২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫ আশ্বিন ১৪৩৩

৪৬ বছর বয়সেও অবসর ভাবনা নেই, এখনও ‘শিখছেন’ ইমরান তাহির

‘এখনও শিখছি, চেষ্টা করছি উন্নতির’, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৫৪৭ উইকেট শিকার করা লেগ স্পিনার খেলে যেতে চান আরও অনেক দিন।

স্পোর্টস ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 11 Sep 2025, 10:31 AM

Updated : 26 Aug 2026, 01:34 PM

বয়স ৪৬ পেরিয়ে গেছে বেশ আগেই। কদিন আগেই সাবেকদের টুর্নামেন্টে খেললেন ইমরান তাহির। তবে আসলে তিনি পুরোপুরি ‘সাবেক’ নন। বিশ্বজুড়ে ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগগুলোয় যে এখনও চুটিয়ে খেলে যাচ্ছেন দক্ষিণ আফ্রিকান এই লেগ স্পিনার! শুধু খেলছেন বললে বাকি রয়ে যায় অনেকটুকু। বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে পারফর্ম করছে দাপটে। থামার ভাবনা তার এখনও নেই, এই পথ ধরেই ছুটতে চান আরও অনেক দিন। 

সম্প্রতি ইংল্যান্ডে ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব লেজেন্ডেস-এ দক্ষিণ আফ্রিকার শিরোপা জয়ের পথে তাহিরের শিকার ছিল ৮ উইকেট। এমন নয় যে শুধু সাবেকদের আসরেই তিনি উজ্জ্বল। ওই টুর্নামেন্টের ঠিক আগে গ্লোবাল সুপার লিগে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সকে শিরোপা জয়ে নেতৃত্ব দেন তিনি। পাঁচ ম্যাচে ১৪ উইকেট নিয়ে ম্যান অব দা টুর্নামেন্টের স্বীকৃতিও পান। 

এই বছর খেলেছেন তিনি এসএ টোয়েন্টিতেও। সেখানে ৯ ম্যাচে উইকেট ছিল ৭টি, ওভারপ্রতি রান দিয়েছিলেন মাত্র ৬.১৬ করে। এই বয়সেও তাই যে কোনো দলের সম্পদ তিনি। সামনেই ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে নেতৃত্ব দেবেন গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সকে। 

বোলিংয়ের পাশাপাশি তার ফিল্ডিংও এখনও বেশ ভালো। মাঠের যে কোনো জায়গায় তিনি বেশ নিরাপদ। এখনও মাঠে লাফিয়ে ওঠেন, ঝাঁপিয়ে পড়েন। মাঠজুড়ে ছুটে বেড়িয়ে তার সেই চেনা উদযাপন তো আছেই।

ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনকে তাহির বললেন, শৃঙ্খলা ও নিবেদন দিয়ে নিজেকে গুছিয়ে রেখে তিনি খেলে যাচ্ছেন হৃদয়ের ক্ষুধা মেটাতে। 

“কাজটা কঠিন (শরীর ঠিক রাখা)। তবে একদিক থেকে আমি সৌভাগ্যবান যে, ট্রেনিংয়ের বেশি সময় এখন পাই। এটা আমাকে বাড়তি সুবিধা দেয়। আমি নিজের দেখভাল ভালোভাবে করি। খাওয়া ঠিক রাখি, ঠিক সময়ে ঘুমাই ও নিজের কাজের প্রতি অনুগত থাকি। এরপর যখন মাঠে নামি, জানি যে দলের জন্য শতভাগ দিতে পারব আমি।” 

পেশাদার ক্রিকেটে তার পথচলা শুরু সেই ১৯৯৬ সালে জন্মভূমি পাকিস্তানে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট প্রথম খেলেছেন পাকিস্তানেই, ২০০৬ সালে। সেই থেকে ২০ ওভারের ক্রিকেটে খেলেছেন এখনও পর্যন্ত ৪৩৪ ম্যাচ। তার নামের পাশে উইকেটে ৫৪৭টি, এই সংস্করণে যা চতুর্থ সর্বোচ্চ।

এতটা পথ পেরিয়ে ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসেও শেখার তাড়না শেষ হয়নি তাহিরের। 

“সবসময় শেখার প্রক্রিয়ায় থাকতে হয়। কে কতটা ভালো, এটা গুরুত্বপূর্ণ নয়, খেলাটা নিয়ে প্রতিটি দিন শিখতে হয়। ক্যারিয়ারজুড়ে এটিই আমাকে শিখিয়েছে এই খেলা। আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে এই সময়ে স্পিনাররা বড় ভূমিকা রাখে, কাজেই স্কিলের উন্নতি প্রতিনিয়ত করতে হয়।”

পাকিস্তানের ক্রিকেটে অনেক বছর খেলেও তিনি জাতীয় দলের ধারেকাছে আসতে পারেননি। একসময় পাড়ি জমান দক্ষিণ আফ্রিকায়। বিয়ে করে থিতু হন সেখানেই। একটা সময় দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার স্বপ্ন পূরণ হয় প্রোটিয়াদের হয়।

