আইপিএলের ইতিহাসে চতুর্থ ব্যাটসম্যান হিসেবে ‘রিটায়ার্ড আউট’ হয়ে আলোচনার খোরাক জোগালেন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের ব্যাটসম্যান।
Published : 05 Apr 2025, 08:53 AM
তিলাক ভার্মা আউট হননি। চোটও পাননি। তার পরও ক্রিজ ছেড়ে গেলে শেষের আগের ওভারে। তার নাম লেখা হয়ে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত এক ধরনের আউটের রেকর্ডে। মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের ব্যাটসম্যানের এমন বিদায় বেশ আলোচনার খোরাক জোগাল। ম্যাচের পর সিদ্ধান্তের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করলেন মুম্বাইয়ের কোচ মাহেলা জায়াওয়ার্দেনে ও অধিনায়ক হার্দিক পান্ডিয়া।
আইপিএলে শুক্রবার লাক্ষ্নৌ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে মুম্বাইয়ের রান তাড়ার শেষ সময়ের ঘটনা এটি। শেষ দুই ওভারে মুম্বাইয়ের প্রয়োজন ছিল ২৯ রান। ১৯তম ওভারে শার্দুল ঠাকুরের বলে প্রথম পাঁচ ডেলিভারিতে কেবল পাঁচটি সিঙ্গেল নিতে পারেন দুই ব্যাটসম্যান তিলাক ও পান্ডিয়া। পঞ্চম বলের পর তুলে নেওয়া হয় তিলাককে।
চোটাঘাত ছাড়া কোনো কারণ ছাড়া ব্যাটসম্যান স্বেচ্ছায় মাঠ ছেড়ে গেলে বা তুলে নিলে ক্রিকেটের পরিভাষায় সেটিকে বলা হয় ‘রিটায়ার্ড আউট।’ আইপিএলের ১৮ আসর মিলিয়ে এমন আউট হওয়া চতুর্থ ব্যাটসম্যান তিলাক।
পাঁচ নম্বরে এ দিন তিলাক যখন ক্রিজে যান, ২০৪ রান তাড়ায় মুম্বাইয়ের রান তখন ৮.১ ওভারে ৩ উইকেটে ৮৬। সুরিয়াকুমার ইয়াদাভের সঙ্গে তখন ৬৮ বলে ৬৬ রানের জুটি হয় তার। তবে সেখানে সুরিয়াকুমারের অবদান ছিল ৩০ বলে ৪৬। জুটিতে ১৭ রান করতে তিলাক খেলেন ১৮ বল!
৪৩ বলে ৬৭ রানের ইনিংস খেলে সুরিয়াকুমার যখন বিদায় নেন, মুম্বাইয়ের প্রয়োজন তখন ২৩ বলে ৫২ রান। পরের সময়টায় ৫ বল খেলে ৮ রান করতে পারেন তিলাক।
ক্রিজ ছাড়ার সময় তরুণ এই ব্যাটসম্যানের নামের পাশে রান ছিল ২২ বলে ২৫। স্কোরেই ফুটে উঠছে, কেন তাকে তুলে নেয় মুম্বাই। ম্যাচের পর অধিনায়ক পান্ডিয়ার ব্যাখ্যাতেও ফুটে উঠল তা।
“এটা অবধারিত ছিল। আমাদের প্রয়োজন ছিল কিছু বড় শট, কিন্তু সে (তিলাক) পারছিল না। ক্রিকেটে কখনও কখনও এরকম দিন আসে, যখন কেউ প্রবলভাবে চেষ্টা করেও কাজ হয় না। সিদ্ধান্তটি নিজেই ফুটিয়ে তুলছে, কেন আমরা এটি করেছি।”
পরে সংবাদ সম্মেলনে কোচ মাহেলা জায়াওয়ার্দেনের কথায় ফুটে উঠল, ভাবনাটা মূলত তার মাথা থেকেই এসেছে।
“সে ডানা মেলতে চাইছিল, কিন্তু পারছিল না। শেষ কয়েক ওভার পর্যন্ত আমরা অপেক্ষা করেছি এই আশায় যে, সে ছন্দ ফিরে পাবে, কারণ সে কিছুটা সময় ক্রিজে কাটিয়েছে, তার উচিত ছিল চাপটা সরিয়ে ফেলা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমার মনে হয়েছে, তরতাজা কাউক প্রয়োজন, সে (তিলাক) ধুঁকছিল।”
“এই ধরনের ব্যাপার ক্রিকেটে হয়েই থাকে। তাকে তুলে নেওয়া অবশ্যই দারুণ কিছু নয়। তবে এটা আমাকে করতেই হতো। ম্যাচের ওই পর্যায়ে সেটি ছিল ট্যাকটিক্যাল সিদ্ধান্ত।”
