Published : 08 Nov 2025, 08:27 PM
লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দর ‘বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত’ বন্ধ না হলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনা ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছে বাম গণতান্ত্রিক জোট।
শনিবার বিকালে চট্টগ্রামের এক গণসমাবেশ থেকে দুই সপ্তাহজুড়ে সারাদেশে বিক্ষোভ, গণসংযোগ, পদযাত্রার কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
নগরীর পুরাতন রেল স্টেশন চত্ত্বরে গণসমাবেশ থেকে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন বাম গণতান্ত্রিক জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশিদ ফিরোজ।
গেল ২৫ মে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিন দেশের তিন কোম্পানির সঙ্গে সরকারের আলোচনা চলার বিষয়টি সামনে আনেন।
এরপর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবিসহ বিভিন্ন বাম দল ও সংগঠন, বিএনপি, শ্রমিক সংগঠন অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগের বিরোধিতায় নামে।
বিদেশিদের হাতে বন্দর ছেড়ে দিলে দেশের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে কয়েকটি রাজনৈতিক দলগুলো ও অর্থনীতির বিশ্লেষকদের কেউ কেউ এ উদ্যোগের বিরুদ্ধে মত দিচ্ছেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে গেল ৬ জুন জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বন্দর ব্যবস্থাপনার উদ্যোগে আপনাদের দৃঢ় সমর্থন অব্যাহত রাখুন। যারা বিরোধিতা করছে তাদের প্রতিহত করুন।”
বির্তক ও বিরোধিতার মধ্যে গেল ১২ অক্টোবর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ ইউসুফ বলেছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি), লালদিয়ার চর টার্মিনাল এবং ঢাকার কেরাণীগঞ্জের পানগাঁও অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য বিদেশি অপারেটরদের সঙ্গে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তি সম্পন্ন হবে।

তিনি বলেন, এর মধ্যে লালদিয়ার চর টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হবে ৩০ বছরের জন্য, আর বাকি দুই টার্মিনাল পরিচালনার মেয়াদ হবে ২৫ বছর।
‘জনমত উপেক্ষা করে লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের ইজারা দেওয়া চলবে না’ এই স্লোগান নিয়ে এই গণসমাবেশের আয়োজন করে বাম জোট ও ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা।
সমাবেশে বাম জোটের সমন্বয়ক বজলুর রশিদ ফিরোজ বলেন, “লাভজনক চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত বন্ধ করার দাবিতে ৯ নভেম্বর থেকে ২৩ নভেম্বর সারাদেশে বিক্ষোভ, গণসংযোগ, পদযাত্রার কর্মসূচি এবং এর মধ্যে দাবি না মানলে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে যমুনা ঘেরাও, এরপর প্রয়োজনে হরতাল কর্মসূচি দেওয়া হবে।
“অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো এখতিয়ার নেই, লাভজনক বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়ার। সরকার বিদেশিদের সাথে চুক্তি করার জন্য যেরকম উঠে পড়ে লেগেছে। বন্দরের মাশুল বাড়াল, তাতে স্পষ্ট সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া সরকার নানা ইস্যু তৈরি করে নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা করছে। নির্বাচন বানচালের কোনো ষড়যন্ত্র জনগণ সফল হতে দেবে না।”
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবির সাবেক শাহ আলম বলেন, “বন্দরের পরিচালনা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত সত্ত্বেও অন্তর্বর্তী সরকার সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে একগুয়ের মতো আচরণ করছে। দেশের শ্রমজীবি ও সাধারণ মানুষ প্রবল অর্থনৈতিক সংকটসহ হাজারো সমস্যায় পর্যুদস্ত, অথচ সরকারের সেদিকে মনোযোগ নেই।
“তারা বন্দর ও করিডোর নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে চক্রান্তে ব্যস্ত। চট্টগ্রাম সূর্যসেন, প্রীতিলতার মাটি। চট্টগ্রামের মানুষ বন্দর নিয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত সফল করতে দেবে না।”
সভাপতির বক্তব্যে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাসদ (মার্কসবাদী) চট্টগ্রাম জেলা সমন্বয়ক শফি উদ্দিন কবির আবিদ বলেন, “বাংলাদেশের আমদানি রপ্তানির ৯২ ভাগ চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয়। অর্থাৎ দেশের অর্থনীতি প্রধানত চট্টগ্রাম বন্দরের উপর নিভর্রশীল। বন্দরের মতো কৌশলগত সম্পদ নিয়ে যেকোন সিদ্ধান্ত শুধু অর্থনৈতিক লাভ দিয়ে বিচার করা যায় না।

“দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক ও সামরিক নিরাপত্তা এবং ঝুঁকিসহ অনেকগুলো স্পর্শকাতর বিষয় এর সাথে যুক্ত। বিশেষ করে যেখানে আমাদের একটিমাত্র প্রধান বন্দর সেখানে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে এর কোনো অংশ তুলে দেওয়া আরও ঝুঁকিপূর্ণ।”
বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেলের গভীরতার যে প্রাকৃতিক সীমাবদ্ধতা তা কোনো বিদেশি অপারেটরের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়। এই বন্দরের সক্ষমতা একটা সীমার বেশি বাড়ানো সম্ভব নয়।
“ফলে বিদেশের সাথে প্রেক্ষিতবিহীন তুলনা দিয়ে বিদেশি কোম্পানির হাতে নিউমুরিং টার্মিনাল তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী।”
সিপিবির চট্টগ্রাম জেলা শাখার যুগ্ম সম্পাদক নুরুচ্ছফা ভুঁইয়ার পরিচালনায় সমাবেশে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন গণমুক্তি ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় আহবায়ক নাসিরউদ্দিন নাসু, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগ কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ইকবাল কবির জাহিদ, বাসদ (মার্কসবাদী) কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মাসুদ রানা, গণতান্ত্রিক বিপ্লবী পার্টি কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোশরেফা মিশু, বাংলাদেশ সোশ্যালিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম, বাসদ (মাহবুব) এর কেন্দ্রীয় সদস্য আয়ুব রানা।
গণসমাবেশে শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ-স্কপের নেতাকর্মীরা বিশাল মিছিল নিয়ে যোগ দেন ও সংহতি জানান।
স্কপের ভারপ্রাপ্ত সমন্বয়কারী চট্টগ্রাম বন্দর সিবিএর সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখ নুরুল্লাহ বাহার, সিপিবি জেলা সভাপতি অশোক সাহা, গণমুক্তি ইউনিয়ন জেলা সভাপতি রাজা মিঞা, বাসদ জেলা ইনচার্জ আল কাদেরি জয়, সাম্যবাদী আন্দোলন জেলা সমন্বয়ক শাহীন মঞ্জুর।
সমাবেশ অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি তপন দত্ত, শ্রমিকনেতা মৃণাল চৌধুরী, বাংলাদেশ শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এস কে খোদা তোতন, শ্রমিক নেতা মসিউদৌল্লা এবং স্কপের যুগ্ম সমন্বয়কারী রিজওয়ানুর রহমান খান।
সমাবেশ শেষে একটি মশাল মিছিল পুরাতন স্টেশন থেকে শুরু হয়ে নিউমার্কেট এসে শেষ হয়।
আগের খবর:
বন্দর ইজারার উদ্যোগ বন্ধের দাবিতে গণঅনশন, কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি স্কপের