২০১১ বিশ্বকাপ দিয়ে যখন অভিষেক হয়, ততদিনে বয়স তার ৩২ ছুঁইছুঁই। এই বয়সেও তার উদ্দীপনার কমতি ছিল না। দক্ষিণ আফ্রিকার স্পিন আক্রমণের ভরসা ছিলেন তিনি অনেক দিন। 

এখন আর দেশের হয়ে খেলছেন না। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাকে সবশেষ দেখা গেছে ২০১৯ বিশ্বকাপে। তবে ক্রিকেটের তেষ্টা এখনও তার হৃদয়ে প্রবল। অবসরের ভাবনাও নেই এখনও। যতদিন সম্ভব, চালিয়ে যেতে চান খেলা। 

“আমি এমন একজন, যে সাফল্য পেয়েছে অনেক দেরিতে। আজ আমি যে পর্যায়ে আছি, এমন স্বপ্নের জায়গায় আসার পর সেটি আর ছাড়তে ইচ্ছে করে না। যতটা সম্ভব, এই স্বপ্নের ভেতর থাকতে চাই, খেলে যেতে চাই। যখন খেলি, চেষ্টা করি নিজের সবটুকু উজাড় করে দিতে। সেটা অবশ্যই প্রবল তাড়না থেকেই থাকে। কোনো কিছুর প্রতি সত্যিকারের আবেগ না থাকলে সেখানে সফল হওয়া যায় না।”

দক্ষিণ আফ্রিকার হয় ২০ টেস্ট, ১০৭ ওয়ানডে ও ৩৮ টি-টোয়েন্টি খেলেছেন তাহির। ১৭৩ উইকেট নিয়ে প্রোটিয়াদের ওয়ানডে ইতিহাসের সফলতম বোলার তিনিই, ১০০ উইকেটও নেই আর কোনো স্পিনারের। টি-টোয়েন্টিতে তার ৬৩ উইকেটের চেয়ে বেশি আছে কেবল তাব্রেইশ শামসির (৮৯টি)।

টেস্টে অবশ্য খুব সফল হননি (৫৭ উইকেট)। তবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৭৮৪ উইকেটই বলে দেয়, সঠিক সময়ে সুযোগ পেলে লাল বলেও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে হয়তো আলো ছড়াতে পারতেন তিনি। 

তিনি অবশ্য এখন আর অতটা পেছন ফিরে তাকান না। বরং নিজে খেলার পাশাপাশি আরেকটি কাজ দারুণ উপভোগ করেন, তরুণ স্পিনারদের পরামর্শ দেওয়া। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খেলতে গিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করতে দারুণ ভালো লাগে তার। 

“ক্যামেরার সামনে এটা আমি করি না। তবে আমার শিক্ষা আমি ছড়িয়ে দিতে পছন্দ করি। আমি যখন তরুণ ছিলাম, খুব বেশি কাউকে পাইনি যারা শিখিয়েছেন এবং সেটা দুঃখজনক একটি ব্যাপার। তবে পেশাদার ক্রিকেটার হতে হলে ও স্বপ্নকে সত্যি করতে হলে, কঠোর পরিশ্রম করে যেতে হবে, শেখার প্রক্রিয়ায় থাকতে হবে এবং সেটিই আমার সবসময়ের বিশ্বাস।”

নিজের বেড়ে ওঠার সময় অভিজ্ঞতাটা তিক্ত ছিল বলেই তিনি চান না তেমন অভিজ্ঞতা হোক অন্যদের। এজন্যই তার দুয়ার সবসময় খোলা তরুণদের জন্য। 

“আমাকে যেসবের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, চাই না তরুণদের সেটার মধ্য দিয়ে যেতে হোক। আমি চাই তারা জানুক কোনটি স্লাইডার, কোনটি গুগলি আর ফ্লিপার। আমি চাই, ১৫ বছর বয়সেই তারা এসব জানুক। তাহলে তারা আমার চেয়েও ভালোভাবে দেশ বা ফ্র্যাঞ্চাইজির উপকারে আসবে। আমি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এসেছি অনেক দেরিতে এবং স্কিল দেখিয়েছি আমার ক্যারিয়ারের অনেক পরের দিকে। এখনও চেষ্টা করছি উন্নতির।”

“আমার দিক থেকে, আমি যেখানেই যাই, তরুণদের সঙ্গে আমার শিক্ষা ভাগাভাগি করতে চাই। লেগ স্পিন বোলিং নিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে আমার। অন্য স্পিনাররা খেলাটা নিয়ে কীভাবে ভাবছে, আমার ভাবনা কেমন, এসব দেখতে ভালো লাগে আমার। এজন্যই খেলাটা নিয়ে কথা বলতে এবং অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করাটা দারুণ ব্যাপার। যখন সেটা করতে পারি, হৃদয়ের গভীরে ভালো অনুভব করি।”