ঢাবির সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ

বিভাগের পরবর্তী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার আগে ‘ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার’ হচ্ছেন বলে দাবি ওই শিক্ষকের।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 10 Feb 2024, 07:49 PM
Updated : 10 Feb 2024, 07:49 PM

নম্বর কম দেওয়া নিয়ে স্নাতকোত্তরের একটি ব্যাচের বেশ কিছু শিক্ষার্থীর অভিযোগের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ এনেছেন বিভাগের এক নারী শিক্ষার্থী।

শনিবার দুপুরে ওই বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. মাকসুদুর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন ওই শিক্ষার্থী। অভিযোগের সঙ্গে কিছু অডিও রেকর্ড ও মেসেজের স্ক্রিনশটও জমা দিয়েছেন তিনি।

প্রক্টর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “একজন মেয়ে আজকে লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। রোববার সেটি উপাচার্যের কাছে জমা দেওয়া হবে।”

তবে অধ্যাপক নাদির জুনাইদ এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এর পেছনে অন্য কিছু দেখছেন। বিভাগের পরবর্তী চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার আগে ব্যক্তিগত আক্রমণের শিকার হচ্ছেন বলে দাবি করেন তিনি।

ওই নারী শিক্ষার্থী ২০২২ সালে কোভিডকালীন বিধিনিষেধ ওঠার পর সশরীরে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হলে অধ্যাপক নাদির জুনাইদ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা করেন বলে অভিযোগে তুলে ধরেছেন।

তার অভিযোগ, মোবাইল ফোনে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের মেসেঞ্জারে ও সাক্ষাতে তার সঙ্গে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলার চেষ্টা করেন। পরের দিকে অশোভন নানা ইঙ্গিতও দিয়েছেন।

ওই শিক্ষার্থীর দাবি, অনেক বলার পর তিনি নাদির জুনাইদের জন্মদিনে তার বাসায় গিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই শিক্ষকের কাছাকাছি আসার চেষ্টার অভিযোগও তুলে ধরেছেন প্রক্টরের কাছে জমা দেওয়া আবেদনে।

দিনের পর দিনে কৌশলে নাদির জুনাইদের বিভিন্ন কথা নাকচ করে দিলেও এসব বিষয় এই শিক্ষার্থীকে অস্বস্তিতে ফেলত বলে অভিযোগে তুলে ধরেছেন।

এতদিন কেন অভিযোগ আনা হয়নি এমন প্রশ্নে অভিযোগকারী শিক্ষার্থী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এই হয়রানিটা একটা দীর্ঘ সময় ধরে চলছিল। ভয়ে এতদিন মুখ খুলতে পারিনি। কারণ উনার কোর্স ছিল আমাদের ব্যাচে।

“এখন যেহেতু আমি এখানে মাস্টার্স করব না, এখন আর উনার কোর্স নিয়ে কোনো ভয় নেই। তাছাড়া এখন অনেকেই উনার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন, এটা আমাকে সাহস জুগিয়েছে।"

অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্সে ভর্তি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা লিখিত অঅভিযোগে তুলে ধরে ওই শিক্ষার্থী বলেন, "উনি আমাদের বিভাগের সামনে চেয়ারপারসন হচ্ছেন। শুধু এই ভয়ে আমার পরিবারের কাছে আমার দেড় বছর আগে থেকে বলতে হচ্ছে যে আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করব না। দরকার হলে নিজের টিউশনির টাকা দিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করব।”

নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক নাদির জুনাইদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কে কী অভিযোগ করেছে তা তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি।

তবে নম্বর নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই এই অভিযোগ কেন, সেই প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, “ঠিক এই মূহুর্তে কেন? যখন আমার নামে এত লেখালিখি হচ্ছে। দীর্ঘদিন হলে তো আগেই আসতে পারত। একের পর এক আমাকেই করা হচ্ছে এরকম-এতদিন কোনো অভিযোগ আসলো না মেন্টাল টর্চারের, ঠিক এই মুহুর্তেই আসলো; ব্যাপারটা কেমন।”

গত ৬ ফেব্রুয়ারি বিভাগের ১২তম ব্যাচের (২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ) স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়। এতে ৫৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন।

তাদের মধ্যে গত ৭ ফেব্রুয়ারি ২৮ জন পরীক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন, ১০০ নম্বরের সমন্বিত কোর্সে তারা ৫৪ জনের মধ্যে ৩৫ জন সিজিপিএ ৩-এর কম পেয়েছেন (৪-এর মধ্যে)। স্নাতক পর্যায়ের ফলাফলে যারা ভালো করেছিলেন, তারাও এই কোর্সে খুব একটা ভালো করতে পারেননি।

অভিযোগে বলা হয়, ব্যাচটির স্নাতকোত্তর পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও সমন্বিত কোর্সের (এমসিজে-৫২৭) প্রথম পরীক্ষক ছিলেন নাদির জুনাইদ। এই কোর্সের মৌখিক পরীক্ষার বোর্ডেও ছিলেন তিনি।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অভিযুক্ত শিক্ষক ফল প্রকাশের আগেই অন্য ব্যাচের ক্লাসে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ‘খারাপ ফলাফল’ নিয়ে মন্তব্য করেন। তাছাড়া মৌখিক পরীক্ষায় অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে পরীক্ষার্থীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিলেন।

এ বিষয়ে অধ্যাপক নাদির জুনাইদ বলেন, “ভাইভা নিয়েছে চারজন, খাতা দেখেছে দুইজন- কিন্তু আমার বিরুদ্ধে একা অভিযোগ। আমি একা নম্বর কমিয়েছি। আমি একা কমাই কী করে? আমি তো একা খাতা দেখিনি। যখন আমাকে এভাবে অযৌক্তিকভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে, তারপর মূহুর্তেই এমন একটা অভিযোগ। একই সময়ে এগুলো আসছে।”

তার দাবি, “এমন না আমি খুব ভিন্ন রকমভাবে এবার মার্কস দিয়েছি। এবার যেভাবে দিয়েছি, এতদিনও সেভাবেই দিয়েছি। তখন তো কেউ প্রতিবাদ করেনি, এই মূহুর্তে প্রতিবাদ হচ্ছে কেন? সামনে আমার চেয়ারম্যানশিপ আসতে যাচ্ছে।”

তিনি বলেন, বিগত ২৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ আসেনি। আগামী জুনে বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে তার, ফলে এসময়ে এমন অভিযোগগুলো পরিকল্পিত বলে মনে করছেন তিনি।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, অভিযোগ তার কাছে পৌঁছালে বিশ্ববিদ্যালয়ের যে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার দেখেশুনে তা নেওয়া হবে।

নম্বর নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, “সেটা পেয়েছি। আমাদের প্রো- উপাচার্য (শিক্ষা) বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।”

এদিকে শনিবার সন্ধ্যায় ‍টিএসসিতে এক মানববন্ধনে নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে আসা যৌন হয়রানির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা। এসময় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘অকার্যকর’ যৌন নিপীড়ন বিরোধী সেলকে পুনরায় সক্রিয় করার আহবানও জানান।

মানববন্ধন শেষে সমাবেশে বক্তব্য দেন ঢাবি ছাত্র ইউনিয়নের একাংশের সভাপতি মেঘমল্লার বসু, সহ-সভাপতি মাশফিয়া আক্তার মৌমি।