Published : 01 Jun 2026, 04:22 PM
বনানীর প্রাইমএশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদল নেতা জাহিদুল ইসলাম পারভেজ হত্যা মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রীসহ নয়জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে পুলিশ।
তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই নেতাসহ আটজনকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
এক বছর ধরে তদন্ত করে বনানী থানার পরিদর্শক এ কে এম মঈন উদ্দিন গত ২৯ এপ্রিল আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন।
প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই মোক্তার হোসেন জানান, গত ৬ মে তারা অভিযোগপত্র হাতে পেয়েছেন।
সেখানে বলা হয়েছে, হাসাহাসিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়ায় দুইপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিষয়টি মিটিয়ে দেন। ‘অপরাধ না করে’ও দুই তরুণীকে বোন ডেকে ক্ষমা চান পারভেজ। তবুও তার প্রাণ কেড়ে নেয় ঘাতকরা।
তবে এই অভিযোগপত্র নিয়ে আপত্তি জানিয়ে মামলার বাদী বলেছেন, যারা ‘খুনি’ তাদের অনেককে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
গতবছরের ১৯ এপ্রিল বিকেল ৪টার দিকে বনানীতে প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ ও টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘাত শুরু হয়। এসময় ইংরেজি বিভাগের একদল শিক্ষার্থীর ছুরিকাঘাতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী পারভেজ নিহত হন।
হত্যাকাণ্ডের পরদিন এক সংবাদ সম্মেলনে পারভেজকে নিজেদের কর্মী দাবি করে এ হত্যাকাণ্ডে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বনানী শাখার কয়েকজন নেতার জড়িত থাকার অভিযোগ করে ছাত্রদল।
সেদিনই বনানী থানায় মামলা করেন পারভেজের মামাতো ভাই হুমায়ন কবীর। সেখানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বনানী থানা ইউনিটের যুগ্ম সদস্য সচিব মারুফ মিয়াজি হৃদয় এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বনানী থানার যুগ্ম আহ্বায়ক সোবহান নিয়াজ তুষারসহ আট জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরো ২৫-৩০ জনকে আসামি করা হয়।
তদন্তের মধ্যে দুই ছাত্রীরও নাম আসে। আদালতের নির্দেশ তাদেরও গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়।
তদন্ত শেষে পুলিশ যে অভিযোগপত্র দিয়েছে, সেখানে মোট নয়জনকে আসামি করা করা হয়েছে।
তারা হলেন- মেহেরাজ ইসলাম, আবু জহর গিফফারি ওরফে পিয়াস, মো. মাহাথির হাসান, মো. আল কামাল শেখ ওরফে কামাল, আলভী হোসেন জুনায়েদ, আল আমিন সানি, ফাতেমা তাহসিন ঐশী, ফারিয়া হক টিনা ও রাকিব।
আসামিদের মধ্যে পিয়াস, ঐশি ও রাকিব পলাতক থাকায় তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির সুপারিশ করা হয়েছে। আর আটজনকে মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করেছেন।
তারা হলেন– সোবহান নিয়াজ তুষার, মারুফ মিয়াজি হৃদয়, রিফাত, আলী, ফাহিম, সাকিব, নাসিম ও নিবিড়।
এ বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এ কে এম মঈন উদ্দিন বলেন, "যে আট আসামিকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে চারজনের বিরুদ্ধে ঘটনায় জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি। আর চারজন জড়িত থাকলেও তাদের পূর্ণাঙ্গ নাম ঠিকানা পাওয়া যায়নি।"
পুলিশের দেওয়া এই অভিযোগপত্রে সন্তুষ্ট নয় পারভেজের পরিবার। মামলার বাদী হুমায়ুন কবির বলেন, "অভিযোগপত্রের বিষয়ে আমরা অবগত না। যারা খুনি তাদের অনেককে অভিযোগপত্র থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। মনে হচ্ছে, পুলিশ আসামিদের বাঁচানোর একটা চেষ্টা করছে। অভিযোগপত্রে আমরা সন্তুষ্ট না। এর বিরুদ্ধে আমরা নারাজি দেব।"
যা আছে অভিযোগপত্রে
তদন্ত কর্মকর্তা তার জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলেছেন, ২৪ বছর বয়সী পারভেজের বাবা জসিম উদ্দিন একজন কুয়েত প্রবাসী চাকরিজীবী। পারভেজ ছিলেন মা-বাবার একমাত্র ছেলে। প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটিতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন তিনি।
