Published : 08 Sep 2025, 08:50 AM
টিএসসি থেকে পলাশী মোড়ে যাওয়ার পথে রিকশা দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার কথা বলছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন। কেবল সড়ক দুর্ঘটনাই নয়, এই ক্যাম্পাসকে কোনো দিক থেকেই নিরাপদ মনে করেন না তিনি।
সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের এ শিক্ষার্থী বলেন, “আমি চাই নিরাপদ ক্যাম্পাস, পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ। হল থেকে বের হলেই মাদকাসক্ত, ভবঘুরেদের দেখি রাস্তায়। তারা নানাভাবে হয়রানি করে। এর থেকে পরিত্রাণ চাই।
“গতকালও (শুক্রবার) আমি পলাশীর মোড়ে যাচ্ছিলাম। অটোরিকশা তো অল্পের জন্য আমার উপর তুলে দেয়নি। এত বেপরোয়াভাবে ক্যাম্পাসে রিকশা চলে। আর একটা ভবন থেকে আরেকটা ভবনে যেতে নেই- কোনো পরিবহন ব্যবস্থা।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ বা ডাকসু নির্বাচন ঘিরে ভোটারদের প্রত্যাশা জানতে গত এক সপ্তাহে শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। তাতে মোটাদাগে পাঁচটি সংকটের কথা তুলে ধরে প্রতিকার চেয়েছেন তারা।
এর মধ্যে আছে- আবাসন সংকট নিরসন, মানসম্মত বা পুষ্টিকর খাবার, নিরাপদ ক্যাম্পাস, গবেষণা ও পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ এবং দলীয় রাজনীতির আধিপত্য বা নিপীড়ন বন্ধ।
কোনো কোনো শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ বিচরণ বন্ধ করার দাবি তুললেও আবার শিক্ষার্থীদেরই কেউ কেউ মনে করছেন ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের প্রবেশ পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়।
তাছাড়া খেলাধুলা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রেখে মেধাকে সম্মান দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অনেকে।
শিক্ষার্থীরা যে কয়েকটি চাওয়ার কথা বলেছেন, তা পূরণের আশ্বাস রয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনি ইশতেহারেও। প্রায় সব প্যানেলের প্রার্থী খাবার ও আবাসন সংকট সমাধান করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি পড়াশোনা ও গবেষণার পরিবেশ তৈরিতেও ভূমিকা রাখবেন বলে ইশতেহারে বলেছেন অনেকে।

কী বলছেন শিক্ষার্থীরা?
শহীদ সার্জেন্ট জহরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ফয়সাল আহমেদ বলছিলেন, “আমি এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। প্রথম বছর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে সবচেয়ে বেশি কষ্ট করছি খাবার এবং থাকার জায়গা নিয়ে। হলে শিক্ষার্থী অনুযায়ী আসন ব্যবস্থা নেই। এজন্য পড়ার পরিবেশেও বিঘ্ন ঘটে।”
মাস্টারদা সূর্য সেন হলের আবাসিক শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগের নেসার উদ্দীন জিহাদের ভাষ্য, “এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য শিক্ষার্থীরা যে স্বপ্ন নিয়ে আসে, তা প্রথম বর্ষেই মিলিয়ে যায়।
“এখানে এসে থাকার জায়গা না পাওয়া, মানসম্মত খাবার না পাওয়া এবং সর্বোপরি পড়ার পরিবেশ না থাকার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যে উচ্চতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকার কথা- তা সম্ভব হয় না।”
অমর একুশে হলের পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাজমুল হুদা নাহিদ। তিনিও আবাসন ও খাবার সংকটকে বড় করে দেখছেন।
নাহিদ বলেন, “থাকা এবং খাওয়া যদি স্বাস্থ্যকর পরিবেশে না হয়, তবে পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ হবে কীভাবে? এজন্য আবাসন সংকট এবং খাওয়ার সমাধান জরুরি।
“একই সাথে ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের নিয়ন্ত্রণও করতে হবে। বাইরের লোকজনের দ্বারা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা উত্ত্যক্তের শিকার হন।”
