Published : 25 Feb 2025, 05:12 PM
‘এই সংস্করণ ছোটবেলা থেকে অনেক খেলেছি, মানিয়ে নিতে সমস্যা হবে না’- চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি খেলতে দেশ ছাড়ার আগে বলেছিলেন নাজমুল হোসেন শান্ত। প্রসঙ্গ ছিল প্রস্তুতির ঘাটতি। ওয়ানডে টুর্নামেন্টের আগে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা দেড় মাস ধরে ব্যস্ত ছিলেন টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে। শান্ত নিজে এক মাসের বেশি সময় কোনো ধরনের ম্যাচ খেলেননি। তারপরও বাংলাদেশ অধিনায়কের আত্মবিশ্বাসের কমতি ছিল না। খেলাটা যে ওয়ানডে!
শান্ত একা নন, দল হিসেবেই ওয়ানডে ক্রিকেট বাংলাদেশের জন্য বরাবরই স্বস্তির আশ্রয়। টেস্ট বা টি-টোয়েন্টিতে যেমনই হোক, এক দিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সমীহ করার মতো শক্তি হয়ে উঠেছিল তারা। ধারাবাহিকতা, উন্নতির ছাপ, বিশ্বমানে ওঠার সম্ভাবনা কিংবা ক্রিকেটারদের আত্মবিশ্বাস, সবকিছু এই সংস্করণেই ছিল সবচেয়ে বেশি।
‘ছিল’ বলতে হচ্ছে, কারণ সাম্প্রতিক বছরগুলায় এই সংস্করণও যেন আর কথা বলছে না তাদের পক্ষে। অগ্রগতি থমকে গেছে। ওয়ানডের বাংলাদেশও চুপসে গেছে।
২০২৩ বিশ্বকাপের পর ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি- পরপর দুটি আইসিসি টুর্নামেন্টে ভয়াবহ বাজে ক্রিকেট খেলে বিদায় নিয়েছে বাংলাদেশ। দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতেও মিলছে না সাফল্য। সব মিলিয়ে এটা পরিষ্কার, ওয়ানডেতে শক্তিশালী দল হয়ে ওঠার যে আশা জাগিয়েছিল বাংলাদেশ, সেটি আপাতত মিলিয়ে গেছে হাওয়ায়।
গত কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে নজর দিলেই তা স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠবে। ২০২৩ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ৪৩ ওয়ানডেতে বাংলাদেশের জয় মাত্র ১৪টি। ফল আসেনি তিন ম্যাচে আর পরাজয় ২৬টি। এই সময়ে আইসিসির পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে এত ম্যাচ হারেনি আর কোনো দল। জয়-পরাজয়ের অনুপাত বিবেচনায় বাংলাদেশের (০.৫৩৮) নিচে শুধু আয়ারল্যান্ড (০.৫৩৩)।
অথচ এই সময়ে টেস্ট ও টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স তুলনামূলক ভালো। সাদা পোশাকের ক্রিকেটে গত দুই বছরে ১৪ ম্যাচের ৬টি জিতেছে তারা। পাকিস্তানকে তাদের মাঠে হোয়াইটওয়াশ করেছে বাংলাদেশ। টেস্ট জিতেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাঠেও। এছাড়া ঘরের মাঠে আছে নিউ জিল্যান্ডকে হারানোর সুখস্মৃতি। টি-টোয়েন্টিতে ৩৮ ম্যাচ খেলে বাংলাদেশের জয় ২২টি।
জয়-পরাজয়ের হিসেব একপাশে রেখে ওয়ানডেতে আইসিসি টুর্নামেন্টের হিসেব করলেও পাওয়া যাবে শুধুই হতাশা। ভারতে ২০২৩ বিশ্বকাপে আকাশচুম্বি আশা নিয়ে শেষ পর্যন্ত মাত্র দুটি ম্যাচ জেতে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানকে হারিয়ে যাত্রা শুরুর পর আসরের শেষ দিকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয় পেয়েছিল তারা। অন্য বড় দলের সঙ্গে লড়াই জমাতেই পারেনি তারা। এমনকি হেরে যায় নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও।

২০০৩ সালের পর সেবারই প্রথম তিনটির কম জয় নিয়ে বিশ্বকাপ শেষ করে বাংলাদেশ।
এবার চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যাওয়া আগে অধিনায়ক শান্ত সরাসরিই বলে যান, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার লক্ষ্য তাদের। ওয়ানডে ক্রিকেট বলেই হয়তো কণ্ঠে জোর আর হৃদয়ে সাহস বেশি ছিল তার। কিন্তু গর্জন অনেক হলেও বর্ষণ হয়নি সামান্যও। হতশ্রী পারফরম্যান্সের ধারা ধরে রেখে দুই ম্যাচেই চুরমার তাদের সেই স্বপ্ন। ভারতের পর নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষেও পাত্তা পায়নি তারা।
এ নিয়ে টানা তিনটি আইসিসি ওয়ানডে টুর্নামেন্টে প্রথম পর্ব থেকে ছিটকে গেল বাংলাদেশ। ২০১৯ বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আফগানিস্তানকে হারিয়ে শেষ দিক পর্যন্ত সেমি-ফাইনালের লড়াইয়ে ছিল দল। কিন্তু সবশেষ দুই আসরে সামান্যতম সম্ভাবনা জাগাতে পারেনি তারা।
ওয়ানডের এই ব্যর্থতা যে শুধু আইসিসি টুর্নামেন্টে তা নয়, ২০২৩ সাল থেকে ৯টি দ্বিপাক্ষিক সিরিজ খেলে বাংলদেশ জিততে পেরেছে মোটে তিনটি। এর দুটিই আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। এই সময়ে আফগানিস্তান ও নিউ জিল্যন্ডের বিপক্ষে দুটি করে সিরিজ হেরেছে তারা। ঘরের মাঠেও তাদের বিপক্ষে জিততে পারেনি। গত ডিসেম্বরে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর থেকে ফিরতে হয় হোয়াইটওয়াশড হয়ে।