সে সময় মিডটার্ম পরীক্ষা চলছিল। ২০২৫ সালের ১৯ এপ্রিল মিডটার্ম পরীক্ষা দিতে যান পারভেজ। পরীক্ষা শেষে বিকেল ৩টার দিকে বন্ধু তরিকুল, ইমতিয়াজসহ আরো কয়েকজনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপরীত দিকের ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিলেন এবং হাসাহাসি করছিলেন।
ওই সময় তাদের পিছনে প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটির ছাত্র আবু জহর গিফফারি পিয়াস, তার বান্ধবী ফাতেমা তাহসিন ঐশী এবং তার বান্ধবী ফারিয়া হক টিনাসহ কয়েকজন দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, পিয়াসের দুই বান্ধবী ভেবেছিলেন পারভেজরা তাদেরকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। তখন পিয়াস হাসাহাসির কারণ জানতে চান পারভেজের কাছে। এ নিয়ে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ড হয়।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, পিয়াস ফোনে মেহেরাজকে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসতে বলেন। পরে মেহেরাজ তার সঙ্গে থাকা মাহাথিরকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। মেহেরাজ তার বন্ধু পিয়াসের পক্ষ নিয়ে তর্কাতর্কি শুরু করেন।
এক পর্যায়ে কামাল, জুনায়েদ ও সানিকে ফোন করে লোকজন নিয়ে ইউনিভার্সিটির সামনে আসতে বলেন মাহাথির। মেহেরাজও তার বন্ধু নাসিমকে দ্রুত লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে আসতে বলেন। কামালও ফোন করেন ফাহিমকে, তার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে আসতে বলেন।
ফাহিম তার বন্ধু সাকিবকে নিয়ে ঘটনাস্থলে আসেন। মাহাথিরের ফোন পেয়ে জুনায়েদ, সানি ও রাকিব ঘটনাস্থলে চলে আসেন। আর মেহেরাজের ফোন পেয়ে নাসিম সেখানে আসেন। তারা সবাই মিলে পিয়াসদের পক্ষ নিয়ে হট্টগোলের সৃষ্টি করেন এবং পারভেজকে মারতে উদ্যত হন।
তদন্ত কর্মকর্তা বলছেন, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একজন শিক্ষিকা গণ্ডগোল দেখতে পেয়ে দ্রুত নিচে আসেন। ফোন করে অ্যাসিস্টটেন্ট প্রক্টর হাশেমকে জানালে তিনিও দ্রুত সেখানে আসেন। তারা লোকজনের সহায়তায় পিয়াস, মেহেরাজ, মাহাথির, ঐশী, টিনা এবং পারভেজ ও তরিকুলকে প্রক্টরের রুমে নিয়ে যান। তাদের সকলের পরিচয় ও বক্তব্য শোনেন।
উভয় পক্ষের তর্কাতর্কির মধ্যে শিক্ষক সুষমা সাহা স্বাতীসহ অন্যরা দুই পক্ষকে শান্ত করেন এবং তাদের মধ্যে মিটমাট করে দেন। দুপক্ষ একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলিও করে।
এসময় ঐশী ও টিনাকে নিজের বোন সম্বোধন করে পারভেজ বলেন, ''যদিও আমি কিছু করিনি, তবুও যদি ভুল মনে করে থাক, আমাকে ক্ষমা করে দিও।”
তবে ঘটনা সেখানে শেষ হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রক্টরের রুম থেকে বেরিয়ে মাহাথির, মেহরাজ, পিয়াস, ঐশী ও টিনা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ ও পরিকল্পনা করেন। পরে ৯ আসামিসহ ১১ জন বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে পারভেজের বন্ধু তরিকুল ইসলামকে দেখতে পেয়ে তাকে আটকান।
“নাসিম কাঠের টুকরো দিয়ে তরিকুলকে হত্যার উদ্দেশ্যে মারপিট করে রক্তাক্ত জখম করে। মেহেরাজ, ফাহিমসহ অন্যরাও তার মাথাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কিলঘুষি মারে। একপর্যায়ে তারা পারভেজকে দেখতে পেয়ে তার ওপর চড়াও হয়।
“প্রথমে মেহেরাজ তাকে কিল-ঘুষি ও চর-থাপ্পর মারে। নাসিম কাঠের বাটাম দিয়ে তাকে মারপিট করে। পারভেজ নিজের প্রাণ রক্ষায় দৌড় দিয়ে ইউনিভার্সিটির মূল গেইটের সামনে এলে সাকিব ফুলের টব দিয়ে তাকে আঘাত করে। তাদের মারপিটের পারভেজ পড়ে যায়। পরে আবার উঠে দাঁড়ানো মাত্র রাকিব চাকু দিয়ে পারভেজের বুকের বাম পাশে আঘাত করে রক্তাক্ত জখম করে।"
এ অবস্থায় পারভেজ ইউনিভার্সিটির গেইটের ভেতর ঢুকে পড়েন। তার বুক থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। শিক্ষিকা সুষমা সাহা স্বাতী ওড়না দিয়ে এবং ছাত্রদের শার্ট দিয়ে বেঁধে পারভেজকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানকার কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।