Published : 12 Jun 2026, 08:11 PM
ক্রিকেটীয় লড়াই তখন থমকে আছে, দলগুলির ভাগ্য ঝুলছে প্রকৃতির দোলায়। বিকেএসপির তিন নম্বর মাঠে আবাহনীর বিপক্ষে ম্যাচটি আবার শুরু হবে কি না, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখা গেল না মোহামেডানের ক্রিকেটার, কোচ কিংবা ক্লাব কর্তাদের মধ্যে। নিজেদের কাজ তারা আগেই সাজিয়ে রেখেছিল। তাদের নজর বরং পাশের পাঠে। সেখানে ঢাকা লেপার্ডসের বিপক্ষে প্রাইম ব্যাংকের হারটা নিশ্চিত হলেই মোহামেডানের কাজ হয়ে যায়!
শেষ পর্যন্ত খেলা আর শুরু হলো না। প্রাইম ব্যাংকের আশা ভেসে গেল বৃষ্টিতে। মোহামেডানের সবাই ভেসে গেলেন যে উচ্ছ্বাসের জোয়ারে। কত দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আবার এমন খুশির উপলক্ষ এলো এই ক্লাবে! ১৬ বছর পর ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে চ্যাম্পিয়ন হলো ঐতিহ্যবাহী দলটি। এই টুর্নামেন্ট লিস্ট ‘এ’ মর্যাদা পাওয়ার পর এই প্রথম ট্রফির ছোঁয়া পেল তারা।
শিরোপার সম্ভাবনা নিয়ে শুক্রবার শেষ রাউন্ড শুরু করেছিল তিন দল-মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আবাহনী লিমিটেড ও প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব। বিকেএসপি তিন নম্বর মাঠে আবাহনীর বিপক্ষে পারভেজ হোসেন ইমনের বিধ্বংসী ১৫০ ও এনামুল হকের ১৪১ রানের ইনিংসে ৪০৬ রানের পাহাড় গড়ে মোহামেডান। তাদের জয় একরকম নিশ্চিত হয়ে যায় তখনই, লড়াই থেকে ছিটকে পড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আবাহনী। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার সময় অনেক এগিয়ে মোহামেডানই।
কিন্তু মোহামেডানের শিরোপা জন্য প্রয়োজন ছিল আরও একটি শর্তপূরণ, লেপার্ডসের বিপক্ষে হারতে হবে প্রাইম ব্যাংককে! বিকেএসপি চার নম্বর মাঠে যখন খেলা থমকে যায় বৃষ্টিতে, ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে তখনও পিছিয়ে প্রাইম ব্যাংক।
বৃষ্টি থামার পর প্রাইম ব্যাংক উদ্বিগ্ন অপেক্ষায় ছিল খেলা শুরু হওয়ার। বৃষ্টি থেমে যাওয়ার পর কাভার না সরায় প্রাইম ব্যাংক অধিনায়ক আকবর আলি বারবার আম্পায়ারদের উদ্দেশে বলছিলেন, “এখন তো বৃষ্টি নাই। কাভার সরলে তো খেলা শুরু করা যায়…!” কিন্তু খেলা শুরুর করার অবস্থা ছিল না। পুরো ম্যাচ হলে প্রাইম ব্যাংকের সুযোগ থাকত জয়ের। কিন্তু সেখানেই শেষ হওয়ায় তারা হেরে যায় ৯ রানে।
মোহামেডানের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেদের ম্যাচটি জেতা। সেই চ্যালেঞ্জে দারুণভাবে জ্বলে উঠে তারা ৫০ ওভারে রান তোলে ৪ উইকেটে ৪০৬। লিস্ট 'এ' ক্রিকেটে দ্বিতীয়বারের মতো চারশ রানের স্কোর হলো বাংলাদেশের ক্রিকেটে। রান তাড়ায় ২৪.৪ ওভারে ৪ উইকেটে ১৭৮ রানে থামে আবাহনীর ইনিংস। পরে আর খেলা শুরু না হওয়ায় ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন মেথডে ৬৩ রানের জয় পায় মোহামেডান।
টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে দলীয় ৩৬ রানে মোহাম্মদ নাঈম শেখকে হারায় মোহামেডান। মোহামেডান দাপট দেখায় ইনিংসের পরের অংশে। অভিজ্ঞ এনামুল হক ও পারভেজ হোসেন ইমন মিলে দ্বিতীয় উইকেটে যোগ করেন ২০২ বলে ২৪৮ রান।
১০ চার ও ১২ ছক্কায় ১১৬ বলে ১৫০ রান করে আউট হন পারভেজ। ১১ চার ও ৯ ছক্কায় এনামুল করেন ১১৫ বলে ১৪১।
