‘আনকোরা’ আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে দাপুটে জয়ের চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের
অনেক পরিবর্তন নিয়ে প্রায় চার বছর পর টেস্ট খেলতে নামবে আয়ারল্যান্ড, শক্তি-সামর্থ্যে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশ।
সাধারণত টসের একটু আগে অভিষিক্ত ক্রিকেটারের মাথায় ক্যাপ পরিয়ে দেওয়াই রীতি। তবে ম্যাচের আগের দিন মুচকি হাসিতে অ্যান্ড্রু বালবার্নি বললেন, “আজকে রাতেই কিছু প্রেজেন্টেশনের পালা আমাদের সেরে ফেলতে হবে। কারণ, কালকে সকালে করতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে!” আইরিশ অধিনায়কের কথায়ই পরিষ্কার, অভিষেক হতে যাচ্ছে একগাদা ক্রিকেটারের। এই দলের সঙ্গেই নিজ আঙিনায় লড়বে বাংলাদেশ। চ্যালেঞ্জটা তাই এখানে স্রেফ ম্যাচ জেতাই নয়, বরং দাপট দেখিয়ে পার্থক্যটা বুঝিয়ে দিয়ে মাঠে রাজত্ব করার।
পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে এই লক্ষ্য পূরণের জন্য মাঠে নামছে বাংলাদেশ। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে ম্যাচ শুরু মঙ্গলবার সকাল ১০টায়।
২০১৭ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর আয়ারল্যান্ডের মাত্র চতুর্থ টেস্ট এটি। তৃতীয়টি ছিল প্রায় ৪ বছর আগে! সেই ম্যাচ থেকে এবার একাদশে ৭টি পরিবর্তন নিশ্চিতই। সেই ৭ জন যে স্কোয়াডেই নেই! তাদের স্কোয়াডের স্রেফ ৬ জনের আছে টেস্ট খেলার অভিজ্ঞতা। তার মানে, এবার অন্তত ৫ জনের অভিষেক নিশ্চিত। হতে পারে আরও বেশি।
বাংলাদেশের জন্য তাই বড় সুযোগ দেশের মাঠে টেস্ট জয়ের খরা ঘোচানোর। সেই ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে জিম্বাবুয়েকে মিরপুরে হারানোর পর দেশে আর জয় ধরা দেয়নি। এই সময়ে ৮ টেস্টের ৭টিতেই হারতে হয়েছে, একটি হয়েছে ড্র। হোয়াইটওয়াশড হতে হয়েছে এমনকি খর্বশক্তির ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কার কাছেও। এবার সেই ধারার অবসান ঘটানোর মোক্ষম সুযোগ।
ম্যাচের আগের দিন বাংলাদেশ দলের প্রতিনিধি হয়ে সংবাদ সম্মেলনে এসে অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ অবশ্য বললেন, সবশেষ সিরিজে ভারতকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছে দল, আইরিশদেরও তারা দেখছেন একইভাবে।
“আমরা সবাই অনেক সিরিয়াস। ম্যাচ যখন খেলা হয় দেখবেন না যে, ভারতের সঙ্গে খেললে অনেক সিরিয়াস থাকে বা আয়ারল্যান্ডের সঙ্গে খেললে ফোকাস কম থাকে। ফোকাস একই রকম থাকে। হয়তো আত্মবিশ্বাস অনেক বেশি কাজ করে অনেক সময়, অনেক সময় কম কাজ করে। প্রতিটা মানুষের আত্মবিশ্বাস কিন্তু ওঠা-নামা করে। এটা প্রতিটা মানুষের মানসিক ব্যাপার। সবসময় একই রকম আত্মবিশ্বাস থাকে না।”
শক্তি-সামর্থ্য ও নানা বাস্তবতায় আয়ারল্যান্ড অনেক পিছিয়ে থাকলেও বাংলাদেশ পূর্ণ শক্তির দলই ঘোষণা করেছে। এই টেস্ট শুরুর আগে দেশের ক্রিকেটে আলোচনার ঝড় উঠেছিল সাকিব আল হাসান ও লিটন কুমার দাসের আইপিএল খেলার অনাপত্তিপত্র পাওয়া বা না পাওয়া নিয়ে। শেষ পর্যন্ত এই টেস্ট খেলার জন্য অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়ককে রেখে দিয়েছে বিসিবি।
জাতীয় নির্বাচক কমিটির সদস্য ও সাবেক স্পিনার আব্দুর রাজ্জাক রোববার সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বলেন, আয়ারল্যান্ডকে দাপটে হারাতে ও দুই দলের শক্তির বড় ব্যবধান মাঠের ক্রিকেটে বুঝিয়ে দিতেই পূর্ণ শক্তির দল দিয়েছেন তারা।
সেই শক্তি অবশ্য একটু কমে গেছে ম্যাচের আগের দিন। চোটের কারণে ছিটকে গেছেন পেস আক্রমণের মূল অস্ত্র তাসকিন আহমেদ। খানিকটা শঙ্কা আছে তামিম ইকবালকে পাওয়া নিয়েও। তার ৭ বছর বয়সী ছেলে হুট করে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তবে যতদূর জানা গেছে, অভিজ্ঞ ওপেনার হয়তো শেষ পর্যন্ত খেলবেন।
