Published : 28 Jun 2025, 04:50 PM
শ্রীলঙ্কা সফরের আগে নিজেদের মধ্যে একটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছিল বাংলাদেশের স্কোয়াড। মিরপুর শের-ই বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে শেষ বিকেলে ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম বলেই অল্পের জন্য স্লিপে ধরা পড়েননি এনামুল হক। তবে কয়েক বল পরই খোঁচা মেরে গালিতে ক্যাচ দেন।
সেই রোগ তিনি বয়ে বেড়ান পুরো টেস্ট সিরিজে। গল টেস্টের দুই ইনিংসে কিপারের কাছে ধরা পড়েন ৩২ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান। কলম্বো টেস্টের প্রথম ইনিংসে তিনি হন বোল্ড, পরের ইনিংসে ধরা পড়েন শর্ট লেগে। চার ইনিংস মিলিয়ে তার মোট রান ২৩। বাংলাদেশ যখন পরের টেস্ট ম্যাচটি খেলবে আগামী নভেম্বরে, সেই দলে তিনি জায়গা পেলে সেটাই হবে বিস্ময়ের।
এনামুলের নাজুক পারফরম্যান্সে পুরোনো প্রসঙ্গই মাথাচাড়া দিচ্ছে নতুন করে। ওপেনিংয়ের সমস্যা থেকে যেন মুক্তি নেই বাংলাদেশের।
টেস্ট ক্রিকেটে ইনিংস সূচনা করার কাজ সবসময়ই কঠিন। এই সময়ে বিশ্বের বেশি ভাগ দলই ওপেনিং নিয়ে ভুগছে। তবে বাংলাদেশের জন্য সমস্যাটা আরও বেশি গভীর। বছরের পর বছর ধরেই নতুন বল সামলানোর দায়িত্বটা পালন করতে পারছেন না কেউই। তামিম ইকবাল ছাড়া উল্লেখযোগ্য মানের আর কোনো ওপেনার ২৫ বছরে পায়নি বাংলাদেশ।
তামিম টেস্ট ক্রিকেট থেকে ক্রমাগত দূরে সরে যাওয়ার পর ওপেনিংয়ে দলের ভোগান্তিই কেবল দীর্ঘায়িত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটা প্রান্তে কিছুটা আশার আলো দেখাচ্ছেন সাদমান ইসলাম। গত ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ফিফটি করেছেন, পরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে করেছেন সেঞ্চুরি। এই শ্রীলঙ্কা সিরিজেও কিছু রানের দেখা পেয়েছেন বাঁহাতি ওপেনার। কিন্তু অন্য প্রান্ত থেকে কিছুই পাচ্ছে না বাংলাদেশ।
দুই বছর ধরে ধারাবাহিক ব্যর্থতার পর ঘরের মাঠে জিম্বাবুয়ে সিরিজের দল থেকে বাদ পড়েন জাকির হাসান। তার জায়গায় প্রায় আড়াই বছর পর ফেরানো হয় এনামুলকে। চলতি শ্রীলঙ্কা সফরের আগে মাহমুদুল হাসান জয়ও জায়গা হারালে, সাদমানের একমাত্র সঙ্গী হিসেবে থেকে যান ৩২ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান।
জাতীয় ক্রিকেট লিগের সবশেষ আসরে ৭০০ রান করে দলে জায়গা ফিরে পাওয়া এনামুলকে সুযোগ দেওয়া হয় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চট্টগ্রাম টেস্ট ও শ্রীলঙ্কা সফরের দুই ম্যাচেই। কিন্তু একটিতেও ঘরোয়া পারফরম্যান্সের পুনরাবৃত্তি তিনি করতে পারেননি। পাঁচ ইনিংসে ১২.৪০ গড়ে তার সংগ্রহ মোটে ৬২ রান।
তিন ম্যাচ বা পাঁচ ইনিংসেই কাউকে বাদ দেওয়ার জন্য হয়তো যথেষ্ট নয়। কিন্তু এনামুল টেস্ট ক্রিকেটে ব্যর্থ হয়েছেন আগেও। রান না পাওয়ার চেয়েও দৃষ্টিকটূ ক্রিজে তার উপস্থিতি। কোনো ইনিংসেই খুব স্বস্তিতে খেলতে পারেননি। কলম্বো টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংস ছাড়া বাকি ইনিংসগুলোয় তিনি যতক্ষণ ব্যাটিং করেছেন, মনে হয়েছে প্রতি বলেই হয়তো বেজে যাবে বিদায়ঘণ্টা।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক নির্বাচক হাবিবুল বাশারই মনে করেন, এনামুলকে নেওয়া হয়েছিল সাময়িক সমাধান হিসেব পরিস্থিতি সামাল দিতে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, পরবর্তীতে সুযোগ পাওনা ব্যাটসম্যানকে যেন লম্বা সময় সময় দেওয়া হয়।
