বিপিএল
ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাইয়ে নিজেদের ভুল মেনে নিয়ে বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীন বললেন, ভবিষ্যতে শতভাগ সতর্ক থাকবে বোর্ড।
Published : 03 Mar 2025, 09:55 PM
চিটাগং কিংসের ‘মেন্টর’ শাহিদ আফ্রিদির পারিশ্রমিক বকেয়া থাকার ঘটনায় বাংলাদেশ ক্রিকেটের ও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করে বিসিবি। নিজেদের দায়ও এখানে তারা মেনে নিচ্ছেন। ফ্র্যাঞ্চাইজি বাছাইয়ে বড় ভুল হয়েছে, অকপটে মেনে নিয়ে বিসিবি পরিচালক নাজমুল আবেদীনের প্রতিশ্রুতি, ভবিষ্যতে তারা এসব ব্যাপারে শতভাগ সতর্ক থাকবেন।
এবারের বিপিএলে বিতর্ক যেন ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ।’ আসর শেষে অনেকটা সময় গড়িয়ে যাওয়ার পর যখন মনে হচ্ছিল সবকিছু আপাতত আড়াল, তখনই প্রকাশ্যে আসে শাহিদ আফ্রিদির ঘটনা। সাবেক পাকিস্তানি অধিনায়ক ও বিশ্ব ক্রিকেটের বড় এই তারকা রোববার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে জানান, তার সঙ্গে চুক্তির ১ লাখ ডলারের মধ্যে মাত্র ১৯ হাজার ডলার দেওয়া হয়েছে। চিটাগং কিংসের কর্ণধারের সঙ্গে অনেকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাড়া দেননি বলে জানান সাবেক এই অলরাউন্ডার।
আফ্রিদি শেষ পর্যন্ত বিসিবি প্রধান ফারুক আহমেদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। প্রয়োজনে দুই দেশের প্রধানকেও এটা নিয়ে লিখবেন বলে জানান তিনি।
বকেয়া রাখার কথা স্বীকার করে চিটাগং কিংসের কর্ণধার সামির কাদের চৌধুরি বলেন, “২১ হাজারের মতো দেওয়া হয়েছে। বাকিগুলোও পেয়ে যাবে, এমন তো নয় যে পাবে না। উনি তো আর ক্রিকেটার নন, উনারটা উনি পেয়ে যাবেন...।”
আফ্রিদির অভিযোগ নিয়ে রোববার থেকে দেশের ক্রিকেটে তোলপাড় পড়ে যায়। বিসিবির পরিচালনা পর্ষদর সভায় সোমবার আলোচনা হয় এটি নিয়ে।
সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি পরিচালক, ক্রিকেট পরিচালনা বিভাগের প্রধান ও বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব নাজমুল আবেদীন বলেন, এসব ক্ষেত্রে ভবিষ্যতের সুরক্ষা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছেন তারা।
“আফ্রিদির যে ব্যাপারটি, সবার জন্যই লজ্জার। একটা ব্যাপার হলো, একটা ফ্র্যাঞ্চাইজি কাকে নিয়ে আসবে, সেটা মেন্টর করে হোক, দলের প্রমোশনের জন্য হোক, সেখানে আসলে বোর্ড কিছু করতে পারে না। তবে দিনশেষে, এই ধরনের কর্মকান্ডগুলি শুধু বোর্ডকে নয়, দেশের মাথাও নিচু করে দেয়।”
“এটা অবশ্যই আমাদের নজরে এসেছে এবং আলোচনা হয়েছে যে, কীভাবে আমরা একটা ডিফেন্স মেকানিজম তৈরি করব, যেন কেউ চাইলেও ভবিষ্যতে এরকম করতে না পারে। নিয়মের বাইরে গিয়েও কিছু নিয়ম তৈরি করতে হতে পারে আমাদের, যাতে ক্রিকেট ক্ষতিগ্রস্ত না হোক বা দেশের সম্মান ক্ষতিগ্রস্ত না হোক।”
বিপিএল চলার সময়ও ক্রিকেটারদের পারিশ্রমিক সময়মতো না দেওয়া, জাতীয় ক্রিকেটার পারভেজ হোসেন ইমনকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্যে আলোচনায় ছিলেন চিটাগং কিংসের কর্ণধার। সেই সময় তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা বিসিবি নেয়নি।
এই ফ্র্যাঞ্চাইজিকে ছাড় দেওয়ার শুরু অবশ্য টুর্নামেন্ট শুরুর আগে থেকেই। ২০১২ ও ২০১৩ বিপিএলে অংশ নেওয়া দলটির কাছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি বাবদ ৯ কোটি টাকা পাওনা ছিল বিসিবির। সেই টাকা পরিশোধ না করা ও নানা বিতর্কের কারণে তাদেরকে আর বিপিএলে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। এবার দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পথ ধরে ক্রিকেট বোর্ডের নেতৃত্বেও পরিবর্তন আসার পর ফ্র্যাঞ্চাইজিটিকে ফিরিয়ে আনা হয়। পাওয়া ৯ কোটি টাকার তিন ভাগের প্রায় দুই ভাগ মওকুফ করে সাড়ে তিন কোটি টাকা দিতে বলা হয়। সেই টাকাও কিস্তিতে পরিশোধের অনুমতি দেওয়া হয়।
