Published : 23 Jan 2026, 06:25 PM
বিপিএলের ফাইনাল শুরু হতে তখনও ঘণ্টা তিনেক বাকি। স্টেডিয়ামের ফটক তখনও খুলে দেওয়া হয়নি দর্শকদের জন্য। মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামের এক নম্বর ফটকের বাইরে তখনই বেশ ভিড় জমে গেছে। ভেতরে প্রবেশের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়ে দর্শকরা। অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশ।
তবে এই উন্মাদনাই তো এই সময়ে দেশের ক্রিকেটের একমাত্র ছবি নয়! দেশের ক্রিকেটের ভাগ্যাকাশে জমে আছে শঙ্কার কালো মেঘ, বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলা হবে তো!
মিরপুর শের-ই-বাংলা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে আনা দর্শকদের মনেও আছে সেই শঙ্কার দোলাচল। অনেকের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল মিশ্র প্রতিক্রিয়া। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিশ্বকাপে খেলা না হলে খারাপ লাগার কথা যেমন তারা বললেন, কেউ কেউ স্বাগত জানালেন সরকার ও বিসিবির অনড় অবস্থানকে, আবার কেউ তুলে ধরলেন দেশের ক্রিকেট নিয়ে ভবিষ্যতের দুর্ভাবনার কথা।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও সরকারের পক্ষ থেকে অনেকবারই বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলতে কোনোভাবেই ভারতে যাবে না বাংলাদেশ। আইসিসির পক্ষ থেকে এক দিন সময় বেঁধে দেওয়া হলে, ক্রিকেটারদের সঙ্গে বৈঠকের পর বৃহস্পতিবার সংবাদ মাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশের অনড় অবস্থানের কথা আবার জানান ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এতেই একরকম নিশ্চিত হয়ে যায়, বাংলাদেশকে ছাড়াই হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ।
বিপিএলের ফাইনাল দেখতে আশা দর্শক নাঈমুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, বিশ্বকাপে বাংলাদেশের না থাকাটা প্রবলভাবেই নাড়া দেবে তার মনজগতকে।
“অনেক মিস করব, বাংলাদেশের প্রতি যে আবেগ আছে, সেটা দেখানো হবে না, অনেক মিস করব। নিজের দেশ খেলা মানে আলাদা অনুভূতি কাজ করে। ওটা থাকবে না।”
“বিসিবির জায়গায় ঠিক আছে, বিসিবিকে ধন্যবাদ। আমাদের একটা সম্মান আছে। এটা আন্তর্জাতিক ইস্যু। তারপরও আমরা আশাবাদী, যদি কিছু হয়। হয়তো স্কোর দেখা হবে, লাইভ খেলা দেখা হবে না তেমন।”
ভারতীয় বোর্ডের নির্দেশে মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাদ দেওয়া থেকেই সবকিছুর সূত্রপাত। বাংলাদেশের বাঁহাতি পেসারকে বাদ দেওয়ার পরদিনই বিসিবি আনুষ্ঠানিকভাবে আইসিসিকে জানিয়ে দেয়, নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ভারতে বিশ্বকাপ খেলতে যাবে না তারা। বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারতের বাইরে সরিয়ে নিতে অনুরোধ করা হয়।
