১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৪ কার্তিক ১৪৩৩

ব্যাটিং ব্যর্থতার আরও একটি খতিয়ান

এই বছর ১৪টি পূর্ণাঙ্গ টেস্ট ইনিংসের ১১টিতেই তিনশ করতে পারেনি বাংলাদেশ। এবার চট্টগ্রামেও মুখ থুবড়ে পড়েছে ব্যাটিং।

ক্রীড়া প্রতিবেদক

চট্টগ্রাম থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 15 Dec 2022, 10:56 PM

Updated : 15 Dec 2022, 10:56 PM

একই উইকেট, কিন্তু দিনের দুই ভাগে যেন দুইরকম। দিনের প্রথম দেড় সেশনে মনে হলো, উইকেট খুব কঠিন নয়। পরের দেড় সেশনে আবার উল্টো চিত্র। উইকেট এবার মোটেও সহজ নয়! রাতারাতি উইকেটের চরিত্র নিশ্চয়ই বদলে যায়নি। তবে বদলে গেছে দল। তাই চিত্রও ভিন্ন! বিশেষজ্ঞ ব্যাটসম্যান না হয়েও যে উইকেটে অনায়াসে ব্যাটিং করলেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন আর কুলদিপ যাদব, সেখানেই ধুঁকলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা।  তাই উইকেটে নয়, পার্থক্যটা স্কিলে, মানসিকতায়, নিবেদনে।

নতুন কিছু অবশ্য নয়। বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে এই ঘাটতিগুলো বহুদিনের। চট্টগ্রাম টেস্টের দ্বিতীয় দিন সেটিরই ধারাবাহিকতা। এই বছরের শুরুতে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে মাউন্ট মঙ্গানুই টেস্টে স্মরণীয় সেই জয়ের ভিত গড়ে দিয়েছিল দলের দৃঢ়তাপূর্ণ ব্যাটিং। কিন্তু এরপর থেকেই এই সংস্করণে দলের পারফরম্যান্সে যে দীনহীন অবস্থা, সেটির মূল কারণ ব্যাটিং ব্যর্থতা।

একটির হাত ধরে আরও কয়েকটি উইকেট পড়ে যাওয়া, আচমকা হুড়মড়িয়ে ইনিংস ভেঙে পড়া কিংবা বিপর্যয়, টেস্টে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের নিয়মিত অনুসঙ্গ এসব। ডারবানে ৫৩, পোর্ট এলিজাবেথে ৮০, মিরপুরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দুই দফা ধসে ১৬৯ রানে গুটিয়ে যাওয়া, অ্যান্টিগায় ১০৩, সেন্ট লুসিয়ায় ১৮৬, বাংলাদেশের ব্যাটিং জীর্ণতার একেকটি প্রতিচ্ছিবি। এ বছর বাংলাদেশের ১৪টি পূর্ণ ইনিংসের ১১টিতেই দলকে ৩০০ এনে দিতে পারেননি ব্যাটসম্যানরা।

 তেমনই এক ব্যাটিং বিপর্যয়ের মঞ্চায়ন আবার হলো চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামে।

ব্যাটিং ধস নতুন না হলেও বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইন আপে যদিও এ দিন নতুনত্ব ছিল। উদ্বোধনী জুটি যেমন ছিল নতুন। অভিষিক্ত জাকির হাসানের সঙ্গে ইনিংস শুরু করেন নাজমুল হোসেন শান্ত। প্রথমবার তিনে ব্যাট করার সুযোগ দেওয়া হয় ইয়াসির আলি চৌধুরিকে। এই বছর টেস্টে দারুণ পারফর্ম করা লিটন কুমার দাসকে পুরস্কার দেওয়া হয় প্রথমবার চারে উঠিয়ে এনে।

কিন্তু পারফরম্যান্সে বদল আসেনি। টপ অর্ডারে কোনো জুটি গড়া হয়নি। মিডল অর্ডারে মুশফিকুর রহিম ও সাকিব আল হাসানের মতো অভিজ্ঞরাও হতাশা করেছেন।

ব্যর্থতার মিছিল শুরু ইনিংসের প্রথম বল থেকেই। মোহাম্মদ সিরাজের অফ স্টাম্প ঘেঁষা বলের জবাব পাননি নাজমুল হোসেন শান্ত। ডেলিভারিটি বেশ ভালো ছিল। কিন্তু টেস্টে একজন টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানকে জানতে হবে তার অফ স্টাম্প কোথায়, এটি একদম মৌলিক ব্যাপার।

ইয়াসির যে বলে আউট হয়েছেন, তা ছেড়ে দেওয়া যেত অনায়াসেই। কিন্তু শরীর থেকে আলসে ভঙ্গিতে দূরে ব্যাট চালিয়ে তিনি বল টেনে এনেছেন স্টাম্পে। অভিষিক্ত জাকির হাসান শুরুর স্নায়ুর চাপটুকু সামলে পরে আউট হয়ে গেছেন বাইরের বলে অযথা খোঁচা দিয়ে।

লিটনের শুরুটা হয় দুর্দান্ত। উমেশ যাদবের দুই ওভারে ৭ বলের মধ্যে ৫টি চার মারেন তিনি নান্দনিক সব শটে। কিন্তু সিরাজের সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে তিনি হেরে যায়। একটু কথার লড়াইয়ের পরের বলেই বোল্ড হয়ে যান তিনি, হয়তো নড়ে যায় তার মনোযোগ।

