১১ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩

হাসানের হ্যাটট্রিক, মুশফিক-শান্তর জুটিতে বাংলাদেশের দারুণ দিন

দিনের শুরুতে হাসান মাহমুদ ও ইবাদত হোসেনের বোলিং নৈপুণ্যের পর মুশফিকুর রহিম ও নাজমুল হোসেন শান্তর ব্যাটে শক্ত অবস্থানে বাংলাদেশ।

হাসানের হ্যাটট্রিক, মুশফিক-শান্তর জুটিতে বাংলাদেশের দারুণ দিন

উইকেট উপদযাপন করছে বাংলাদেশ। ছবি: আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ড

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 11 Oct 2026, 08:08 PM

Updated : 11 Oct 2026, 08:08 PM

টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় দিনকে বলা হয় ‘মুভিং ডে।’ এই দিনই মোটামুটি ঠিক হয় ম্যাচের সম্ভাব্য ফল। চলতি আবু ধাবি টেস্টে ব্যাটে-বলে দাপট দেখিয়ে এই দিনটি নিজেদের করে নিল বাংলাদেশ।

ম্যাচের তৃতীয় দিন শেষে ৩২৯ রানে এগিয়ে সফরকারীরা। দ্বিতীয় ইনিংসে তাদের সংগ্রহ ৬ উইকেটে ২২৩ রান। দিনের শুরুতে হাসান মাহমুদ ও ইবাদত হোসেনের নৈপুণ্যে আফগানিস্তানকে ২৪০ রানে গুটিয়ে দেয় তারা।

বাংলাদেশকে ১০৬ রানের লিড এনে দেওয়ার মূল কারিগর হাসান। সাম্প্রতিক সময়ে দারুণ ছন্দে থাকা পেসার এদিন পান ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিকের স্বাদ। তার সঙ্গে ইবাদতও উইকেট শিকারের উৎসবে যোগ দিলে দ্বিতীয় নতুন বলে ২১ রানের মধ্যে শেষ ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলে আফগানিস্তান।

পরে টপ-অর্ডার ব্যর্থ হলেও চতুর্থ উইকেটে বড় জুটি গড়েন মুশফিকুর রহিম ও নাজমুল হোসেন শান্ত। শেষ বিকেলে দ্রুত ৩ উইকেট পড়ে গেলেও দুজনের ব্যাটে তিনশ পেরিয়ে যায় বাংলাদেশের লিড।

৭২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি নিয়ে রোববারের খেলা শুরু করেন রেহমাত শাহ ও ইকরাম আলি খিল। দিনের দ্বিতীয় ওভারেই দ্বিতীয় নতুন বল নিয়ে নেয় বাংলাদেশ। আর নতুন বল দারুণভাবে কাজে লাগান দুই পেসার হাসান ও ইবাদত।

দিনের তৃতীয় ওভারে চমৎকার ডেলিভারিতে ইকরামকে বোল্ড করেন ইবাদত। ৩২ রান করে ফেরেন আফগান উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান। তার বিদায়ে ভাঙে ইনিংসের সর্বোচ্চ ৮০ রানের জুটি।

এরপর হাসানের জাদু। ওভারের তৃতীয় বলে হালকা নিচু হয়ে ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে বোল্ড ইসমাত আলম। পরের বলটি অফ স্টাম্পের আরেকটু বাইরে করেন হাসান। এবার ভেতরে ঢোকার মুখে খোঁচা মারেন কাইস আহমাদ। ডান দিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচ নেন লিটন কুমার দাস।

দ্রুত ৩ উইকেট পড়ে যাওয়ায় যেন কিছুটা অপ্রস্তুতই হয়ে পড়েন জিয়া-উর-রেহমান। তড়িঘড়ি করে ব্যাটিংয়ে নামেন তিনি। ক্রিজের কাছাকাছি এসে ঠিক করেন প্যাড-গ্লাভস। তবে বেশিক্ষণ তাকে থাকতে হয়নি মাঠে।

অফ স্টাম্পের কিছুটা বাইরে পিচ করে দারুণ মুভমেন্টে ভেতরে ঢোকান হাসান। এই ডেলিভারির জবাব জানা ছিল না জিয়ার। বল প্যাডে লাগতেই জোরাল আবেদন। তবে সাড়া দেননি আম্পায়ার। রিভিউ নিয়ে সফল হয় বাংলাদেশ। আর হ্যাটট্রিকের আনন্দে মাতেন হাসান।

টেস্ট ক্রিকেট বাংলাদেশের প্রথম পেসার ও সব মিলিয়ে তৃতীয় বোলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করলেন তিনি। এর আগে ২০০৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে অলক কাপালী ও ২০১৩ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে সোহাগ গাজী পেয়েছিলেন একই অর্জনের স্বাদ।

দুই ওভার পর ইয়ামিন আহমাদজাইকে কট বিহাইন্ড করে ক্যারিয়ারের চতুর্থ ৫ উইকেট নেন হাসান। একইসঙ্গে পূর্ণ হয় টেস্ট ক্যারিয়ারের ৫০ উইকেট।

একের পর এক সঙ্গীর আসা-যাওয়ার মিছিলে অন্য প্রান্তে অটল ছিলেন রেহমাত। হাসানের বলে ছক্কা ও চার মেরে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন আফগান অধিনায়ক।

পরের ওভারে মোহাম্মদ সালিম সাফিকে উইকেটের পেছনে ক্যাচ বানিয়ে স্বাগতিক ইনিংস গুঁড়িয়ে দেন ইবাদত। শতরানের লিড পেয়ে যায় বাংলাদেশ।

