সূর্যের আলোয় ঝলমলে বিশ্বকাপ
এই বছর টি-টোয়েন্টিতে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পাশাপাশি বিশ্বকাপও মাতাচ্ছেন ভারতীয় ব্যাটসম্যান সূর্যকুমার যাদব।
মেঘলা আকাশ, শীতল বাতাস আর বৃষ্টি। বিশ্বকাপের শুরু থেকে এবার এসবই অনুষঙ্গ। ম্যাচের পর ম্যাচে সূর্যের মুখ না দেখে কত জনের মন ভার, কত দলের হাহাকার! তবে একটি সূর্য ঠিকই জ্বলে উঠেছে ম্যাচের পর ম্যাচ। সেই সূর্যের তেজে জ্বলে পুড়ে খাক বোলাররা। ভারতের সূর্যকুমার যাদব!
এই বিশ্বকাপ চলার সময়ই টি-টোয়েন্টি ব্যাটসম্যানদের র্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষে উঠে আসেন তিনি। তবে আনুষ্ঠানিক সেই স্বীকৃতির আগে থেকেই অনেকের চোখে এই সংস্করণে বিশ্বের এক নম্বর ব্যাটসম্যান সূর্যকুমার। এই বিশ্বকাপের পারফরম্যান্স ও এখনকার র্যাঙ্কিং কেবল ওই সত্যকেই আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০ ওভারের ক্রিকেটে এখন তিনিই বিশ্বসেরা।
বিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা, লোকেশ রাহুলদের নিয়ে তারকায় ঠাসা ভারতের ব্যাটিং লাইন আপে আলাদা করে নজর কাড়া সহজ নয় মোটেও। কিন্তু ব্যাটিং দ্যুতিতে এখন সবচেয়ে উজ্জ্বল তারকা সূর্যকুমারই। এই বছরে যেমন, তেমনি এই বিশ্বকাপেও।
বিশ্বকাপে এবার এখনও পর্যন্ত ৫ ম্যাচ খেলে তার রান ২২৫। গড় ৭৫, স্ট্রাইক রেট ১৯৩.৯৬। এই আসরে অন্তত ৫০ বল খেলেছেন, এমন ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সূর্যকুমারের কাছাকাছি স্ট্রাইক রেটও নেই কারও।
বিশ্বকাপে এমন কিছু অবশ্য তার কাছে প্রত্যাশিত ছিল। বছরজুড়ে পারফরম্যান্স যে অসাধারণ! এই বছর এখনও পর্যন্ত ২৮ ইনিংসে তার রান ১ হাজার ২৪। গড় ৪৪.৬০, স্ট্রাইক রেট ১৮৬.৫৬।
এক পঞ্জিকাবর্ষে অন্তত ৫০০ রান করেছেন এখনও পর্যন্ত ৪৮ জন। ১৮০ ছোঁয়া স্ট্রাইক রেট তাদের মধ্যে কেবল সূর্যকুমারের। এক বছরে ছক্কার ফিফটির প্রথম নজির গড়ে তিনি এগিয়ে চলেছেন আরও (৫৯টি)।
সবকিছু মিলিয়েই তাকে নিয়ে প্রত্যাশা ছিল তুমুল। তবে প্রত্যাশা থাকা এক ব্যাপার, বিশ্ব আসরের মতো মঞ্চে সেই প্রত্যাশা পূরণ করা আরেক ব্যাপার। প্রত্যাশা আর প্রাপ্তিতে এক বিন্দুতে মিলিয়েই সূর্যকুমার নিজেকে নিয়ে গেছেন শীর্ষবিন্দুতে।
অ্যাডিলেইড ওভালের ২২ গজে বৃহস্পতিবার সূর্যকুমারের ব্যাট যদি ঝলসে ওঠে আরেকবার, মেলবোর্নের ফাইনালের আলোর দেখাও পেয়ে যাবে হয়তো ভারত। ইংল্যান্ড যদি পেতে চায় ফাইনালের সেই আলোর দেখা, সুর্যকুমারকে নিভিয়ে দিতে হবে দ্রুত।
কাজটা কঠিন। কোনো ছকে যে তাকে বাঁধা যায় না!
