শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নে কতটুকু পরিবর্তন আসবে ঢাবি শিক্ষকদের পাঠদানে?
শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরাও। তবে বিভিন্ন বিভক্তির কারণে চ্যালেঞ্জ রয়েছে বলে মনে করেন শিক্ষকদের কেউ কেউ।
উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের মতামতের ভিত্তিতে শিক্ষকদের পাঠদানের মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যা আগামী জুন থেকে চালুর কথা ভাবছে কর্তৃপক্ষ।
দেশের কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পদ্ধতি চালু থাকলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নেই এর প্রচলন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথ অনুসরণ করে অন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও তা চালু করতে আগ্রহী হবে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরিটাস অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম মনে করেন, শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ের মধ্যেই সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ তৈরি হবে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এই মূল্যায়ন পদ্ধতি সমস্ত বিশ্বেই আছে। এটি এখন শিক্ষকতার একটি অংশ হয়ে গেছে। একজন শিক্ষক কার কাছে দায়বদ্ধ? দায়বদ্ধতা এবং তার নিজস্ব উন্নয়নের জন্যই মূল্যায়ন পদ্ধতিটা প্রয়োজন।
“একজন শিক্ষক যদি বিশেষ কারণে নিয়োগ পান, তিনি সেই বিষয়টা জানেন কিনা, সেই বিষয়টা পড়াতে পারছেন কিনা, এটা যদি মূল্যায়ন করা না হয়, তাহলে তো তিনি বছরের পর বছর উচ্চতায় উঠতে পারবেন না। তার কাজেরও তেমন উন্নতি হবে না।”
পাঠদানের এই মূল্যায়নে শিক্ষক, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং দেশের উন্নতি হবে বলে মনে করেন এই শিক্ষাবিদ।
“এটাকে সবার ওয়েলকাম করা উচিত। আমি আগে থেকেই এই মূল্যায়নের কথা বলেছি। এখন যে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, এটাকে আমি সাধুবাদ জানাই।”
যেভাবে হবে মূল্যায়ন
শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি নীতিমালা তৈরি করেছে। অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সুপারিশের ভিত্তিতে ২০২২ সালের ৩০ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেটের সভায় তা অনুমোদন করা হয়।
নীতিমালা অনুযায়ী, পাঁচটি সূচকে মোট ২২টি প্রশ্নের ভিত্তিতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন করবেন। কোনো একটি কোর্স অধ্যয়ন শেষে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে তাদের নিজেদের ড্যাশবোর্ডে লগইন করে শিক্ষক মূল্যায়ন করতে পারবেন।
কোনো শিক্ষক শ্রেণিকক্ষে কেমন পাঠদান করেন, ক্লাসের রুটিন অনুযায়ী সময়মত ক্লাস শুরু করেন কিনা, নির্দিষ্ট সময়ে কোর্স শেষ করেন কিনা, জ্ঞানভিত্তিক লেকচার দেন কিনা, কোর্সের বিষয়বস্তু কেমন, ক্লাসগুলো আকর্ষণীয় এবং প্রাণবন্ত করতে পারছেন কিনা, শ্রেণিকক্ষে আরামদায়ক অ্যাকাডেমিক পরিবেশ তৈরি করতে পারছেন কিনা, কোর্স ম্যাটেরিয়ালস সরবরাহ করছেন কিনা, পরীক্ষা-অ্যাসাইনমেন্ট ঠিকমত নিচ্ছেন কিনা এবং সেগুলোর ঠিকমত মূল্যায়ন হচ্ছে কিনা, সামগ্রিকভাবে শিখন প্রক্রিয়া কার্যকর ছিল কিনা- এমন মোট ২২টি বিষয়ে লিকার্ট স্কেলে শিক্ষার্থীদের মতামত জানতে চাওয়া হবে। শেষে তিনটি প্রশ্নের ভিত্তিতে লিখিতভাবে মন্তব্য ও পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