‘বহিরাগতদের’ প্রবেশ নিষিদ্ধ, নাকি নিয়ন্ত্রণ?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্যাম্পাসকে নিরাপদ মনে করেন না। তাদের অনেকেই মনে করেন, ‘বহিরাগতদের’ অবাধ প্রবেশের কারণে ক্যাম্পাসের পরিবেশ হুমকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে মাদকাসক্তদের অবাধ বিচরণে নারী শিক্ষার্থীরা নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন।
জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরিন বলছিলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, বহিরাগত এবং ভবঘুরেদের কারণে তার কাছে ক্যাম্পাসকে নিরাপদ মনে হয় না।
সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আলাউল হোসেন ফাহিম বলেন, “কিছুদিন আগেই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সাম্য মারা গেল। এর আগে ক্যাম্পাসে গাড়ি দুর্ঘটনায়ও একজন মারা গেছেন।
“বাইরের গাড়ি অবাধে প্রবেশ করছে, বের হচ্ছে। কোথাও কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এজন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে।”
ফলিত রসায়ন বিভাগের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ রিয়াদ ইসলাম ও মোহাম্মদ সাজিব মোল্লা অবশ্য মনে করেন, ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বহিরাগত প্রবেশ নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়।
রিয়াদ বলছিলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একদিকে ঢাকা মেডিকেলের মতো একটা হাসপাতাল আছে। আরও কিছু অন্য প্রতিষ্ঠান আছে। পাশেই পুরান ঢাকার মতো জনবহুল আবাসিক এলাকা।
“ফলে অসংখ্য মানুষ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর দিয়ে প্রয়োজনীয় অনেক কাজেই যাতায়াত করেন। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে বাউন্ডারির ভেতরে আনা কঠিন।”
সাজিব বললেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তো বাংলাদেশের অসংখ্য ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে। এখানে বহিরাগত মানুষ আসবেনই। প্রয়োজন হচ্ছে একটা সুন্দর ব্যবস্থা এবং নিয়ন্ত্রণ।”

সবুজ ক্যাম্পাস, গবেষণার পরিবেশ
শামসুন নাহার হলের গেইটের সামনে কথা হচ্ছিল সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আতিয়া সাবিহার সঙ্গে।
তিনি বলছিলেন, “আমি চাইব, ক্যাম্পাসে যেন আর গাছ কাটা না হয়। আমাদের যতগুলো ভবন আছে, তা এনাফ। আমাদের দরকার- গবেষণাধর্মী পড়ালেখার সুষ্ঠু পরিবেশ। শিক্ষার্থী অনুযায়ী শিক্ষক বাড়ানোও জরুরি।”
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের আবাসিক শিক্ষার্থী আইন বিভাগের রেজোয়ান আহমেদ রিফাত বলেন, “বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হার্ভার্ডে যাচ্ছে পিএইচডি করতে। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ২০ হাজার টাকার একটা চাকরির পেছনে পড়ে আছে।
“আমরা আন্তর্জাতিক পরিসরে নিজেদের মেধার প্রকাশ করতে চাই। এর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে।”
কয়েকটা সমস্যার কথা ধরে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী জাহেদ আহমেদ বলেন, “দলীয় রাজনীতি ক্যাম্পাসে থাকুক, কিন্তু সবকিছুকে দলীয় রাজনীতির মধ্যে নিয়ে আসার যে মনোবৃত্তি- তা থেকে বের হতে হবে।”
খাওয়া, আবাসন, অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক দলীয়করণ থেকে বের হওয়ার কথাও বলেন তিনি।
এই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “সাংস্কৃতিক চর্চাও যখন দলীয় লেজড়বৃত্তির মধ্যে ঢুকে যায়, তখন বুদ্ধিবৃত্তিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি করা হয়। আমরা বুদ্ধিবৃত্তিক উদার চিন্তার পরিবেশ চাই।”

‘ডাকসু যেন প্রতিবছর হয়’
এবারের ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে এক বছরেই সব সমস্যার সমাধান করে ফেলা যাবে, তা মনে করেন না বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। তবে ডাকসু নির্বাচন নিয়মিত হলে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের মোজাম্মেল হক।