তাসকিন-তামিম, দুজনই যদি নাও থাকেন, তার পরও আয়ারল্যান্ডকে হারাতে খুব একটা বেগ পাওয়ার কথা নয় বাংলাদেশের। শুধু টেস্ট ক্রিকেটেই আইরিশরা অনুভিজ্ঞ, তা নয়। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও তারা নিয়মিত খেলে না। গত প্রায় চার বছরে আয়ারল্যান্ডে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয়নি। দেশের বাইরে যারা খেলেন, তারা কেবল টুকটাক প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলতে পেরেছেন।
এই দলের ৬ জন সবশেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন ২০২১ সালে আইরিশদের ‘এ’ দলের হয়ে বাংলাদেশে এসে। অধিনায়ক বালবার্নি সবশেষ লাল বলে খেলেছেন ২০২১ সালের এপ্রিলে কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে। এবার স্রেফ দুই দিনের অনুশীলনে বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার চ্যালেঞ্জে নামছেন তারা।
অধিনায়ক বালবার্নি তাই বললেন, অনেকটা অভিষেকের মতোই অনুভূতি হচ্ছে তার। জয়ের কথা তিনি মুখেও আনলেন না। তাদের জন্য টেস্ট ম্যাচটি মূলত কিছু শেখার আর নিজেদের মেলে ধরার প্রচেষ্টা।
“আমাদের ছেলেদের অনেকেই প্রথম শ্রেণির ম্যাচ বেশি খেলেনি। পাঁচ দিনের টেস্ট ম্যাচ খেলা মানে পুরো ভিন্ন ব্যাপার। আমাদের ছেলেরা মূলত সাদা বলে খেলে বেড়ে ওঠে। এখানে ব্যাটসম্যানদের যতটা বেশি সম্ভব লম্বা সময় ব্যাট করার চেষ্টা করতে হবে। বোলারদের গোছানো বোলিং করতে হবে। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে। কন্ডিশনের চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই, বিশেষ করে এই গরমে। ছেলেদের তাই চেষ্টা করতে করতেই শিখতে হবে।”
এত কম টেস্ট খেলায় এবং এত লম্বা বিরতির পর নিজেদের শক্তি-দুর্বলতা নিয়ে সঠিক ধারণা নেই স্বয়ং আইরিশ অধিনায়কেরই।
“টেস্ট ক্রিকেট যখন একদমই খেলছি না, একটি ব্র্যান্ড গড়ে তোলাও তাই কঠিন। আমাদের খেলে দেখতে হবে আমরা কেমন করি। আপাতত আমরা জটিল করে ভাবতে চাই না। দিনশেষে লড়াইটি ব্যাট বনাম বলের। যখন আমরা কিছু ম্যাচ খেলব, তার পর বলতে পারব যে আমরা অমুক জায়গায় ভালো, তমুক জায়গায় ততটা ভালো না। আপাতত স্রেফ নিজেরা যতটুকু পারি, সেখানে মনোযোগ দিতে চাই।”
আয়ারল্যান্ডের জন্য প্রেরণা হতে পারে একই সঙ্গে টেস্ট মর্যাদা পাওয়া আরেক দল আফগানিস্তান। ২০১৯ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে প্রথম দেখায় দারুণ এক জয় পেয়েছিল আফগানরা। তবে তাদের বড় শক্তি ছিল রশিদ খানের নেতৃত্বে দুর্দান্ত এক স্পিন আক্রমণ। এখানে বড় ঘাটতি আছে আইরিশদের। তাদের এক স্পিনার অ্যান্ডি ম্যাকব্রাইন টেস্ট খেলেছেন দুটি, সবশেষ প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলেছেন ২০১৯ সালে। অন্য দুই স্পিনার ম্যাথু হামফ্রিজ ও বেন হোয়াইট এখনও পর্যন্ত প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলারই স্বাদ পাননি।
বাংলাদেশের জন্য প্রেরণা হতে পারে এই মিরপুরে সবশেষ ম্যাচটি। গত ডিসেম্বরে সেই ম্যাচে দারুণ এক জয়ের কাছাকছি পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশ। শেষ পর্যন্ত অষ্টম উইকেটে দারুণ জুটিতে ভারত জিতে যায় ৩ উইকেটে। তবে রোহিত শর্মার দলকে হারানোর সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে পারলে আইরিশদের বিপক্ষে বড় জয় না পাওয়ার কারণ নেই।
তবে খেলাটা ক্রিকেট, যেখানে অনিশ্চয়তাটুকুই সবচেয়ে বড় সত্যি। কে জানে, মিরপুরে সেই চিরন্তন রূপ নিয়ে হাজির হয় কি না ক্রিকেট!