সেগুলোর গড় করে শিক্ষকের সামগ্রিক স্কোর নির্ধারণ করা হবে। ৫ পয়েন্টকে সর্বোচ্চ সীমা ধরে ২.৫ পয়েন্টকে সর্বনিম্ন এবং ৪.৫ থেকে ৫ পয়েন্টকে ‘উৎকৃষ্ট’ হিসেবে ধরা হবে।
৪.০ থেকে ৪.৫ পয়েন্টকে ‘খুব ভালো’, ৩.৫ থেকে ৪.০ পয়েন্টকে ‘ভালো’, ৩.০ থেকে ৩.৫ পয়েন্টকে ‘চলনসই’, ২.৫ থেকে ৩.০ পয়েন্টকে ‘খারাপ’, ২.৫ পয়েন্টের নিচে ‘খুব খারাপ’ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
শিক্ষার্থীদের এসব মতামতের বিষয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষক সরাসরি জানতে পারবেন না। শুধু বিভাগীয় প্রধান এবং অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের প্রধানরা জানতে পারবেন। এসব বিষয় নিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের সঙ্গে বিভাগীয় প্রধান এবং অনুষদ ও ইনস্টিটিউটের প্রধানরা কথা বলবেন।
শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর আগে সব বিভাগ এবং ইনস্টিটিউটের শিক্ষক উপদেষ্টা ও শ্রেণি প্রতিনিধিদের (সিআর) প্রশিক্ষণ দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউশনাল কোয়ালিটি অ্যাসুরেন্স সেল (আইকিউএসি)।
সেলের পরিচালক অধ্যাপক সাবিতা রিজওয়ানা রহমান বলেন, “আমাদের ৯৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের ৭১০ জন শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি বিভাগ ও ইনস্টিটিউট থেকে ন্যূনতম দুইজন করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তারা তাদের বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের অন্যান্য শিক্ষকদের সঙ্গে শেয়ার করেছেন।
“এখন এটা সিআরদের সঙ্গে শেয়ার করার প্রক্রিয়ায় আছে। অনেক বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের ক্লাস সিআরদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। বাকিদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হচ্ছে। সিআররা তাদের সহপাঠীদের সাথেও এটা শেয়ার করছে।”
শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়নের জন্য প্রশিক্ষণ নিয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ১৩ ব্যাচের সিআর তানভীর আল হাদী মায়েদ।
তিনি বলেন, “টিচিং ইভ্যালুয়েশন কীভাবে করতে হয়, কী কী প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, সেগুলো আমাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষকদের কোন কোন বিষয়গুলো মূল্যায়ন করা উচিত, এ বিষয়ে আমাদের লিখিত পরামর্শ নেওয়া হয়েছে।”
শিক্ষার্থীরা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন, সে বিষয়ে একটি ভিডিও টিউটরিয়ালও দেওয়া হয়েছে বলে জানান মায়েদ।
শিক্ষকের পাঠদান মূল্যায়ন কেমন হওয়া উচিত এমন প্রশ্নে অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, “মূল্যায়নটা দুই রকম হতে পারে। একটা মূল্যায়ন আমরা পারব না, সেটা হচ্ছে পিয়ার ইভালুয়েশন। সহকর্মীরা একজন আরেকজনকে মূল্যায়ন করবে, সেটা আমাদের দেশে সম্ভব নয়। কেননা আমাদের রাজনীতি এত বিভাজিত, সেখানে অবশ্যই রাজনীতি চলে আসবে। কয়েকটা বিভাগ ভালো করবে, কোনো কোনো বিভাগ সেটা পারবে না।
“শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতিটা হতে হবে বস্তুনিষ্ঠ। তাদেরকেও বুঝাতে হবে, আমরা মূল্যায়নটা ঠিকমত করেছি। সেজন্য ছাত্র-ছাত্রীদেরও ট্রেনিং দিতে হবে প্রথমে। আমি মনে করি এটা আমাদের সামনে যাওয়ার একটা উপায়। শিক্ষক মূল্যায়নে বাধা আসবে, তারপরও এটি চালু করা উচিত। কিন্তু এই মূল্যায়নের মাধ্যমে কাউকে যেন অযাচিতভাবে শাস্তি দেওয়া না হয়।”
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কীভাবে মূল্যায়ন হয়?