এরপর দুই দফায় সভা হয় আইসিসি ও বিসিবির। তাতে কোনো সমাধান মেলেনি। দুই পক্ষই নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেছে বারবার। বিসিবি দফায় দফায় তুলে ধরেছে নিজেদের নিরাপত্তা শঙ্কার ব্যাপারটি। আইসিসিও প্রতিবারই বলেছে, কোনো দলের প্রতি সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি বা ঝুঁকি নেই।
বিপিএল ফাইনালে রাজশাহী ওয়ারিয়র্সকে সমর্থন করতে আসা পঞ্চগড়ের ইমরানও বাংলাদেশের বিশ্বকাপে না থাকাটা মানতে পারছেন না। তিনি আঙুল তুলছেন ভারতীয় বোর্ডের দিকে।
“বাংলাদেশ সবসময় বিশ্বকাপে খেলে, আশা থাকে ভালো কিছু করার। মিস করব বেশি, খারাপ লাগবে, সবারই খারাপ লাগবে।”

“এটা রাজনৈতিক বিষয়, ভারত চাইলেই শ্রীলঙ্কায় খেলা দিতে পারত। তাদের হাতেই তো সবকিছু, চেষ্টা করলেই পারত। ভারত যদি মোড়লের দেশ না হতো, তাহলে আইসিসি করত।”
বিসিবি আরও ভালোভাবে চেষ্টা করতে পারত কি-না… প্রশ্নটি শেষ না হতেই ইমরানের পাশে থাকা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলে উঠলেন, “বিসিবি আরেকটু চেষ্টা করতে পারত। একবার বাতিল হয়ে গেলে সাড়া বিশ্বে আলোড়ন হয়ে যায়, বাংলাদেশ দল হিসেবে খারাপ না, মোটামুটি ভালো অবস্থানে আছে, খেললে ভালো হতো।”
বাংলাদেশ বিশ্বকাপে না খেললে ভবিষ্যতে দেশের ক্রিকেটে বড় প্রভাব পড়বে নিশ্চিতভাবে। সেই শঙ্কার কথা বললেন সালাউদ্দিনও।
“বড় ধরনের ক্ষতি হবে বলা যায়। ওই রকম আগ্রহ থাকবে না। নিজের দল থাকলে যেমন আগ্রহ থাকে।”
বাংলাদেশের ম্যাচগুলোর ভেন্যু সরিয়ে নিতে বিসিবি অনুরোধ জানায় বিশ্বকাপের সূচি হয়ে যাওয়ার অনেক পর। তাদের সেই অনুরোধ বুধবার খারিজ হয়ে যায় আইসিসি বোর্ড সদস্যদের ভোটে। ১৬ ভোটের মধ্যে নিজেদের বাইরে স্রেফ আর একটি ভোট বাংলাদেশের পক্ষে গেছে বলে জানা গেছে।
কেরানীগঞ্জ থেকে আসা মোহাম্মদ রফিক বললেন, বিসিবি যথেষ্ট চেষ্টা করেছে বলেই তার মনে হচ্ছে। বেশিরভাগ ভোট বাংলাদেশের বিপক্ষে যাওয়ার একটি কারণও খুঁজে পেয়েছেন তিনি।
“চেষ্টা তো অবশ্যই করেছে বিসিবি। কিন্তু রাজনৈতিক কারণে হয়নি। আইপিএলে অন্য দেশের খেলোয়াড়রা খেলতে যায়, তাই অন্য বোর্ড কিছু করতে চায়নি। এই মুহূর্তে ভারতে গিয়ে খেলা ঠিক হবে না। ভারত রাজনৈতিক চাল দিয়েছে।”
আইসিসিকে নিজেদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার ১৮ দিন পর বিশ্বকাপ সঙ্কট নিয়ে ক্রিকেটারদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন ক্রীড়া উপদেষ্টা। মাঝে বিসিবিও যে ক্রিকেটারদের সঙ্গে এ ব্যাপারে যোগাযোগ করেননি কিংবা তাদের মতামত নেওয়া হয়নি, সেটা পরিষ্কার হয়ে যায় বিপিএলের এলিমিনেটর ম্যাচের পর রংপুর রাইডার্স ও বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন কুমার দাসের কথায়।
ক্রিকেটারদের মতামত আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল কি না, এমন প্রশ্ন উঠছে স্বাভাবিকভাবেই। রফিকের মতে, ক্রিকেটারদের মতামত আগে নিলে তারা বিভ্রান্ত হতো।
