৭ চার ৭ ছক্কায় হৃদয়ের আরেকটি বিধ্বংসী ইনিংসে কুমিল্লার জয়
খুলনা টাইগার্সকে উড়িয়ে দিল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স, ৫ দিন আগে সেঞ্চুরি করা হৃদয় এবার উপহার দিলেন ৪৭ বলে ৯১ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংস।
৫ দিন আগের অসাধারণ সেঞ্চুরির রেশ এখনও মিলিয়ে যায়নি। তবে তাওহিদ হৃদয়ের তাণ্ডব তো ফুরিয়েও যায়নি! মিরপুরের সেই ঝড়ো হাওয়া এবার চট্টগ্রামেও বইয়ে দিলেন তরুণ ব্যাটসম্যান। শুরুর দিকে সহজ ক্যাচ দিয়েও বেঁচে গিয়ে তিনি খেসারত পুরোপুরি বুঝিয়ে দিলেন খুলনা টাইগার্সকে। লক্ষ্য যথেষ্ট বড় ছিল না বলে এবার সেঞ্চুরি হয়নি। তবে আরও একটি খুনে ইনিংসে কুমিল্লাকে জয় এনে দিলেন হৃদয়।
বিপিএলে বুধবার খুলনা টাইগার্সকে ৭ উইকেটে হারিয়ে প্লে অফের দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে গেল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স।
চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরি স্টেডিয়ামের ব্যাটিং স্বর্গে খুলনার ১৬৪ রানের পুঁজি কুমিল্লার সামনে মামুলি হয়ে ওঠে হৃদয়ের ব্যাটিং তাণ্ডবে।
গত শুক্রবার মিরপুরে দুর্দান্ত ঢাকার বিপক্ষে ৫৭ বলে ১০৮ রানের অপরাজিত ইনিংসের পর চট্টগ্রামে গিয়ে প্রথম ম্যাচে আউট হয়ে যান তিনি শূন্যতে। এবার এই ম্যাচে আবার উত্তাল তার ব্যাট। ৭টি করে চার ও ছক্কায় তিনি অপরাজিত থেকে যান ৪৭ বলে ৯১ রান করে।
জাকের আলির সঙ্গে দারুণ জুটিতে ম্যাচ শেষ করে দেন তিনি ২১ বল আগেই। লক্ষ্য আরেকটু বড় হলে আরেকটি সেঞ্চুরি হয়তো দেখা যেত তার ব্যাটে!
সেঞ্চুরি না হলেও আসরের প্রথম ব্যাটসম্যান হিসেবে ৩০০ রানের সীমানা পেরিয়ে গেছেন ২৩ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। ৩৪১ রান নিয়ে এখন রানের তালিকায় তিনি সবার চেয়ে অনেকটা এগিয়ে। এখনও পর্যন্ত আসরের সর্বোচ্চ ১৯ ছক্কাও এসেছে তার ব্যাটেই।
অথচ এই হৃদয়কে ১২ রানেই ফেরাতে পারত খুলনা। নাসুম আহমেদের প্রথম বলেই সুযোগ দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু মিড অফে অতি সহজ সেই ক্যাচ নিতে পারেননি লুক উড। এরপর অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠেন হৃদয়।
উড নিজের বলেও একটি সুযোগ পেয়েছিলেন একদম ইনিংসের প্রথম ওভারে। তবে উইল জ্যাকসের মারে এতটাই জোর ছিল যে, ফলো থ্রুতে বল মুঠোয় জমানোর চেয়ে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টাই বেশি ছিল বাঁহাতি এই পেসারের।
দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই অবশ্য উইকেটের দেখা পেয়ে যায় খুলনা। এবারের আসরে প্রথম খেলতে নেমে প্রথম বলেই উইকেটের স্বাদ পান ওয়েইন পার্নেল। প্রোটিয়া বাঁহাতি পেসারের ডেলিভারিটি ছিল অবশ্য বেশ বাইরের হাফ ভলি। সেটিই কাভার পয়েন্টে তুলে দেন কুমিল্লা অধিনায়ক লিটন কুমার দাস।
পার্নেলের ওই ওভারেই দুটি ছক্কায় শুরুর চাপও যেন উড়িয়ে দেন উইল জ্যাকস। চতুর্থ ওভারে নাসুমের বলে ওই জীবন পাওয়ার পর হৃদয়ও তা উদযাপন করেন বিশাল এক ছক্কায়।
আগের ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান জ্যাকস এবার বিদায় নেন ১০ বলে ১৮ করে। গত বিপিএলের ফাইনালের ম্যাচ-সেরা জনসন চার্লস এবারের আসরে প্রথম খেলতে নেমে আউট হয়ে যান একটি করে চার ও ছক্কায় ১৩ করে।
তবে আরেক প্রান্তে হৃদয়ের ব্যাটে রানের এমনই জোয়ার ছিল যে, কোনো চাপেই পড়তে হয়নি কুমিল্লাকে। কখনোই মনে হয়নি তারা হারতে পারেন। স্রেফ প্রয়োজন ছিল হৃদয়কে কারও সঙ্গ দেওয়া। সেই কাজটি দারুণভাবে করেন জাকের। এই জুটিতেই শেষ হয়ে যায় খেলা।