কেন তাদেরকে এত ছাড় দিয়ে বিপিএলে আনা হলো, সেটির উপযুক্ত উত্তর মেলেনি টুর্নামেন্ট চলার আগে বা চলার সময়। সোমবারের বোর্ড সভা শেষে নাজমুল আবেদীন নিশ্চিত করলেন, কমিয়ে দেওয়া সেই ফ্র্যাঞ্চাইজি ফি থেকেও এখনও টাকা বকেয়া রেখছে চিটাগং কিংস।
বিসিবি পরিচালক ও মিডিয়া কমিটির প্রথান ইফতেখার আহমেদ আবার সেই পুরোনো কথাই তুলে ধরে নিজের ভুলের কথা বলে সামনে তাকাতে চাইলেন।
“আগেও আমরা বলেছি, এই বিপিএলে আমরা সময় খুব কম পেয়েছিলাম, দেশের অবস্থার কারণে। সেই সময় আগ্রহও কম ছিল লোকজনের। অবশ্যই আমরাও কিছু ভুল করেছি, এটা গ্রহণ করছি। মূলত এটা হয়েছে সময় ছিল না বলে। এরকম যদি হতো যে, ২০ জনের আগ্রহ আছে (দল নিতে), তাহলে কিন্তু এরকম হতো না।”
“এখান থেকে বড় শিক্ষাটা হলো, আমরা সামনে তাকাতে চাই। আমরা কিন্তু কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজির টাকা ছাড় দেইনি। আমাদের থেকে যেটা পাবে, সেটা ধরে রেখে তাদের অ্যাকাউন্টস দেখতে চাচ্ছি, কাকে কী পেমেন্ট করেছে… আমাদের এটা করা উচিত নয়, তবু করছি বিপিএলের ভবিষ্যতের জন্য।”
চিটাগং কিংসের মতো বিতর্কিত ফ্র্যাঞ্চাইজি কিংবা টুর্নামেন্ট জুড়ে প্রবল বিতর্কের জন্ম দেওয়া দুর্বার রাজশাহীকে না এনে স্রেফ পাঁচ দলের বিপিএল আয়োজন করা যেত কি না, এমন প্রশ্ন উঠল। বিসিবি পরিচালক ইফতেখার আবারও ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে তাকানোর কথা বললেন।
“সমস্যা তো হয়ে হয়ে গেছে, এটা অস্বীকার করতে পারছি না। এখন সমস্যা থেকে বের হতে হলে, নিজের দেশ ও বিপিএলের সম্মান রক্ষার্থে, এবারের যা ভুল হয়েছে, তা সামনে যেন না হয়, এসব পরিকল্পনা হচ্ছে। পাশাপাশি এখন যেগুলো সমস্যা আছে, সেগুলো দেখার জন্য আমরা বোর্ডে সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাদের অ্যাকাউন্টস দেখব। হোটেল, লজিস্টিকস, বাস ভাড়া, কাদের তোমরা টাকা দিয়েছে, সব দেখব। আমরা আবার সেই কাগজ খতিয়ে দেখব। সবাইকে তারা যদি ক্লিয়ার না করে, তাহলে তাদের টাকা তো আমাদের কাছে ধরা আছে।”
“এটা আমাদের বড় শিক্ষা… এখন আমরা শুধু ভবিষ্যতে দেখছি। এখন আমরা আবার যদি এই ভুল করি… আমিসহ, যদিও এই সিদ্ধান্তে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না, তবে ভবিষ্যতে এই শিক্ষা নিয়েই আমি করব এবং আর এসব দেখবেন না আপনারা।”
ইফতেখারের পাশে বসা বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সদস্য সচিব নাজমুল এক পর্যায়ে মাইক্রোফোন নিয়ে নিজেদের ভুল-দায় সব মেনে নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিলেন ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার।
“এটা নিশ্চিত যে, আমরা ভুল ফ্র্যাঞ্চাইজি বেছে নিয়েছি। এখানে সময় নষ্ট করে লাভ নেই। অবশ্যই ভুল ফ্র্যাঞ্চাইজি বেছে নিয়েছি আমরা। কেউ হোটেল ভাড়া দিতে পারেনি, কেউ বাস ভাড়া দিতে পারেনি, এ পর্যায় পর্যন্ত গেছে। আমরা বাছাই করার সময় আশা করিনি যে, এই পর্যায়ে যেতে পারে।”
“আমরা জানতাম যে, আর্থিকভাবে সবাই একটু চাপের মধ্যে আছে, হয়তো কিছু দেরি হতে পারে কিছু জায়গায়, হয়তো গ্যারান্টি মানি পাব না ওইভাবে, তবে এটা যে এই পর্যায়ে যাবে, তা তো স্বপ্নেও ভাবিনি। ওই না ভাবতে পারার দায় আমাদের। এটা মেনে নিচ্ছি। খারাপগুলো যেন ভবিষ্যতে না হয়, এটা নিয়ে শতভাগ সতর্ক থাকব।”