ভারত-নিউ জিল্যান্ড
Published : 18 Jan 2026, 10:16 PM
ভিরাট কোহলি যতক্ষণ ক্রিজে ছিলেন, ভারতের আশাও বেঁচে ছিল। ক্রিস্টিয়ান ক্লার্কের বল উড়িয়ে মেরে যখন লং-অফে ধরা পড়লেন এই ব্যাটিং গ্রেট, তখনই বলতে গেলে নিভে যায় ভারতের আশার বাতি। এক বল পর কুলদিপ ইয়াদাভকে বিদায় করে ঐতিহাসিক সিরিজ জয়ের উল্লাসে মাতে নিউ জিল্যান্ড।
ইন্দোরে রোববার সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডেতে কিউইদের জয় ৪১ রানে। ড্যারিল মিচেল ও গ্লেন ফিলিপসের দুর্দান্ত সেঞ্চুরিতে ৩৩৭ রানের পুঁজি গড়ে ভারতকে তারা থামিয়ে দিয়েছে ২৯৬ রানে।
ভারতের মাটিতে এর আগে সাতটি দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজ খেলে সবকটিতেই হারের তেতো স্বাদ পেয়েছিল নিউ জিল্যান্ড। এবার ২-১ ব্যবধানের জয়ে ইতিহাস রচনা করল তারা।
২০২৪ সালে ভারতে প্রথমবারের মতো টেস্ট সিরিজ জয়ের কীর্তি গড়েছিল তাসমান সাগর পারের দেশটি। দুই বছর পর একই স্বাদ পেল তারা ওয়ানডে সংস্করণে।
নিউ জিল্যান্ডকে জয়ের ভিত গড়ে দেন মিচেল ও ফিলিপস। টানা দ্বিতীয় সেঞ্চুরিতে ৩ ছক্কা ও ১৫ চারে ১৩৭ রান করে ম্যাচ সেরার পুরস্কার জিতে নেন মিচেল। আর ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ওয়ানডে শতকে ৩ ছক্কা ও ৯ চারে ৮৮ বলে ১০৬ রান করেন ফিলিপস।
মিচেল ও ফিলিপসের নৈপুণ্যে ওয়ানডেতে প্রথমবারের মতো ভারতের বিপক্ষে ম্যাচে জোড়া সেঞ্চুরি দেখে নিউ জিল্যান্ড। আর সব মিলিয়ে এমন কিছু ১৫বার দেখল তারা।
সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে ৮৩ রানের পর দ্বিতীয়টিতে ম্যাচ জেতানো অপরাজিত ১৩১ রান করেন মিচেল। এবার আরেকটি সেঞ্চুরিতে সিরিজে তার রান হলো ৩৫২। তিন ম্যাচের দ্বিপাক্ষিক ওয়ানডে সিরিজে যা নিউ জিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমন পারফরম্যান্সের পর সিরিজ সেরা তিনি ছাড়া আর কে!
লক্ষ্য তাড়ায় টপ ও মিড অর্ডারের ব্যর্থতার দিনে লড়াই করেন কোহলি। পঞ্চাশ ছোঁয়া ইনিংস খেলে তাকে সঙ্গে দেন নিতিশ কুমার রেড্ডি ও হার্শিত রানা। তবে কোহলির ব্যাটেই টিকে ছিল ভারতের স্বপ্ন। ২৭ বলে যখন ৪৬ রান প্রয়োজন, তার বিদায়ে ভেঙে যায় সেই স্বপ্ন। ৩ ছক্কা ও ১০ চারে ১০৮ বলে ১২৪ রান করে হতাশা নিয়ে মাঠ ছাড়েন কোহলি।
শেষের মতো এমন ভালো ছিল না নিউ জিল্যান্ডের শুরুটা। হলকার স্টেডিয়ামে এদিন টস হেরে ব্যাটিংয়ে নেমে প্রথম ৭ বলের মধ্যে দুই ওপেনারকে হারায় তারা। ম্যাচের চতুর্থ ডেলিভারিটি ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হন হেনরি নিকোলস। পরের ওভারের প্রথম বলে স্লিপে ধরা পড়েন ডেভন কনওয়ে।
উইল ইয়াং ও মিচেলের ব্যাটে শুরুর ধাক্কা কিছুটা সামাল দেয় সফরকারীরা। ১ ছক্কা ও ৫ চারে ৩০ রান করা ইয়াংকে ফিরিয়ে ৫৩ রানের জুটি ভাঙেন হার্শিত।
এরপর দলকে টানেন মিচেল ও ফিলিপস। তাদের চমৎকার ব্যাটিংয়ে বাড়তে থাকে কিউইদের রান। ৫৬ বলে ফিফটি করেন মিচেল। শুরুতে কিছুটা মন্থর ব্যাটিং করা ফিলিপস পরে দ্রুত রান বাড়িয়ে পঞ্চাশ স্পর্শ করেন ৫৩ বলে।
ফিলিপস ফিফটি করার দুই ওভার পরই সেঞ্চুরিতে পা রাখেন মিচেল, ১০৬ বলে। পঞ্চাশের পর শতক ছুঁতে বেশি সময় নেননি ফিলিপস। ৮৩ বলে কাঙ্ক্ষিত তিন অঙ্ক স্পর্শ করেন তিনি। ফিফটি থেকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে তার লাগে ৩০ বল।