বিপর্যয়ে যখন ভরসার ছাতা মেলে ধরার কথা সাকিব আল হাসানের, বাংলাদেশের অধিনায়ক তখন উইকেটে গিয়ে ছটপট করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত উইকেট বিলিয়ে ফেরেন। লিটনের মতো শুরুটা দারুণ করেন মুশফিকুর রহিমও। দারুণ কয়েকটি সুইপ খেলেন তিনি, উইকেটে খুব একটা অস্বস্তি তার ব্যাটিংয়ে দেখা যায়নি। কিন্তু স্পিনের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা বলে বিবেচিত অভিজ্ঞ এই ব্যাটসম্যান আউট হন স্পিন সামলাতে না পেরেই। কুলদিপ যাদবের বলটি টার্ন খুব বেশি করেনি। মুশফিক ব্যর্থ হন বোলারের হাত থেকে বল পড়তে।

ক্রিজে গিয়ে তিনটি বাউন্ডারিতে পাল্টা আক্রমণের ইঙ্গিত দেওয়ার পর নুরুল হাসান সোহানও শিকার কুলদিপের।

দল নির্বাচন কিংবা ব্যাটিং অর্ডার নিয়ে হয়তো টুকটাক কিছু প্রশ্ন তোলা যায়। শান্তকে নেওয়া কিংবা ওপেনিংয়ে নামানো, হুট করে ইয়াসিরকে তিনে খেলানোর প্রক্রিয়াকে প্রশ্নব্ধি করা যায়। কিন্তু ‘অমুকের বদলে তমুক’ করেই তো চলছে বারবার। সমস্যাটা তো আর বিশাল, আরও বিশদ।

উইকেটে টার্ন কিছু মিলেছে, অসম বাউন্সও ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের স্কোরকার্ড যেমন বলছে, অতটা ভয়ঙ্কর ছিল না মোটেও। দায়টা মূলত বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদেরই। তাদের স্কিলের ঘাটতি তো কিছু ছিলই, তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি ছিল মানসিকতায়। লড়াই করা, হাল না ছাড়া, উইকেট আঁকড়ে রাখার মানসিকতাই দেখা যায়নি কারও মধ্যে।

ভারতের ইনিংসে চেতেশ্বর পুজারা যেভাবে উইকেটে গিয়ে সময় কাটিয়েছেন, আস্তে আস্তে ইনিংস গড়েছেন দলের ঢাল হয়ে, প্রতিপক্ষ ও পরিস্থিতির চাপ যেভাবে শুষে নিয়েছেন, শ্রেয়াস আইয়ার সহজাত ব্যাটিং করলেও যতটা শৃঙ্খলাবদ্ধ ছিলেন এবং বাংলাদেশের দেওয়া জীবনগুলো কাজে লাগিয়েছেন, সেসবের ছিটেফোঁটা ছিল না বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে।

ম্যাচের পর সেসব কথা তুলে ধরলেন রঙ্গনা হেরাথও। এমনিতে খুব একটা স্পষ্টভাষী বা খোলামেলা বক্তা হিসেবে পরিচিতি নেই তার। তবে এ দিন সংবাদ সম্মেলনে হতাশাটা লুকালেন না বাংলাদেশের স্পিন কোচ।

“টেস্ট ক্রিকেট সহজ নয়। স্কিল, টেম্পারামেন্ট, ধৈর্য ও মানসিকতার পরীক্ষা এখানে সবসময়ই হয় এবং নানা রকম পরিস্থিতি আসে। কঠিন পরিস্থিতি এলে তুমুল লড়াই করতে হয় এবং সেই মানসিক দৃঢ়তা থাকতে হয়।”

শ্রীলঙ্কার হয়ে ৯৩ টেস্ট খেলা এই সাবেক স্পিনারের মতে, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের মূল সমস্যাটা শট নির্বাচনে। ঘাটতিটা মানসিকতায়।

“যখন আমরা কিছুটা মোমেন্টাম পেয়েছি, কোনো না কোনোভাবে আমরা তা হারিয়ে ফেলেছি। ব্যাপারটা টেকনিকের সমস্যা বলে মনে হয় না আমার, ব্যাপারটি হলো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার।”

“ক্রিকেটের ক্ষেত্রে কৌশলী হতে হয়। ব্যাটসম্যান হোক বা বোলার, মাঠে নামলে টেম্পারমেন্ট থাকতে হয়, যা সবসময় মন ও মাথা থেকে আসতে হয়। সামর্থ্য কিংবা স্কিলে সমস্যা নেই, ব্যাপারটি হলো মাঠে নেমে আরও মানসিক দৃঢ়তা দেখানো ও লড়াই করা। এখানে কিছুটা সময় কাটাতে পারলে, পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়ে আসে। সেই সময়টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় এবং লড়াই করে ক্রিজে থাকতে হয়।”

সেই লড়াইটুকু করতে পারেনি বাংলাদেশ। পাঁচ দিনের ম্যাচের দুই দিন যেতে না যেতেই তাই ভালো কিছুর সম্ভাবনা এখন মৃত্যুশয্যায়। সেখান থেকে সম্ভাবনাগুলোকে জাগিয়ে তোলা খুব কঠিন। তার পরও চেষ্টা তো করে যেতেই হবে।

সেই চেষ্টার মূল উপকরণও জানিয়ে দিলেন রঙ্গনা হেরাথ, “(সামনে) আমরা যেটাই করি না কেন, নিবেদনটা ঠিকঠাক রাখতে হবে।”