কোনো কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্ব সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন করেন।
নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড সোশাল সায়েন্সেস এর ডিন অধ্যাপক এসকে তৌফিক এম হক জানান, প্রায় ২০ বছর ধরে তারা শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন পদ্ধতি চালু রেখেছেন।
“আমাদের একটা ইনবিল্ট সফটওয়্যার আছে, এটাকে আরডিএ সিস্টেম বলা হয়, ওই সফটওয়্যারের মধ্যে স্টুডেন্টরা গিয়ে ইভালুয়েশন কমপ্লিট করে। ফাইনাল এক্সামের আগে ইভালুয়েশনটা দেয়, এটা ফ্যাকাল্টি জানতে পারে পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়ার পর, যাতে কোনো পক্ষপাতিত্ব না থাকে এবং কারো নাম থাকে না।”
তিনি জানান, শিক্ষার্থীরা ‘ফ্যাকাল্টি ইভালুয়েশন’ করে দুই ভাগে।
“একটা হচ্ছে শিক্ষক যিনি পড়ান, তার পারফর্মেন্স কী রকম, উনি সঠিক সময়ে ক্লাসে আসেন কিনা, ঠিক সময়ে ক্লাস শেষ করেন কিনা, সিলেবাস পুরোটা কভার করেন কিনা, ঠিকমত বোঝাতে পারেন কিনা এরকম ১০-১২টা পয়েন্ট থাকে। আরেকটা হচ্ছে, যে কোর্সটা উনি পড়ান, সেই কোর্স থেকে শিক্ষার্থীরা উপকৃত হচ্ছে কিনা সে বিষয়ে ৫-৬টা প্রশ্ন।”
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের শিক্ষার্থী মাহবুবুর রহমান জানান, তাদের ইউআরএমএস নামে একটি সফটওয়্যার রয়েছে, যার মাধ্যমে শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন করা হয়।
“আমরা কোনো একটি কোর্স শেষে টিচিং ইভ্যালুয়েশন করতে হয়। এটা না করলে পরীক্ষার রেজাল্ট দেওয়া হয় না।”
শিক্ষার্থীদের ভাবনা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়নের সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের ভাষ্য, পাঠদান মূল্যায়ন চালু হলে একজন শিক্ষক তার কোন কোন জায়গায় আরও উন্নতি করা প্রয়োজন তা বুঝতে পারবেন। এছাড়া যেসব শিক্ষক ভালো পড়ান, তাদেরকেও যথাযথ মূল্যায়ন করা যাবে।
বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী ইয়াসিন আল শাহীন বলেন, “এই মূল্যায়নের জন্য এতদিন কোনো প্ল্যাটফর্ম ছিল না। কোন টিচার কেমন পড়াচ্ছেন, তার কোন দিকটা ভালো লাগছে, কোনটা খারাপ লাগছে, এই বিষয়গুলো আমাদের প্রকাশ্যে বলার সুযোগ ছিল না। এটা চালু করা হলে বিশ্ববিদ্যালয়কে সাধুবাদ জানানো উচিত।”
আইন বিভাগের শিক্ষার্থী ফাহাদ হাবীব বলেন, “দেখা যায়, একই কোর্স একজন টিচার অনেক বছর ধরে নিচ্ছেন, তার তো নানা ধরনের ঘাটতি থাকতে পারে। স্টুডেন্টদের কাছে কোনো একটি পার্টিকুলার বিষয় পছন্দ নাও হতে পারে। স্টুডেন্টদের এই পছন্দ বা অপছন্দের বিষয়টা প্রকাশ করার তো কোনো জায়গা নেই। সেই জায়গা থেকে শিক্ষক মূল্যায়ন চালু থাকলে শিক্ষার্থীরা তাদের মতামত দিতে পারবে। টিচাররাও সংশোধন করার সুযোগ পাবেন।”
মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকদের দোষ খোঁজা নয়, বরং তাদের পাঠদান প্রক্রিয়ার উন্নতি হবে বলে মনে করেন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শৈবাল রায়।
“সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিভুক্ত করায় টিচারদের আরও ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। এই বাড়তি প্রেশারটা পড়ায় টিচারদের ওইখানেও সময় দিতে হয়। কোনো একটি ক্লাস নিতে গেলে অবশ্যই শিক্ষকদের প্রিপারেশন নিয়ে যেতে হয়, সেই প্রিপারেশনের টাইমটা দেখা যাচ্ছে উনারা পাচ্ছেন না। আলটিমেটলি উনারা যতটুকু ভালো পড়াতে পারতেন, তার চেয়ে তুলনামূলক খারাপ পড়াতে হচ্ছে।”
অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া ইসলাম ঐশী বলেন, “বলা হয়ে থাকে, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষক হন সিনিয়র স্কলার এবং শিক্ষার্থীরা হন জুনিয়র স্কলার। শিক্ষকদেরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শেখার আছে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থাটা ইন্টারেক্টিভ হওয়া দরকার।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এটি ‘যুগান্তকারী’ উদ্যোগ হবে মন্তব্য করে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী নূর মোহাম্মদ বলেন, “টিচিং ইভালুয়েশন সিস্টেম চালু হলে সকল শিক্ষকের দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতা বাড়বে বলে আশা করছি।”
মূল্যায়নের পক্ষে শিক্ষকরাও, আছে চ্যালেঞ্জও