২৯ বলে ফিফটির পর একই গতিতে এগিয়ে যান হৃদয়। মুকিদুল ইসলামের এক ওভারে দুই ছক্কা এক চারে রান নেন ১৮, নাহিদ রানার এক ওভারে এক ছক্কা দুই চারে আসে ১৬ রান।
জাকের শুধু সঙ্গই দেননি, সুযোগমতো ছক্কাও মেরে দেন ৩টি। জয়সূচক বাউন্ডারি আসে ম্যাচের নায়ক হৃদয়ের ব্যাটেই।
৩১ বলে ৪০ রানে অপরাজিত থাকেন জাকের। দুজনের অবিচ্ছিন্ন জুটিতে আসে ৫৪ বলে ৮৪ রান।
টস জিতে খুলনা ব্যাটিংয়ে নামে নতুন উদ্বোধনী জুটি নিয়ে। অ্যালেক্স হেলসের সঙ্গে ইনিংসের শুরুতে নামানো হয় ফর্মহীন আফিফ হোসেনকে। তবে ওপেনিংয়ে নেমেও ছন্দ পাননি তিনি।
হেলস শুরু করেন চেনা রূপেই। নতুন বলে শুরু করা স্বদেশী মইন আলিকে আছড়ে ফেলেন তিনি গ্যালারিতে। তবে আগের ম্যাচে ঝড়ো ফিফটি করা ইংলিশ ওপেনার এবার যেতে পারেননি অত দূর। ১৭ বলে ২২ রান করে বোল্ড হয়ে যান তিনি ম্যাথু ফোর্ডকে স্লগ করার চেষ্টায়।
তিনে নামা এনামুল হকের শুরুটা হয় চমকপ্রদ। প্রথম বলেই ফোর্ডকে এক্সট্রা কাভারের ওপর দিয়ে ছক্কায় উড়িয়ে দেন তিনি, পরের বলে ছক্কা মারেন ঠিক উল্টো দিক দিয়ে।
কিন্তু আরেকপ্রান্তে ধুঁকছিলেন আফিফ। এক পর্যায়ে তার রান ছিল ২৩ বলে ১৬। প্রথম ৮ ওভারে কেবল একটি বাউন্ডারি আসে তার ব্যাটে, সেটিও পরাস্ত হয়ে ব্যাটের কানায় লেগে।
পরে আলিস আল ইসলামকে স্লগ সুইপে ৯২ মিটার লম্বা ছক্কায় বল স্টেডিয়ামের বাইরে আছড়ে ফেলেন বটে। তবে এরপরও গতি পায়নি তার ইনিংস। আলিসের বলেই পায়ের পেছন দিয়ে বোল্ড হয়ে যান তিনি ৩৩ বলে ২৯ করে।
প্রথম দুই বলে ছক্কার পর এনামুলও একটু থমকে যান। স্টাম্প ঘেঁষা দারুণ ডেলিভারিতে খুলনা অধিনায়ককে (১৩ বলে ১৮) বিদায় করেন মুস্তাফিজুর রহমান।
বিপাকে পড়ে যাওয়া দলকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন এভিন লুইস ও মাহমুদুল হাসান জয়। ওপেনিং থেকে চারে নেমে এলেও স্বভাবজাত আত্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন লুইস। তার আগেই অবশ্য রিশাদ হোসেন ও মইন আলিকে ছক্কায় ওড়ান জয়। পরে মুস্তাফিজের লেংথ ডেলিভারিতে সোজা ব্যাটে ছক্কা মারেন লুইস।
তবে দুজনের কেউই পারেননি কাজ শেষ করতে। ১৯ বলে ২৮ রান করে ফেরেন জয়। মইনকে হাওয়ায় ভাসিয়ে সীমানা ছাড়া করার পর ওই ওভারেই স্টাম্পড হয়ে যান লুইস (২০ বলে ৩৬)। এক বল পর লুক উডকেও বোল্ড করে দেন মইন।
পরে ফোর্ডকে দুই ছক্কাসহ ওয়েইন পার্নেলের ১১ বলে ২০ রানের ইনিংসে ১৬০ ছাড়াতে পারে খুলনা।
এমন ব্যাটিং উইকেটে এই পুঁজি নিয়ে জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল খুলনার বোলারদের বিশেষ কিছু করা। কিন্তু তারা নয়, বিশেষ কিছু করলেন হৃদয়। ম্যাচের ভাগ্যও গড়ে দিলেন তিনি।
টানা চার জয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করা খুলনা হেরে গেল পরের পাঁচ ম্যাচেই। সাত জয়ে রংপুরের সমান ১৪ পয়েন্ট নিয়ে রান রেটে আপাতত দুইয়ে কুমিল্লা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
খুলনা টাইগার্স: ২০ ওভারে ১৬৪/৮ (হেলস ২২, আফিফ ২৯, এনামুল ১৮, লুইস ৩৬, জয় ২৮, পার্নেল ২০, উড ০, নাসুম ২, রুবেল ০*, মুকিদুল ৪*; মইন ৪-০-৪৬-২, ফোর্ড ৪-০-৩৬-২, তানভির ২-০-১৪-০, আলিস ৪-০-২৩-১, মুস্তাফিজ ৪-০-২৮-০, রিশাদ ২-০-১৬-০)।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স: ১৬.৩ ওভারে ১৬৮/৩ (লিটন ২, জ্যাকস ১৮, হৃদয় ৯১*, চার্লস ১৩, জাকের ৪০*; উড ৩.৩-০-২৫-০, পার্নেল ৪-০-৩৪-১, নাসুম ৩-০-৩২-০, মুকিদুল ২-০-২৮-১, নাহিদ ৩-০-৩৪-১, রুবেল ১-০-১৫-০)
ফল: কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ৭ উইকেটে জয়ী।
ম্যান অব দা ম্যাচ: তাওহিদ হৃদয়।