এই শিক্ষার্থীর ভাষ্য, “ডাকসু এক বছরেই অনেক কিছুর সমাধান করে ফেলবে- তা আশা করি না। তবে ডাকসু প্রতিবছর যেন হয়। তাতে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি হবে। এই পরিবেশটা হলেই অনেক সমস্যার সমাধানও হবে।”
শামসুন্নাহার হলের আবাসিক শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের সৈয়দা আফ্রিদা জাহান বলেন, “আমি চাই ডাকসু প্রতি বছর হোক। একবারেই সব সমস্যার সমাধান হবে না। তবে সমাধানের পথ খুলবে।
“ডাকসু নিয়মিত হলে শিক্ষার্থীদের কথা বলার জায়গা তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একচ্ছত্র আধিপত্য, দলীয় রাজনীতির লেজড়বৃত্তিও কমবে।”
ডাকসু নির্বাচনে বিজয়ীরা যার যা কাজ, তা ঠিকমতো করবেন বলে প্রত্যাশী জিয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী রিদোয়ান ইসলাম রানা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এ ছাত্র বলেন, “আমি চাইব, শিক্ষার্থীরা সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করবে এবং না বুঝে সবকিছুতে বিশ্ববিদ্যালয়কে দায়মুক্তি দেবে না।”
ডাকসু যেন অ্যাকাডেমিক ক্যালেন্ডারে থাকে এবং প্রতি বছরই যেন সেই সংসদ নির্বাচন হয় তা প্রত্যাশা করেন রানা।
তিনি বলেন, “ডাকসু হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। শিক্ষার্থীরা কথার বলার জায়গা পাবে।
“যারা শিক্ষার্থীদের চাওয়া বুঝতে পারবে না। তাদেরকে শিক্ষার্থীরা প্রত্যাখ্যান করবে।”
দীর্ঘদিনে যতো সংকট তৈরি হয়েছে তার সমাধানে নিয়মিত ডাকসু নির্বাচন হওয়া দরকার বলে মনে করেন ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ইমরান হুসাইন।
তিনি বলেন, “অতিরিক্ত যানবাহনের সমস্যা, খাবার, আবাসন, গবেষণার সংকট- এক বছরেই সমাধান করা কঠিন। তবে ডাকসু নিয়মিত হলে সেই পথে হাঁটা শুরু হবে। ধারাবাহিকভাবে সমস্যার সমাধানও হবে।”
বিজয় একাত্তর হলের আবাসিক শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ইমরান হোসেন বলেন, “আমি চাই- স্টাবলিশমেন্টের দাসত্ব থেকে মুক্তি, পড়ালেখার পরিবেশ।
“আমাদের ক্যাম্পাসে পড়ার পরিবেশটা নাই। যেই নির্বাচিত হয়, ক্যাম্পাসে যেন পড়ার পরিবেশটা তৈরি হয়।”
তবে সংকট সমাধানে শিক্ষার্থীদের সচেতন হওয়াও যে গুরুত্বপূর্ণ তা মনে করিয়ে দেন ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সাজ্জাদ হোসেন।
বিজয় একাত্তর হলের এ আবাসিক শিক্ষার্থী বলেন, “আমি চাই, রাজনীতি সচেতন বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীরা তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন হবে- এটাই চাওয়া।
“তারা নিজেদের অধিকার সচেতন হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হবে।”

ভোট কাকে দেবেন?
ডাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীরা কাকে ভোট দেবেন, তা আগ মুহূর্তেও বোঝা কঠিন। শতাধিক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলার সময় বেশিরভাগই বলেছেন, তারা এখনো ঠিক করেননি- কাকে ভোট দেবেন।
জগন্নাথ হলের সামনে দাঁড়িয়েছিলেন ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের দুই ছাত্রী।
তাদের একজন ফারিয়া ইসলাম বলেন, “আমি ডাকসু নির্বাচন নিয়ে খুবই এক্সাইটেড। ৪১টা ভোট দেব- এটা ভাবতেই ভালো লাগছে।”
তবে ফারিয়া ইসলামের মতো ‘এক্সাইটেড’ নন ফারিহা রহমান শশী।
তিনি বলেন, “ডাকসু নির্বাচন নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ কাজ করছে না। ৪১টা ভোট দিতে হবে, এটা নিয়ে চিন্তায় আছি। কীভাবে ভোট দেব, তা জানতে হবে।”
কেন আগ্রহ কাজ করছে না, জানতে চাইলে শশী বলেন, “আমার ফ্রেন্ডরা খুবই উৎসাহী। আমার মধ্যে উৎসাহ কাজ করছে না। ভোটের আগের দিন ঠিক করব- কাকে ভোট দেব। তবে দলীয় রাজনীতির কাউকে ভোট দেব না। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোট দেব।”
ক্যাম্পাসে কী ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন, এই প্রশ্নে ফারিয়া ও শশী দুজনই বলছিলেন, “খাবারই বড় সমস্যা। ক্যাম্পাসে খিচুড়ি ছাড়া কোনো খাবারই পাওয়া যায় না।”