এই সময়ে দলের পারফরম্যান্সে নেই উন্নতির ছাপ। ৪৩ ম্যাচে মাত্র ছয়বার তিনশ ছুঁতে পেরেছে তারা। এর তিনটি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে। বাকি তিন ম্যাচের দুটিতে বাজে বোলিংয়ের কারণে জিততে পারেনি বাংলদেশ। সব মিলিয়ে ওয়ানডেতে তাদের পারফরম্যান্সের গ্রাফ নিম্নমুখী।
শুধু পরিসংখ্যান বা পারফরম্যান্সেই নয়, খেলার ধরনেও নেই অগ্রগতির ছাপ। টি-টোয়েন্টির প্রভাবে ওয়ানডে ক্রিকেটও যেভাবে তরতর করে নতুন উচ্চতায় উঠে যাচ্ছে, নিত্য নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে, বাংলাদেশ সেই সিড়ি বেয়ে উঠতে পারা তো বহুদূর, মাথা উঁচু করে ওপরে দেখতেই পারছে না। আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার ছাপ তারা রাখতে পারছে না, এমনকি নিজেদের সেরা সময়ের প্রদর্শনীটুকুও ধারাবাহিকভাবে করতে পারছে না।
জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক হাবিবুল বাশার অবশ্য এখনই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চান না। তবে সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে দুর্ভাবনার জায়গা দেখছেন তিনিও। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বললেন, এখন থেকেই নড়েচড়ে বসতে হবে।
“এখনই বলব না যে, ওয়ানডেতে নিচের দিকে চলে যাচ্ছি আমরা। তবে সতর্ক হওয়ার সময় এসে গেছে। ২০২৭ বিশ্বকাপের জন্য এখন থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত। এই পরিকল্পনার জন্য দ্বিপাক্ষিক সিরিজগুলোতে গুরুত্ব দিতে হবে যে কীভাবে খেলতে চাই আমরা। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির পর থেকেই এগুলো নিয়ে ভাবনা শুরু করে দেওয়া উচিত।”
গত দুই বছরের বেশি সময়ে ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের সম্মিলিত সেঞ্চুরি ৮টি। জিম্বাবুয়ে ও আয়ারল্যান্ড ছাড়া আইসিসি পূর্ণ সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম সেঞ্চুরি বাংলাদেশেরই।
এই ৮ সেঞ্চুরির মধ্যে মাত্র দুটি করেছেন ওপেনাররা। ২০২৩ সালে নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে ১৬৯ রানের ইনিংস খেলেন সৌম্য সরকার। একই বছর আফগানিস্তানের বিপক্ষে ‘মেকশিফট’ ওপেনার হিসেবে খেলতে নেমে ১১২ রান করেন মেহেদী হাসান মিরাজ।

এর বাইরে লিটন কুমার দাস, তানজিদ হাসানদের পারফরম্যান্স আশানুরূপ নয়। কিছু ম্যাচে সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারেননি এনামুল হক, মোহাম্মদ নাঈম শেখরা। টানা ব্যর্থতায় লিটনও বাদ পড়েছেন দল থেকে। সব মিলিয়ে ওপেনিংয়ে ভালো কিছু পাচ্ছে না বাংলাদেশ।
ওয়ানডেতে ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণ হিসেবে ওপরের দিকের ব্যাটসম্যানদের ফর্মহীনতার বড় দায় দেখেন হাবিবুল।
“আমাদের ওপেনিংয়ে একটা পালাবদলের সময় চলছে। এই জায়গায় পারফরম্যান্স না পাওয়াটা আমাদের দলকে বেশ ভোগাচ্ছে। নিউ জিল্যান্ডের বিপক্ষে হয়তো ভালো শুরু হয়েছে। তবে এটা ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে না।”
“তামিম (ইকবাল) কিন্তু নিয়মিত বড় ইনিংস খেলত। এখন ওপেনিং থেকে ধারাবাহিকভাবে বড় রান পাওয়া যাচ্ছে না। টপ-অর্ডার থেকে আগে যেমন পারফরম্যান্স পাওয়া যেত, সেটা এখন হচ্ছে না। এটা (ফল না পাওয়ার) বড় একটা কারণ।”
দলের ব্যর্থতায় অধিনায়ক শান্ত অবশ্য নির্দিষ্ট কোনো বিভাগের দায় দেখেন না। নিউ জিল্যান্ডের কাছে হেরে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে বিদায়ের পর পুরো দলের মধ্যেই এলোমেলো অবস্থা দেখার কথা বলেন তিনি।
“আমার মনে হয়, দল হিসেবে প্রতিটি বিভাগে ভালো করা গুরুত্বপূর্ণ। একদিন ব্যাটিং ভালো হচ্ছে ওপরের দিকে, একদিন মাঝখানে ভালো হচ্ছে। একদিন ফিল্ডিং ভালো হচ্ছে… মানে এলোমেলো একটা অবস্থা। আমার মনে হয়, সম্মিলিত একটা পারফরম্যান্স যদি করতে পারি, তাহলেই এই ধরনের টুর্নামেন্ট ও বড় দলের বিপক্ষে জেতা সম্ভব।”
জয়ের একটি সুযোগ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতেই এখনও আছে তাদের। হতাশার আসরে নিজেদের শেষ ম্যাচে বৃহস্পতিবার স্বাগতিক পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে তারা। ওই ম্যাচে জিততে পারলে সামনে তাকিয়ে নতুন শুরুর পথে কিছু প্রেরণার রসদ অন্তত মিলবে।