আর্শদিপের বলে কট বিহাইন্ড হয়ে বিদায় নেন ফিলিপস। তাতে ভাঙে ২১৯ রানের বিশাল যুগলবন্দি। ভারতের বিপক্ষে যেকোনো উইকেটে নিউ জিল্যান্ডের যা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জুটি।
ওই ওভারে দুটি চার মেরে আগের ক্যারিয়ার সেরা ১৩৪ রান ছাড়িয়ে মিচেল। পরের ওভারেই ক্যাচ দিয়ে ফেরেন তিনিও। ৩ ছক্কা ও এক চারে ১৮ বলে অপরাজিত ২৮ রান করে দলের রান সাড়ে তিনশর কাছে নিয়ে যান অধিনায়ক মাইকেল ব্রেসওয়েল।
বিশাল লক্ষ্য তাড়ায় ভারতকে ভালো শুরু এনে দিতে পারেননি রোহিত শার্মা ও শুবমান গিল। পাওয়ার প্লেতে ড্রেসিং রুমের পথ ধরেন দুই ওপেনার। শ্রেয়াস আইয়ার ও লোকেশ রাহুলও পারেননি দলের হাল ধরতে।
৭১ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে বিপদে পড়া ভারতকে টানেন কোহলি ও নিতিশ। ছক্কায় বাউন্ডারির খাতা খোলা কোহলি দ্রুত রান বাড়িয়ে ফিফটি স্পর্শ করেন ৫১ বলে। নিতিশও রানের গতিতে দম দেওয়ায় মনোযোগ দেন। তার ফিফটি আসে ৫২ বলে।
দুটি করে ছক্কা ও চারে ৫৩ রান করা নিতিশকে ফিরিয়ে ৮৮ রানের জুটি ভাঙেন ক্লার্ক। বাঁহাতি স্পিনার জেইডেন লেনক্স টিকতে দেননি রাভিন্দ্রা জাদেজাকে। এরপর ক্রিজে গিয়ে আগ্রাসী ব্যাটিং উপহার দেন হার্শিত। আরেক প্রান্তে কোহলিও বাড়াতে থাকেন দ্রুত রান। তাতে উজ্জ্বল হতে থাকে ভারতের আশা।
৯১ বলে ওয়ানডে ক্যারিয়ারের ৫৪তম সেঞ্চুরিতে পা রাখেন কোহলি। টেস্ট ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নেওয়া তারকার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে শতক হলো ৮৫টি। ১০০ সেঞ্চুরি নিয়ে তার ওপরে কেবল কিংবদন্তি সাচিন টেন্ডুলকার।
কাইল জেমিসনকে ছক্কার পর জ্যাকারি ফোকসকে গ্যালারিতে নিয়ে ফেলেন হার্শিত। ওই ছক্কায় ৪১ বলে প্রথম ওয়ানডে ফিফটির স্বাদ পান তিনি। এক বল পর আরেকটি ছক্কার চেষ্টায় বাউন্ডারিতে হার্শিত ধরা পড়লে ভাঙে ৬৯ বল স্থায়ী ৯৯ রানের জুটি।
পরের বলেই কট বিহাইন্ড হয়ে যান মোহাম্মেদ সিরাজ। শেষ ৩০ বলে যখন ৫৪ রান দরকার, ক্লার্ককে টানা দুই চার মেরে ওভার শুরু করেন কোহলি। এক বল পর ছক্কার চেষ্টায় ক্যাচ দেন বাউন্ডারিতে। তাকে ফিরিয়ে যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিউ জিল্যান্ড।
নেমেই চার মারেন আর্শদিপ। পরের বলে রান নিতে গিয়ে ফিলিপসের সরাসরি থ্রোয়ে রান আউট হন কুলদিপ। অবিস্মরণীয় সিরিজ জয়ের উদযাপনে মাতে কিউইরা।
দুই দলের পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজ শুরু আগামী বুধবার।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
নিউ জিল্যান্ড: ৫০ ওভারে ৩৩৭/৮ (কনওয়ে ৫, নিকোলস ০, ইয়াং ৩০, মিচেল ১৩৭, ফিলিপস ১০৬, ব্রেসওয়েল ২৮*, হে ২, ফোকস ১০, ক্লার্ক ১১, জেমিসন ০*; আর্শদিপ ১০-১-৬৩-৩, হার্শিত ১০-০-৮৪-৩, সিরাজ ১০-০-৪৩-১, নিতিশ ৮-০-৫৩-০, কুলদিপ ৬-০-৪৮-১, জাদেজা ৬-০-৪১-০)
ভারত: ৪৬ ওভারে ২৯৬ (রোহিত ১১, গিল ২৩, কোহলি ১২৪, শ্রেয়াস ৩, রাহুল ১, নিতিশ ৫৩, জাদেজা ১২, হার্শিত ৫২, সিরাজ ০, কুলদিপ ৫, আর্শদিপ ৪*; জেমিসন ৯-০-৫৮-১, ফোকস ৯-০-৭৭-৩, ক্লার্ক ৯-০-৫৪-৩, লেনক্স ১০-০-৪২-২, মিচেল ১-০-১০-০, ফিলিপস ৮-০-৫৪-০)
ফল: নিউ জিল্যান্ড ৪১ রানে জয়ী
ম্যান অব দা ম্যাচ: ড্যারিল মিচেল
সিরিজ: ৩ ম্যাচের সিরিজ ২-১ ব্যবধানে জয়ী নিউ জিল্যান্ড
ম্যান অব দা সিরিজ: ড্যারিল মিচেল