“ক্রিকেটারদের আসলে… যেহেতু তারা খেলে, ওরা তো চাইবে (খেলতে), ওরা বঞ্চিত হয়েছে। খেলা হলে ভালো হতো। বিসিবি তো ওদের জন্যই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেহেতু গেলে সমস্যা হবে, মতামত নিলে তারা বিভ্রান্ত হতো, একেকজন একেকরকম বলত।”
এক্ষেত্রে আবার ভিন্ন মত দিলেন ফাইনাল দেখতে আসা আরেক দর্শক মাসুদ রানা। বিশ্বকাপে না খেলাটা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের ক্রিকেটে বিরূপ প্রভাব ফেলবে বলে আশঙ্কা তার।
“মতামতটা আরেকটু আগে নেওয়া উচিত ছিল। এটা নিলে ভালো হতো। এটা ঠিক এই মতামত আরও আগে নেওয়া উচিত ছিল। এই বিশ্বকাপে না খেললে র্যাঙ্কিং নিচে যাবে, পরের বিশ্বকাপে বাছাই খেলা লাগতে পারে। এটা ক্রিকেটের জন্য কতটা মঙ্গল হবে, সেটাও বিষয়।”
“প্রভাব অবশ্যই পড়বে এবং এই খেলাটা মনে করেন ধ্বংসের পথে। বাংলাদেশের খেলোয়াড়রা অনেক দিন বসে থাকবে। সামনে কোনো খেলা নেই।”
আইসিসির ভোটাভুটির ফলও অবাক করেছে মাসুদকে।
“আরেকটা জিনিস আমাদের দর্শকদের খারাপ লাগছে, আমরা সবাই শুনে আসছি, বাংলাদেশের পক্ষে সবাই আছে, কিন্তু ভোটের পর শুনছি, পাকিস্তান বাংলাদেশের পক্ষে। আর সবাই বিপক্ষে। এখানে ভারতের কাছে সবাই নত। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ডের মতো বড় দল বাংলাদেশের পক্ষে থাকলে ভালো হতো।”
স্টেডিয়ামের বাইরে জার্সি বিক্রেতা মাসুম এখনও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের খেলার আশা ছাড়ছেন না। তবে নিরাপত্তার প্রশ্নে ছাড় দিতে রাজি নন তিনি।
“আসলে দেখেন প্রত্যেকটা দল অংশ নিলে ভালো লাগে। কিন্তু এখানে বাংলাদেশ, আমি দেশকে এগিয়ে রাখব, নিরাপত্তা আগে। আমরা চাই বড় বড় ইভেন্টে খেলতে, এখনও যদি সম্ভব হয় বাংলাদেশ খেলুক, আমি মনেপ্রাণে চাই।”
বিপিএল ফাইনালে চট্টগ্রাম রয়্যালসকে সমর্থন দিতে আসা অন্তর সামগ্রিক ঘটনায় আঙুল তুললেন আইসিসি ও ভারতের দিকে। তার মতে, বাংলাদেশ না থাকলে দেশের বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বকাপ দেখবে না।
“মিস তো করব অনেক, অনেক রোমাঞ্চিত। বাংলাদেশ যদি না যেতে পারে খারাপ লাগবে, তবে নিরাপত্তা আগে, জনগণ যা মনে করবে তাই হওয়া উচিত। এটা তো আইসিসির হাতে, এটা তারা পারত, আমার মনে হয় ভারত আইসিসির কথায় চলে।”
“বিশ্বকাপে খেলা দেখার আগ্রহ থাকবে না, বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ মানুষই দেখবে না আমার মনে হয়।”
বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অভাব অনুভব করলেও ভারতে গিয়ে খেলার পক্ষে নন রাজশাহীর সমর্থক রাসেল। তবে এখানে বিসিবির দায়ও দেখছেন তিনি।
“অনেক মিস করব, কিন্তু ওই দেশে (ভারত) না হলেও আমরা খুশি, শ্রীলঙ্কায় হোক। বিসিবি ব্যর্থই হয়েছে বলা যায়, ভালোভাবে কথা বলতে পারত আরেকটু। ক্রিকেটারদের জন্য তো আসলেই খারাপ লাগে।”