তার রেকর্ড, তার পরিসংখ্যান, দুর্দান্ত স্ট্রাইক রেট, এই সবকিছুতে তাকে কিছুটা বোঝা যায় বটে। তবে তাকে নিয়ে এত আলোড়ন, তাকে সেরা মানার এত আয়োজন স্রেফ ওই সংখ্যাগুলোর জন্য নয়। সংখ্যাগুলির জন্ম যেভাবে দিয়েছেন বা দিয়ে চলেছেন তিনি, তাকে আলাদা করে তুলেছে সেটিই।
টি-টোয়েন্টিতে আগ্রাসী ব্যাটিং, ভয়ডরহীন মানসিকতা, শুরু থেকেই ধুন্দুমার ব্যাট চালানো, এসব তো হয়েই আসছে। গত এক বছরে এসবকেই নতুন উচ্চতায় তুলে নিয়েছেন সূর্যকুমার। যে কোনো বোলিং আক্রমণের সঙ্গে, যে কোনো উইকেট-কন্ডিশন, যে কোনো পরিস্থিতিতে নিজের ওই মানসিকতা ধরে রাখার রসদ ও স্কিলও আছে তার।
ক্রিকেটীয় প্রায় সব শট তো তার হাতে আছেই, উদ্ভাবনী নানা শটও নতুন মাত্রা পাচ্ছে তার হাত ধরে। অফ স্টাম্পের বাইরের প্রায় ওয়াইড বলকে ফাইন লেগ দিয়ে গ্যালারিতে আছড়ে ফেলা, অফ স্টাম্পের বাইরের বলকে ফাইন লেগ দিয়ে বাউন্ডারিতে পাঠানো, এসব অদ্ভুতুড়ে কাজ তিনি করেন অবলীলায়। আক্ষরিক অর্থেই শট খেলেন মাঠের চারপাশে। তার অপ্রথাগত শটের প্রদর্শনী দেখে বারবারই মনে হয়, আর কিছু বুঝি বাকি নেই। কিন্তু পরের ম্যাচেই তিনি নতুন কোনো শটে চমকে দেবেন।
এখানেই তিনি এই সময়ের সেরা। অনন্য। স্কিল আর মানসিকতা মিলিয়ে অপ্রতিরোধ্য।
ক্রিকেটের নতুন ৩৬০ ডিগ্রি ব্যাটসম্যান তাকে বলা হচ্ছে অনেক দিন ধরেই। এই খেতাব যার নামের প্রতিশব্দ হয়ে আছে, সেই এবি ডি ভিলিয়ার্স নিজেও সম্প্রতি একরকম অনুমোদন করে দিয়েছেন সূর্যকুমারের এই তকমা। ডি ভিলির্য়াস তো বরং আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, ৩৬০ ডিগ্রির ব্যাটিংয়ের চেয়েও বেশি কিছু করার সামর্থ্য আছে ভারতীয় তারকার।
ভারত-ইংল্যান্ড সেমি-ফাইনালের আগে স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার তুঙ্গে তিনি। ম্যাচের আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে রোহিত শর্মা তুলে ধররেন, সূর্যকুমার কেন এতটা বিশেষ একজন।
“তার খেলার ধরনই এরকম। সে এমন একজন, আগের কোনোকিছু যে সঙ্গে বয়ে বেড়ায় না। বাড়তি চাপ, বাড়তি ভাবনা কখনোই তার মধ্যে দেখি না। তার খেলা দেখলেই তা বোঝা যায়। এমন নয় যে, দু-একটি টুর্নামেন্ট সে এভাবে খেলেছে। এক বছর ধরে এরকম ব্যাটিংই করে চলেছে সে এবং সেটা থেকেই তার ধরনটা বোঝা যায়।”
“সে তো সাক্ষাৎকারেও সবসময় বলে, দলের রান ২ উইকেটে ১০ হোক বা ২ উইকেটে ১০০, সে একই ঘরানায় সবসময় খেলতে চায়। ক্রিজে গিয়ে নিজেকে মেলে ধরতে চায় সে।”
অধিনায়ক হিসেবে রোহিত আরেকটি দিকও খুব ভালোভাবে জানেন, সূর্যকুমারের ব্যাটিংয়ে দলের অন্যদের কাজ কতটা সহজ হয়ে যায়।
“দারুণ পরিণত মানসিকতা দেখিয়েছে সে। যেভাবে সে খেলে, অনেকের ওপর থেকে চাপ সরিয়ে নেয় তা। অন্যদের ওপরও সেই প্রভাবটা পড়ে, তাকে ঘিরেই সবাই ব্যাট করে। তার খেলাটা আমরাও খুব ভালো বুঝি। সে ক্রিজে থাকলে বোলাররাও ভালো করতে চায়। এটা তাই সামগ্রিক একটা ব্যাপার।”
সূর্যকুমারের উত্তাপ ইংল্যান্ড আগেও টের পেয়েছে ভালোভাবে। গত জুলাইয়ে ট্রেন্ট ব্রিজে ইংলিশ বোলিং গুঁড়িয়ে তিনি ৫৫ বলে ১১৪ রানের স্মরণীয় এক ইনিংস খেলেন। ইংলিশদের বিপক্ষে ৫ বার ব্যাট করে ৪টিতেই তিনি খেলেন কার্যকর ইনিংস।
এই সবকটি ইনিংস উইকেটের পেছন থেকে দেখেছেন জস বাটলার। আইপিএলে তো দেখে আসছেন তিনি কবে থেকেই। ইংলিশ অধিনায়ক তাই ভালো করেই জানেন, কতটা বিপজ্জনক ব্যাটসম্যান সূর্যকুমার।
“তার ব্যাটিং দেখতে পারা দারুণ, তাই না? এখনও পর্যন্ত সম্ভবত সে টুর্নামেন্টের সেরা ব্যাটার। যে পরিমাণ স্বাধীনতা নিয়ে সে খেলে, এটাই সম্ভবত তার সবচেয়ে বড় শক্তি। সব ধরনের শট তো তার হাতে আছেই, সেসব শট সে খেলেও মাঠে নেমে। আমি যা দেখি, মানসিকভাবে সে দারুণ খোলামেলা।”
তবে প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্ব মেনে নিলেও লড়াইয়ের ময়দানে তো ছাড় দেওয়ার ব্যাপার নেই। যে রোমাঞ্চের রথ ছুটিয়ে এগিয়ে যান সূর্যকুমার, সেখানে বিপদ ঘাপটি মেরে থাকে প্রতিটি পদক্ষেপেই। সেই ঝুঁকিগুলোই কাজে লাগাতে চান বাটলার।
“দুনিয়ার যে কোনো ব্যাটসম্যানের জন্য উইকেট হারাতে কেবল একটি সু্যোগই লাগে। আমাদেরও সেরকম একটি সুযোগ লাগবে মরিয়াভাবে।”
সূর্যকুমার যেভাবে জ্বলছেন, বিপদে আসলে বোলাররাই। ইংল্যান্ড শুধু চাইবে, একটি দিনের জন্য মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ুক ভারতের সূর্য।
