প্রধানমন্ত্রী পুরস্কার পেলেন, পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি এল না: মেনন
মেনন বলেন, পাহাড়িরা ‘অনিরাপদ করে রেখেছে’– এ জন্য পাহাড়ে যেতে নিষেধ করা হয়নি। বরং সেখানে জঙ্গিগোষ্ঠী ট্রেইনিং ক্যাম্প তৈরি করেছে। এরা দেশের অভ্যন্তরে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
পার্বত্য চুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী ‘শান্তি পুরস্কার’ পেলেও সেখানে এখনও ‘শান্তি ফেরেনি’ বলে মন্তব্য করেছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন।
শান্তি চুক্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার শাহবাগে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটি' আয়োজিত এক সমাবেশে তিনি এ কথা বলেন।
মেনন বলেন, পাহাড়িরা ‘অনিরাপদ করে রেখেছে’– এ জন্য পাহাড়ে যেতে নিষেধ করা হয়নি। বরং সেখানে জঙ্গিগোষ্ঠী ট্রেইনিং ক্যাম্প তৈরি করেছে। এরা দেশের অভ্যন্তরে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি, উন্নয়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
তিনি বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে এটি হবে উপজাতি অঞ্চল এবং এ অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য রক্ষা করা হবে। কিন্তু ইতোমধ্যে সেখানে ডেমোগ্রাফি পাল্টে বাঙালি সংখ্যাধিক্য জনগোষ্ঠীতে পরিণত হওয়ার পর্যায়ে চলে গেছে।”
বাঙালিদের সমতলে ফিরিয়ে আনার কথা থাকলেও তা হয়নি জানিয়ে সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, “হয়নি কেবল নয়, যে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল, এর ফলে ওই পার্বত্যবাসীরা এখন ক্রমাগত সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছে।
“এই শান্তি চুক্তির জন্য আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজেই ইউনেস্কো শান্তি পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে শান্তি নাই।”
সমাবেশে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, যে সরকার চুক্তি করেছিল সেই সরকারের আমলে পার্বত্য চুক্তির ২৫ বছর পরও এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের জন্য রাজপথে দাঁড়ানো কাম্য ছিল না।
“স্বাধীনতার মাধ্যমে ১৯৭২ সালে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, সেই সংবিধানে আদিবাসীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয় নাই। এই সময়ে এসে আদিবাসীদের পরিচয়কে অস্বীকৃতির মাধ্যমে চুক্তি বাস্তবায়নের প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা দেখানো হচ্ছে বলে আমি মনে করি।”
আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ককাস- এর আহ্বায়ক ও ওয়ার্কাস পার্টির সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, সংবিধানে আদিবাসী শব্দটা নেই। কিন্তু পার্লামেন্টে রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে আদিবাসী বিষয়ক সংসদীয় ‘ককাস’ তৈরি করা হয়েছিল।
“সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা ছিলেন। আমরা সংখ্যায় ছিলাম কম। কিন্তু আমাদের দাবিটা ছিল শক্তিশালী। পাহাড়ী জনগোষ্ঠীর বাইরের জনগোষ্ঠীকে পাহাড়ে বসতি দিয়ে পাহাড়ীদের ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠীর করার প্রয়াস, আর অন্যদিকে শান্তিচুক্তি করা- এটি এক ধরনের দ্বিচারিতা।”
জনসংহতি সমিতির সিনিয়র সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার বলেন, ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনা হয়েছে। কিন্তু এ বিজয়ের রঙ গুটিকয়েক মানুষের মাঝে পৌঁছলেও সাধারণ খেটে-খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী মানুষের মাঝে পৌঁছায়নি।
“পার্বত্য চট্টগ্রামে একটি শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি রয়েছে। এখনও উপনিবেশিক কায়দায় শাসন-শোষণ, নিপীড়ন অব্যাহত আছে। ২৫ বছর পরেও পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় এখনও সেখানে মানুষের নিরাপত্তাহীনতায় বসবাস করতে হয়।”
এ সময় পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়কে ‘রাজনৈতিক দলের মধ্যে’ না রেখে তা মানুষের কাছে উত্থাপন করে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন তিনি।
সুচনা বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও চুক্তি বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক খায়রুজ্জামান পাঁচ দফা দাবি উত্থাপন করেন।
সেগুলো হলো-
· পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের জন্য সময়সূচি ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করে চুক্তি দ্রুত ও যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
· পাহাড়ে সামরিক কর্তৃত্ব ও পরোক্ষ সামরিক শাসন স্থায়ী অবসান করতে হবে।
· আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক করা এবং শাসন নিশ্চিত করতে পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক এসব পরিষদের যথাযথ ক্ষমতায়ন করতে হবে।
· পার্বত্য ভূমি সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য পার্বত্য ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনকে কার্যকরের মাধ্যমে অভ্যান্তরীণ উদ্বাস্তু ও ভারত প্রত্যাগত জুম্ম শরণার্থীদের পুনর্বাসন করে তাদের ভূমির অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
· দেশের মূল স্রোতধারার অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও স্থায়িত্বশীল উন্নয়নে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান, বাসদ সহ-সাধরণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সদস্য ড. গন্ধরাজ মাহাত, বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের নির্বাহী পরিচালক রুপা কবির, আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অলিক মৃ, ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক দীপক শীল বক্তব্য দেন।