এরপর শেষ সময়ের দাবি মেটান আফিফ হোসেন (৩৩ বলে ৬১) ও আনিসুল ইসলাম ইমন (১৬ বলে ৩০)। তাতে দলের রান পেরিয়ে যায় চারশ।
অভিজ্ঞতায় যোজন যোজন পিছিয়ে থাকা আবাহনীর জন্য এই লক্ষ্য ছিল প্রায় নাগালের বাইরে। ওপেনার অনিক সরকার তবু চেষ্টা করে যান নিজের মতো করে। কিন্তু আরেক প্রান্তে সাব্বির হোসেন, জিসান আলম ও মাহিদুল ইসলাম অঙ্কন বিদায় নেন দ্রুতই। এরপর এসএম মেহেরব ৩২ রান করলেও ৩০ বল খেলে ফেলেন। বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হওয়ার সময় ৬ চার ও ৫ ছক্কায় ৬৪ বলে ৮৫ রানে অপরাজিত থাকেন অনিক।
বৃষ্টির পর খেলা আর শুরু হয়নি। অনিকের শতরানের সুযোগও মিলিয়ে যায়।
বিকেএসপির চার নম্বর মাঠে ঢাকা লেপার্ডসের বিপক্ষে আগে ব্যাট করতে নেমে ৮ উইকেটে ২৬৬ রান তোলে প্রাইম ব্যাংক। ওপেনার আজিজুল হাকিম তামিম ৭ চার ও ১ ছক্কায় করেন ৭১ রান। রায়ান রাফসান রহমান ৫ চার ও দুই ছক্কায় করেন ৫৭ রান। শেষদিকে অধিনায়ক আকবর আলী ৩৮ বলে ৫১ রানের এক ঝড়ো ইনিংস খেলেন।
লিস্ট 'এ' ক্যারিয়ারে প্রথমবার ৫ উইকেটের স্বাদ পান লেপার্ডসের তরুণ পেসার আল ফাহাদ (৫/৪৭)।
রান তাড়ায় লেপার্ডসের দুই ওপেনার জাওয়াদ আবরার ও ইফতেখার হোসেন ইফতি এনে দেন ভালো শুরু। উদ্বোধনী জুটিতে ৮২ রান তোলে তারা।
৬০ বলে ৫৩ রান করা জাওয়াদের ব্যাটে ছিল চার চার ও দুই ছক্কা। ইফতি ৬৫ বলে ৩ চার ও এক ছক্কায় করেন ৪১ রান। বজ্রপাতে খেলা বন্ধ হওয়ার আগে ৩ উইকেটে ১৪২ রান তোলে লেপার্ডস। পরে আর খেলা না হওয়ায় ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন পদ্ধতিতে জিতে যায় লেপার্ডস।
শিরোপা সমীকরণে না থাকলেও দিনের অন্য দুই ম্যাচ ছিল রোমাঞ্চকর। এক ম্যাচে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় ১ রানে, আরেকটি হয় 'টাই।'
বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স ও অগ্রণী ব্যাংকের মধ্যকার ম্যাচের ভাগ্যও নির্ধারিত হয়েছে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন মেথডে। বসুন্ধরা স্পোর্টস কমপ্লেক্সে আগে ব্যাট করতে নেমে অগ্রণী ব্যাংকের স্পিনার আরিফ আহমেদের বোলিংয়ে বিপাকে পড়ে বসুন্ধরা স্ট্রাইকার্স। তার ৩৫ রানে ৪ উইকেট শিকারের দিনে বসুন্ধরার ইনিংস থামে ১৮৪ রানে। সর্বোচ্চ ৪৪ রান করেন ওপেনার ইমরানউজ্জামান।
জবাবে নাসির হোসেনের ৪০ ও মার্শাল আইয়ুবের ৩১ রানে ৪০.৪ ওভারে ৮ উইকেটে ১৬৮ রান তোলার পর নামে বৃষ্টিতে। পরে খেলা আর শুরু না হওয়ায় ১ রানের জয় পায় অগ্রণী ব্যাংক।
দিনের অন্য ম্যাচে পিকেএসপিতে 'টাই' হয়েছে রূপগঞ্জ টাইগার্স ও গুলশান ক্রিকেট ক্লাবের ম্যাচ। আগে ব্যাট করতে নেমে ২২৫ রানে থামে গুলশানের ইনিংস। ওপেনিংয়ে ৫টি করে চার ও ছক্কায় ৪৮ বলে ৬৩ করেন মঈনুল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন সবুজের ব্যাট থেকে আসে ৬১। রূপগঞ্জের হয়ে হুমায়ুন আহমেদ ৩৯ রানে ৪ উইকেট শিকার করেন।
রান তাড়ায় শাকির হোসেন শুভ্রর সেঞ্চুরির পরও জিততে পারেনি রূপগঞ্জ টাইগার্স। ৮ চার ও ৪ ছক্কায় ১১৭ বলে ১০৩ রান করে আউট হন শাকির।
জয়ের জন্য শেষ ওভারে তাদের প্রয়োজন ছিল ৭ রান। প্রথম বলে আসেনি রান, পরের দুই বলে আসে দুটি সিঙ্গল। চতুর্থ বলে মুক্তার আলি নেন দুই রান। পঞ্চম বলেও আসে সিঙ্গল।
শেষ বলে প্রয়োজন পড়ে দুই রানের। কিন্তু দ্বিতীয় রান নেওয়ার চেষ্টায় রান আউট হয়ে যান রাফিউজ্জামান রাফি।