাপ নেতা মিটুল দাশগুপ্তসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের নেতারা।
গত ৪ জুন এক চিঠিতে এনসিটি ইজারায় দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
চট্টগ্রাম বন্দরে চালু থাকা চারটি কনটেইনার টার্মিনালের মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল সবচেয়ে বড়। গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরে হ্যান্ডলিং হওয়া কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ হয় এনসিটিতে।
২০২৪ সালের ৭ জুলাই থেকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব নেয় বাংলাদেশ নৌবাহিনী নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি চট্টগ্রাম ড্রাইডক লিমিটেড (সিডিডিএল)। এরপর থেকে এনসিটিতে কনটেইনার হ্যান্ডলিং ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) এবং গভর্মেন্ট টু গভর্মেন্ট (জিটুজি) কাঠামোর অধীনে এনসিটি পরিচালনার কাজ ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
সেসময় ওই উদ্যোগ পরিণতি না পেলেও অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদে আবার এই প্রক্রিয়া গতিশীল হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এ বিষয়ে চুক্তির জোর আলোচনা শুরু হলে আন্দোলনে যায় বন্দরের শ্রমিক কর্মচারীরা।
সবশেষ চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি এনসিটিতে বিদেশি অপারেটরকে ইজারা দেওয়ার কার্যক্রম স্থগিত করার ঘোষণা দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
পরে ৪ জুনের চিঠিতে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে সরকারের নির্দেশনার পর আলোচনা প্রক্রিয়ায় সহায়তা করার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ১২ সদস্যের একটি সাপোর্ট টিমও গঠন করে।
আরও পড়ুন-
কানে তুলো পিঠে কুলো দিয়ে থাকলে অজনপ্রিয় হবেন: সরকারকে বন্দর রক্ষা কমিটির নেতা
এনসিটি-সিসিটি ইজারা বন্ধের দাবিতে গণঅনশন
এনসিটি-সিসিটির ইজারা ঠেকাতে চট্টগ্রামে সমাবেশ
এনসিটি-সিসিটি বিদেশিদের দিলে সারাদেশে প্রতিরোধের ঘোষণা ‘বন্দর রক্ষা কমিটির’
এনসিটি-সিসিটি ইজারার উদ্যোগ বাতিলের দাবিতে কালো পতাকা মিছিল
টার্মিনাল বিদেশিদের দিলে চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় জাতীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হবে: স্কপ
এনসিটি-সিসিটি ইজারার উদ্যোগ বাতিলের দাবিতে কালো পতাকা মিছিল
এনসিটি বিদেশিদের ইজারা ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির পরিপন্থি কি না, প্রশ্ন প্রিন্সের