সকালের সেশনে ১০.১ ওভারে মাত্র ২৯ রান করতেই বাকি থাকা ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলে আফগানরা। শেষ পর্যন্ত ১০ চার ও ২ ছক্কায় ২১৬ বলে ১০৫ রানে অপরাজিত থেকে যান রেহমাত।

আফগানিস্তানের পাঁচ ব্যাটসম্যান আউট হন শূন্য রানে। বাংলাদেশের বিপক্ষে এক ইনিংসে পাঁচ জনের শূন্য রানে আউট হওয়ার দ্বিতীয় ঘটনা এটি। ২০০৮ সালের সেঞ্চুরিয়ন টেস্টের একমাত্র ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকার পাঁচ ব্যাটসম্যানকে শূন্য রানে ফিরিয়েছিল বাংলাদেশ।

দ্বিতীয় নতুন বলে জাদুকরী বোলিং করে ৫৫ রানে ৫ উইকেট নেন হাসান। ইবাদতের শিকার ৫৬ রানে ৪ উইকেট।

বড় লিড পেয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে খেলতে নেমে শুরুটা একদমই ভালো করতে পারেনি বাংলাদেশ। অষ্টম ওভারে সালিমের শর্ট বল পুল করার চেষ্টায় ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দেন সাদমান ইসলাম। তিন ওভার পর ইয়ামিনের বলে স্লিপে ধরা পড়েন মুমিনুল হক।

প্রথম ইনিংসের মতো এবারও ইতিবাচক শুরু করেন তানজিদ হাসান। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারেননি বাঁহাতি ওপেনার। ইয়ামিনের অফ স্টাম্পের বাইরের ডেলিভারি অহেতুক খোঁচা মেরে ফেরেন তিনি। ৩৮ বলে ৬ চারে করেন ৩১ রান।

৫৩ রানে ৩ উইকেট হারিয়ে তখন চাপে পড়ে যায় বাংলাদেশ। প্রতিরোধ গড়ার অভিযানে শুরুতে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়েন শান্ত ও মুশফিক। নিজের ইনিংসের শুরুতেই আম্পায়ার্স কলের সৌজন্যে বেঁচে যান শান্ত।

কিছুক্ষণ পর জিয়ার বলে সুইপ করতে গিয়ে ব্যাটে খেলতে পারেননি শান্ত। বল প্যাডে লাগতেই জোরাল আবেদনে আঙুল তুলে দেন আম্পায়ার। শেষ মুহূর্তে গিয়ে রিভিউ নেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তাতেই বেঁচে যান তিনি।

রিভিউ নিয়ে সফল হন মুশফিকও। তিনি ফিফটি পেরোনোর পর জিয়ার বলে তাকে এলবিডব্লিউ দেন আম্পায়ার। তবে ব্যাটে লেগেছে বুঝতে পেরে তৎক্ষণাৎ রিভিউ নেন অভিজ্ঞ ব্যাটার। রিপ্লে দেখে সিদ্ধান্ত বদলে দেন থার্ড আম্পায়ার।

আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করে টিকে দুজনই খেলেন পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংস। দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে একপ্রান্ত আগলে রাখেন শান্ত। আর মুশফিক নেন রানের চাকা সচল রাখার দায়িত্ব। দুজনের লম্বা জুটিতে ৩০৩ বলে আসে ১৫৯ রান।

দিনের খেলা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ভাঙে এই জুটি। জিয়ার শর্ট বলে কিপারের মাথার ওপর দিয়ে খেলার চেষ্টায় স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বসেন মুশফিক। ক্যারিয়ারের ৩০তম ফিফটির ইনিংসটি থামে ৯ চারে ৮১ রানে।

দুই ওভার বাকি থাকতে কাইসের দারুণ ডেলিভারিতে বোল্ড হন শান্ত। তার ব্যাট থেকে আসে ১৯১ বলে ৮২ রান। সবশেষ তিনটি পঞ্চাশছোঁয়া ইনিংসেই আশি পেরিয়েও সেঞ্চুরির আগে থামলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।

পরে দিনের শেষ ওভারে হাসানকে ফিরিয়ে দেন জিয়া। বড় লিডের সুবিধা সঙ্গে নতুন দিনের খেলা শুরু করবেন মেহেদী হাসান মিরাজ ও লিটন।

সংক্ষিপ্ত স্কোর

বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৩৪৬

আফগানিস্তান ১ম ইনিংস: (আগের দিন ২১১/৪) ৮৯.১ ওভারে ২৪০ (রেহমাত ১০৫, ইকরাম ৩২, ইসমাত ১, কাইস ০, জিয়া ০, ইয়ামিন ০, সালিম ০; হাসান ২১-৫-৫৫-৫, ইবাদত ১৫.১-৩-৫৬-৪, মিরাজ ২১-৭-৪১-১, তাইজুল ২১-৪-৪৪-০, নাঈম ১০-০-৩৭-০, মুমিনুল ১-০-৬-০)

বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৭২ ওভারে ২২৩/৬ (সাদমান ১৩, তানজিদ ৩১, মুমিনুল ৭, শান্ত ৮২, মুশফিক ৮১, লিটন ৫*, হাসান ১, মিরাজ ০*; ইয়ামিন ১১-১-৪২-২, সালিম ১৩-৩-৩৯-১, ইসমাত ৩-০-৯-০, জিয়া ২৩-৩-৫৫-২, কাইস ৭-০-৩৬-১, মালিক ৩-১-৯-০, শাহিদি ১২-০-৩২-০)