“আদর্শ প্রক্রিয়া হলো, বাইরে যারা আছে তারা দলে থাকা ক্রিকেটারদের পুশ করবে, ভালো করতে তাগিদ দেবে পারফরম্যান্স দিয়ে। সেটা হওয়া উচিত, কিন্তু হচ্ছে না। এখন সময় এসেছে, নির্দিষ্ট কাউকে এনে তাকে লম্বা সময় সুযোগ দেওয়া, ভরসা দেওয়ার।”
“আমার মনে হয়, (এনামুল) বিজয়কে আনা হয়েছে একটা স্টপ গ্যাপ হিসেবে। সে ব্যর্থ হয়েছে। এখন পরবর্তীতে নতুন যাকে সুযোগ দেওয়া হবে, সে যেন লম্বা সময় খেলার সুযোগ পায়।”
তামিম ইকবালের অনুপস্থিতিতে টেস্ট দলে নিয়মিত হয়ে উঠেছিলেন জাকির ও জয়। তাদের সঙ্গে ছিলেন সাদমান। গত দুই বছরের বেশি সময়ে এই তিনজনই ঘুরে-ফিরে বিভিন্ন ম্যাচে ইনিংস শুরু করেছেন।
তিন জনের কেউই খুব ভালো করতে পারেননি। এদের মধ্যে জয় ও জাকিরের অবস্থা বেশিই নাজুক। টানা সবশেষ ১৭ ইনিংসে ফিফটি নেই জয়ের। জাকির সবশেষ ১৩ ইনিংসে পঞ্চাশ ছুঁতে পারেননি।
জয়-জাকিরের জায়গায় সুযোগ পাওয়া এনামুলও ব্যর্থ হওয়ার পর সম্ভাব্য বিকল্প হিসেবে তানজিদ হাসানের কথা বললেন হাবিবুল।
“জাকির ও জয়কে দিয়ে চেষ্টা করা হয়েছিল। তারা কিছু ম্যাচ খেলেছে। তানজিদ তামিমকে এই জায়গায় দেখা যেতে পারে। সে খুব ভালো, ওপেনিংয়ের জন্য চিন্তা করা যেতে পারে। লাল বলে তানজিদের অনেক ভালো সম্ভাবনা দেখি। সে খুব ভালো।”
তানজিদকে সুযোগ দিলে ব্যাটিং অর্ডারের প্রথম চার ব্যাটসম্যানের সবাই হয়ে যাবে বাঁহাতি। তবে এটিকে সমস্যা মনে করেন না হাবিবুল। বরং আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের সহজাত গুণ তানজিদকে এগিয়ে নেবে, বললেন সাবেক এই অধিনায়ক।
“আদর্শ পরিস্থিতি চিন্তা করলে ডানহাতি-বাঁহাতি রাখতে পারলে ভালো। তবে সবকিছুর আগে আসবে পারফরম্যান্স। বাঁহাতি ব্যাটসম্যানরা যদি রান করে, তাহলে প্রথম চারজনও বাঁহাতি হলে কোনো সমস্যা নেই।”
“তানজিদের প্রথম শ্রেণির পরিসংখ্যান কিন্তু খারাপ নয়। যারা স্ট্রোক খেলতে পারে তারা সহজে রান বের করে নিতে পারে। যারা স্ট্রোক খেলতে পছন্দ করে টেস্ট ক্রিকেটে তাদের জন্য রান করার সম্ভাবনাটা বেশি। এটি তার জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে।”

আরেক সাবেক নির্বাচক ও বর্তমানে কোচ হান্নান সরকারের ভাবনা অবশ্য কিছুটা ভিন্ন। তানজিদ বা নতুন কাউকে সরাসরি টেস্টে সুযোগ না দিয়ে ‘এ’ দলের খেলায় পারফর্ম করে আসার কথা বললেন তিনি।
“ওপেনিংয়ে সমস্যার সমাধান একটাই, ওপেনারদের ভালো খেলতে হবে। ওপেনাররা ভালোটা খেলবে কোথায়? ভালো খেলতে হবে ‘এ’ দলের যত খেলা আছে... সেখানে তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের একটা স্বাদ থাকে। ‘এ’ দলে যারা ভালো খেলবে, সেখান থেকে ওপেনিংয়ে সুযোগ পাবে। এটাই সমাধান।”
এই প্রক্রিয়ায় আবার বিবেচনার বাইরে পড়ে যাবেন তানজিদ। প্রায় পাঁচ বছরের প্রথম শ্রেণির ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ২৪ ম্যাচে ৩৯.১৬ গড়ে তার সংগ্রহ ১ হাজার ৬৪৫ রান। ৬টি ফিফটির সঙ্গে সেঞ্চুরি ছুঁয়েছেন ৪ বার।
তবে ‘এ’ দলের কোনো ম্যাচ খেলেননি বাঁহাতি ওপেনার। ২০২১ সালে আয়ারল্যান্ড উলভসের (‘এ’ দল) বিপক্ষে বাংলাদেশ ইমার্জিং দলের হয়ে একমাত্র ইনিংসে ৪১ রান করেছিলেন তিনি। এর বাইরে বাকি সব ম্যাচ তিনি খেলেছেন দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে।