পাঠদান মূল্যায়নের পদ্ধতি চালুর সিদ্ধান্তের পক্ষে মত দিয়েছেন শিক্ষকরাও। ঢাকার মত সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি চালু করা উচিত বলে মনে করেন তারা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি নিজামুল হক ভূঁইয়া বলছেন, এই কার্যক্রম শিক্ষার মানকে আরো সমৃদ্ধ করবে। এর মাধ্যমে শিক্ষকরা আরও দায়িত্বশীল হবেন।
“যারা ক্লাসের ব্যাপারে আন্তরিক নন, ক্লাস কম নেন, তারা সচেতন হবেন এবং আরও বেশি প্রস্তুতি নিয়ে ক্লাসে যাবেন। আশা করি আমাদের প্রত্যেক শিক্ষক এটিকে ইতিবাচক হিসেবে নেবেন এবং এর মাধ্যমে ভালো ফল আসবে। আমি মনে করি, শিক্ষার উন্নয়নের জন্য শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সব বিশ্ববিদ্যালয়ে এটি চালু করা উচিত।”
মূল্যায়নের মাধ্যমে শিক্ষকরা নিজেদের দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা জানতে পারলে সে অনুযায়ী নিজেদের শিখন পদ্ধতিতে উন্নতি ঘটাতে পারবে বলে মনে করেন কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক আবদুল বাছির।
“আমি এটাও বিশ্বাস করি, আমাদের মধ্যে গবেষণা, লেখাপড়া, ক্লাস নেওয়া এবং চিন্তা-চেতনার প্রতিযোগিতা শুরু হবে। এই প্রতিযোগিতার অর্থ হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।”
এই পদ্ধতি চালু হলে একটি ইতিবাচক ফল আসবে বলে মনে করেন বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. আব্দুস ছামাদ।
দেশের বাইরে শিক্ষকতা করে আসা সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক জিয়া রহমান মূল্যায়নের মাধ্যমে সেরা শিক্ষকের পুরস্কার পাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, “শিক্ষক মূল্যায়ন খুবই সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। আমরা অনেক দেরি করে ফেলেছি। আসলে এটা অনেক আগেই আমাদের করা উচিত ছিল। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যান্ডার্ডের জায়গা থেকে এটা খুবই জরুরি।”
তবে বাংলাদেশে এই পদ্ধতি চালু করাটা চ্যালেঞ্জিং হতে পারে বলে মনে করেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি থেকে পড়ে আসা অধ্যাপক জিয়া রহমান।
তিনি বলেন, “আমাদের মত দেশে এটা নিয়ে ভীতি আছে, কারণ কেউ কারো প্রতি বিরাগভাজন হয়ে মূল্যায়ন করতে পারে। কোনো শিক্ষকের প্রতি কারো নেগেটিভ অ্যাটিচিউড থাকতে পারে, তাহলে অবমূল্যায়ন করতে পারে।
“আমাদের মত দেশে এগুলো যেহেতু চালু হয়নি, এটা একটা চ্যালেঞ্জ। কারণ আমরা এখানে নানাভাবে বিভক্ত। কেউ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, কেউ আদর্শের জায়গা থেকে বিভক্ত। কারো উন্নত মানসিকতা হয়নি। আমার মনে হয়, এই কারণেই দীর্ঘদিন ধরে আমাদের দেশে এটা চালু হয়নি। তবে এটা চালু করলে কোনো শিক্ষক বড় ধরনের ভিক্টিমাইজ হবে বলে আমি মনে করি না।”
শিক্ষকদের পাঠদান মূল্যায়ন চালুর প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য হল শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করা, কোয়ালিটি বাড়ানো এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ইন্টারঅ্যাকশন, শিক্ষকের রেসপন্সিবিলিটি অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি বাড়ানো।
“সর্বোপরি শিক্ষকের মর্যাদা রক্ষা করে, শিক্ষার্থীদের অধিকার রক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসম্মত শিক্ষা এবং গবেষণা নিশ্চিত করার জন্য এই কার্যক্রমটা আমরা শুরু করতে যাচ্ছি।”
এই কার্যক্রমে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা মেনে চলা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, এটি চালু করার আগে ধারণা দেওয়ার জন্য বিশেষ সেমিনার ও কর্মশালা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ বছরের জুন মাসেই সব বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে এটা চালু হয়ে যাবে জানিয়ে উপাচার্য বলেন, “আমরা শিক্ষকদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়েছি, যতটুকু তাদের অবহিত করা দরকার। আর শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ জানুয়ারি মাসেই শেষ হওয়ার কথা। প্রত্যেক বিভাগের যারা সিআর আছে এবং সংশ্লিষ্ট স্টুডেন্ট উপদ্ষ্টো শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার বিষয় আছে। স্টুডেন্ট উপদ্ষ্টোসহ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। এখন সিআরদের প্রশিক্ষণ দেবে স্টুডেন্ট উপদ্ষ্টোরা, যার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন।”
