Published : 01 Feb 2026, 01:50 PM
বাংলাদেশের ক্রিকেটে একটা লম্বা সময় বড় রহস্যের নাম ছিল সোবহানা মোস্তারি। এদেশের নারী ক্রিকেটের বাস্তবতায় তার টেকনিক খারাপ নয়, হাতে শট আছে অনেক। অনুশীলনে বা ঘরোয়া ক্রিকেটে তার প্রতিভা ফুটে উঠেছে নানা সময়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ম্যাচের পর ম্যাচ, বছরে পর বছর তিনি ছিলেন ব্যর্থ। তবু কেন বারবার সুযোগ পাচ্ছেন, সেই প্রশ্ন উঠেছে নানা সময়ে। সেই সোবহানা এবার গড়লেন এমন কীর্তি, যা পারেননি দেশের আর কেউ।
সোবহানার পারফরম্যান্সে উন্নতির ছাপ গত কিছুদিনে দৃশ্যমানই ছিল। এবার নিজেকে অনন্য উচ্চতায় তুলে নিলেন নেপালে উইমেন’স টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাইয়ে। ২৩ বছর বয়সী ব্যাটার গড়লেন এক সিরিজ বা টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড।
রোববার নেদারল্যান্ডসকে হারিয়ে সাত ম্যাচে সাত জয়ে অপরাজিত সেরা হয়ে বাছাই শেষ করে বাংলাদেশ। শেষ ম্যাচে ২৩ বলে ৩৩ রানের অপরাজিত ইনিংস খেলেন সোবহানা।
এই আসরে ৭ ইনিংসে রান করেন তিনি ২৬২। বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটার এক সিরিজে বা টুর্নামেন্টে ২০০ রানও করতে পারেননি।
এই টুর্নামেন্টেই দুইশর কাছাকাছি গিয়েছেন শারমিন সুলতানা। শেষ ম্যাচে ১৩ রানে আউট হয়ে আসর শেষ করেছেন তিনি ১৯৫ রানে।
এই আসরের আগে রেকর্ডটি ছিল নিগার সুলতানার। ২০২২ বিশ্বকাপের বাছাইয়ে ৫ ম্যাচে ১৮০ রান করেছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
২০১৯ বিশ্বকাপ বাছাইয়ে ৫ ম্যাচে ১৫৬ রান করেছিলেন সানজিদা ইসলাম। এবারের আসরেই ১৫৫ রান করে রেকর্ডের পাঁচে আছেন দিলারা আক্তার।
শুধু রানের সংখ্যায় নয়, রান করার ধরনেও নজর কেড়েছেন সোবহানা। বরাবরই তিনি আগ্রাসী ছিলেন। তবে সেখানেও উন্নতি ও ধারাবাহিকতার ছাপ পড়েছে এই আসরে। এই টুর্নামেন্টে তার স্ট্রাইক রেট ১৪৫.৫৫, বাংলাদেশের বাস্তবতায় যে কোনো মানদণ্ডে যা দুর্দান্ত। তুলনামূলক ছোট দলগুলির বিপক্ষেও সাধারণত ধারাবাহিকতা এত দ্রুততায় রান করতে দেখা যায় না এদেশের ব্যাটারদের।
বাংলাদেশের হয়ে কোনো সিরিজ বা টুর্নামেন্টে একাধিক ইনিংস খেলে অন্তত ১০০ রান করা ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটের রেকর্ড এটিই।

এই আসরেই ১৩৫.৯৬ স্ট্রাইক রেটে রান করে সোবহানার পর জায়গা করে নিয়েছেন দিলারা আক্তার। এবারের আগের রেকর্ডটি ছিল নিগারের, ২০২৩ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে সেই স্ট্রাইক রেট ছিল মাত্র ১১১.৮৮।
সংখ্যাগুলোই বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশের মানদণ্ডে কতটা উজ্জ্বল এখন সোবহানা।
এই টুর্নামেন্টের আগে তার ক্যারিয়ার ব্যাটিং গড় ছিল ১৫.৪২, স্ট্রাইক রেট ৮৪.৫৫। জীর্ণ সেই পরিসংখ্যানের ব্যাটারই এই আসরে নিজেকে তুলে নিয়েছেন নতুন উচ্চতায়।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে প্রথমবার ৩০ ছাড়াতে ৩৯ ম্যাচ লেগে যায় তার। এরপর পারফরম্যান্সে উন্নতি হলেও ফিফটির দেখা পাচ্ছিলেন না।
ওয়ানডেতেও অবস্থা ছিল তথৈবচ। প্রথম ২৪ ওয়ানডে একবারও ছাড়াতে পারেনি ৩৫। সেই আক্ষেপ ঘুচিয়ে ওয়ানডেতে প্রথম ফিফটি করেন গত অক্টোবরে। বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেন ৬০ রানের ইনিংস। ওই বিশ্বকাপেই পরে অপরাজিতত ৬৬ রানের ইনিংস খেলেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।
টি-টোয়েন্টিতে অপেক্ষার পালা চলছিলই। ৫০ ম্যাচ পেরিয়েও ৫০ রানের ইনিংস আসেনি তার ব্যাট থেকে। অবশেষে এই বাছাইপর্বের সুপার সিক্স পর্বে থাইল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে শেষ হয় তার দীর্ঘ প্রতীক্ষা। অভিষেকের প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর ৫২তম ম্যাচে এসে প্রথমবার পান টি-টোয়েন্টি ফিফটির স্বাদ।
ওই ম্যাচে ৪২ বলে ৫৯ রানের ইনিংস খেলে পরের ম্যাচেই আরেকবার কাছাকাছি যান। এবার আউট হয়ে যান ২৩ বলে ৪৭ রান করে। পরে শেষটাও করলেন ভালো।
তবে আসর শেষ হলেও এটিকে বলা যায় তার নতুন শুরু। অনেক আক্ষেপের প্রহর পেরিয়ে সোবহানার কাছে আশা, সাফল্য যাত্রায় ছুটে চলার।