তাই ‘এ’ দলের হয়ে ভালো করলে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তানজিদকে নেওয়ার কথা বললেন হান্নান।
“(বিকল্প হিসেবে) তানজিদ আসতে পারে। এখন অনেকেই বলে যে, ওপেনিংয়ে একটু এটাকিং ক্রিকেট খেলা যায়। সাদমান এক পাশ ধরে রাখলে, অন্য পাশে আক্রমণ করা যায়। তাই এটা (তানজিদকে নেওয়া) আসতে পারে। ভালো চিন্তা। খারাপ কিছু নয়।”
“তানজিদের লঙ্গার ভার্শনে রেকর্ডও খারাপ নয়। কিন্তু ঘুরে-ফিরে সেই একই কথা, ও যে রান করেছে, সবই আমাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে। ‘এ’ দলে সম্ভবত খুব বেশি খেলেনি। তাই ওর ক্ষেত্রেও একই কথা থাকে, ‘এ’ দলের হয়ে লাল বলে পারফর্ম করতে হবে।”
ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টিতে বেশ কিছু দিন ধরেই নিয়মিত তানজিদ। সাদা বলের দুই সংস্করণে ধারাবাহিক বড় ইনিংস খেলেও টেস্টের দুয়ার খুলতে পারেন বাঁহাতি ওপেনার, মনে করেন হান্নান।
“তানজিদের সুবিধা হলো, ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে। তাই চ্যালেঞ্জটা জানে। সাদা বলের ক্রিকেটে ওকে নিয়মিত ৭০-৮০ বা বড় ইনিংস ধারাবাহিক খেলতে হবে। যেটা তামিম ইকবাল করত। তানজিদ নিয়মিত ৩০-৪০ রানের ইনিংস খেলছে। এটাকে আরও বড় করতে হবে, ধারাবাহিক করতে হবে।”
“এখনই তিন সংস্করণে নিয়ে আসতে হবে এমন না। রোহিত শার্মা ওয়ানডে খেলার প্রায় পাঁচ বছর পর টেস্ট খেলেছে। সাদা বলে সেভাবে বড় ইনিংস খেলার সামর্থ্য দেখাতে পারলে তানজিদকেও ভিন্ন তিন সংস্করণ খেলাতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”
বাংলাদেশের পরের টেস্ট সিরিজ নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। এর আগে অগাস্টে অস্ট্রেলিয়া সফরে যাবে ‘এ’ দল। পরে জাতীয় ক্রিকেট লিগ (এনসিএল) ও বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগে (বিসিএল) চার দিনের ম্যাচ খেলার সুযোগ পাবেন ক্রিকেটাররা।
সাদা বলে জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচির কারণে এগুলোর একটিতেও হয়তো খেলতে পারবেন না তানজিদ। তবে এসব খেলা হতে পারে জাকির, জয় বা অন্যদের জন্য বড় সুযোগ।
কিন্তু সেখানেও ব্যর্থ হলে বিকল্পের সংকটে পড়ে যেতে পারেন নির্বাচকরা। বাধ্য হয়েই হয়তো টানা ব্যর্থ হওয়া কাউকেই আবার সুযোগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে দল নির্বাচনের প্রক্রিয়াটা কেমন হয়, সেই ধারণা দিলেন বর্তমান প্রধান নির্বাচক গাজী আশরাফ হোসেন।
“যারা বাদ পড়েছে বা পুরোনো আছে, তারা আসলে জানে যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চ্যালেঞ্জ কী এবং ঘরোয়া ক্রিকেটের সঙ্গে মানের পার্থক্যটা কেমন। তাদেরকে রাখার কারণ হলো, যদি বয়স থাকে তাহলে তারা যেন প্রক্রিয়ায় থাকতে পারে। যেন তারা নিজেদের ভুলগুলো নিয়ে স্থানীয় কোচদের সঙ্গে কাজ করতে পারে।”
“পাশাপাশি নতুন কেউ যদি উঠে আসে, তাকে প্রক্রিয়ায় নিয়ে আসা। নতুন কেউ তো ‘এ’ দলে থাকে না সাধারণত, এইচপিতে থাকে। সেখান থেকে পর্যায়ক্রমে উঠে আসে। তাই আমাদের সামনে পথ হলো, এইচপি থেকে কাউকে নিয়ে আসা অথবা হঠাৎ করে কেউ জাতীয় লিগ বা অন্য কোথাও ভালো করলে, তাকে আনা। এগুলোই বিকল্প।”