তিলাককে তুলে নিলেও অবশ্য লাভ হয়নি মুম্বাইয়ের। সাত বলে তখন ২৪ রান প্রয়োজন ছিল তাদের। তিলাকের বদলে নামা মিচেল স্যান্টনার প্রথম বলে করেন দুই রান। শেষ ওভারে ২২ রানের সমীকরণে প্রথম বল ছক্কায় ওড়ান পান্ডিয়া। কিন্তু এরপর আভেশ খানের দারুণ বোলিংয়ে আর কিছু করতে পারেননি মুম্বাই অধিনায়ক। দ্বিতীয় বলে নেন দুই রান।
তৃতীয় বলে সিঙ্গল নেওয়ার সুযোগ পেয়েও স্যান্টনারের ওপর ভরসা করেননি পান্ডিয়া। রান না নিয়ে স্ট্রাইক রেখে দেন নিজের কাছে। কিন্তু চতুর্থ বলেও তিনি পারেননি রান নিতে। পরে পঞ্চম বলে সিঙ্গল নেন। শেষ বলে স্যান্টনার পারেননি রান নিতে। মুম্বাই ম্যাচ হারে ১২ রানে।
আইপিএলে প্রথম রিটায়ার্ড আউট দেখা যায় ২০২২ আসরে। সেবার ২৩ বলে ২৮ রান করে স্বেচ্ছ্বায় মাঠ ছাড়েন রাজস্থান রয়্যালসের রাভিচান্দ্রান অশ্বিন। ২০২৩ আসরে পাঞ্জাব কিংসের আথার্ভা তাইড়ে (৪২ বলে ৫৫) ও গুজরাট টাইটান্সের সাই সুদার্শান (৩১ বলে ৪৩) একই পথ বেছে নেন।
এবার তিলাককে উঠিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত বেশ প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে, পান্ডিয়া নিজেও খুব ঝড়ো ইনিংস খেলতে পারেননি। শেষ ওভারের স্রেফ ওই ছক্কা ছাড়া পরিস্থিতির তাবি ততটা মেটাতে পারেননি। তিলাককে তুলে নেওয়ার সময় পান্ডিয়ার রান ছিল ১১ বলে ১৯।
মুম্বাইয়ের সিদ্ধান্তে সামাজিক মাধ্যমে বিস্ময় প্রকাশ করেন মুম্বাইয়ের সাবেক স্পিনার ভারতীয় গ্রেট হারভাজান সিং।
“স্যান্টনারকে নামানোর জন্য তিলাককে উঠিয়ে নেওয়া আমার মতে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। স্যান্টনার কি তিলাকের চেয়ে ভালো হিট করে? পোলার্ড বা বড় শট খেলার সুদক্ষ কোনো ব্যাটসম্যানকে ক্রিজে পাঠাতে এমন কিছু করা হলে বুঝতে পারতাম। কিন্তু এটার সঙ্গে আমি একমত নই।”
ভারতীয় ব্যাটসম্যান হানুমা বিহারি তো সরাসরি আঙুল তুললেন পান্ডিয়ার দিকে। গত শনিবার গুজরাটের বিপক্ষে রান তাড়ায় এর চেয়েও বাজেভাবে ধুঁকছিলেন স্বয়ং পান্ডিয়াই। সেদিন অধিনায়কের ১৭ বলে ১১ রানের ইনিংস দলের সম্ভাবনাই শেষ করে দেয় অনেকটা। বিহারি তুলে ধরলেন সেটি।
“স্যান্টনারকে নামানোর জন্য তিলাক ভার্মা রিটায়ার্ড আউট? আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন! গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে তো হার্দিকও ভুগেছে। সে তো মাঠ ছেড়ে যায়নি, তাহলে তিলাক কেন?”
জাতীয় দলের হয়ে টি-টোয়েন্টি দুর্দান্ত ফর্মে ছিলেন তিলাক। গত ডিসেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে বিধ্বংসী দুটি সেঞ্চুরি করেন টানা দুই ম্যাচে। জানুয়ারিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন ৫৫ বলে ৭৯ রানের অপরাজিত ইনিংস। এসবের আগেই তাকে ৮ কোটি রুপিতে ধরে রাখে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। কিন্তু চলতি আসরে এখনও সেভাবে জ্বলে উঠতে পারেননি প্রতিভাবান এই ব্যাটসম্যান। রান কিছু করেছেন। তবে ঠিক ঝড় তুলতে পারেননি। এই ম্যাচের আগে দুই ইনিংসে তার রান ২৫ বলে ৩১ ও ৩৬ বলে ৩৯।
আইপিএলে রিটায়ার্ড আউটের এটি কেবল চতুর্থ নজির হলেও টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এমন বিদায় বিরল নয়। তিলাককে দিয়ে সংখ্যাটি হলো এখন মোট ৩৯টি।