পূজার আগে শাঁখার খোঁজে শাঁখারী বাজারে

পূজার আগে ও পূজার সময় নতুন শাঁখা কিনতেই মূলত ভিড় জমে পুরান ঢাকার এই বাজারে।

নিজস্ব প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 1 Oct 2022, 02:35 PM
Updated : 1 Oct 2022, 02:35 PM

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গা পূজা উপলক্ষে পুরান ঢাকার শাঁখারী বাজারে শাঁখা-শঙ্খের নানা নিদর্শনে সাজানো অলিগলিতে এখন ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়।

শনিবার দুর্গাপূজার প্রথম দিন সেখানে গিয়ে দেখা যায়, একেক দোকানে একেক রকমের পণ্য সাজানো। বিশেষ করে দুর্গোৎসবকে রঙিন করার নানা উপকরণ বিক্রি হচ্ছে।

পূজা-অর্চনার সব উপকরণই মেলে ঐতিহ্যবাহী এ স্থানে। এসব উপকরণ কিনতে দূরদূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ক্রেতারা। এর সঙ্গে শাঁখা কেনার ভিড়ই তুলনামূলক বেশি।

প্রতিমার সাজ-পোশাক মাথার মুকুট জরি মতি চুমকি সহ নানান পণ্য। আছে মণ্ডপ ও তোরণ সাজানোর উপকরণ। মৃৎশিল্প, কাঁসা পিতল শিল্প, শোলা শিল্প সামগ্রীর আলাদা আলাদা দোকান আছে। তবে বিশেষ কৌতূহল শঙ্খশিল্প ঘিরেই।

দোকানের গ্লাস শোকেসে শাঁখা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। বিবাহিত নারীরা পূজার আগে নতুন শাঁখা কিনতে আসছেন। দোকানিরা কাঠের চৌকির ওপর কারুকাজ করা শাঁখা মেলে ধরছেন। কোথাও কোথাও হাতে পরিয়ে দিতেও দেখা যায়।

পূজার জন্য প্রায় ১০০ উপকরণের প্রয়োজন হয়।দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখান থেকেই এসব উপকরণ সংগ্রহ করেন।

পূজা উপলক্ষে ঢাকার আশপাশের বিক্রেতারাও বিভিন্ন জিনিস পাইকারি দরে কিনছেন। এ ছাড়া সনাতন ধর্মাবলম্বীরা তাদের পুরো পরিবারসহ ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে এসে কেনাকাটা করছেন।

Also Read: ঢাকার শঙ্খশিল্পের মৃত্যু অবধারিত?

নারায়ণগঞ্জ থেকে শাঁখা কিনতে আসেন অনুরাধা সাহা।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “পূজার সব উপকরণ অন্যরাই নিয়েছে, আমি আসছি শাঁখা কিনতে। এখানে তুলনামূলক ভালো শাঁখা পাওয়া যায়, দামেও একটু কম। তাই দুজনের জন্য চার জোরা নিয়ে নিলাম।”

মোহাম্মদপুর থেকে পরিবারসহ কেনাকাটা করতে আসা চিত্ত রঞ্জন দাস বলেন, “পূজার মুকুট, পূজার শাড়ি, পূজার গয়না, পূজার চুড়া, শাড়ি-সুড়ি এইগুলা সবই কিনতেছি। আমি এখান থেকেই পূজার সামগ্রী কেনাকাটা করি।”

ঢাকার বসুন্ধরা শপিংমলের ব্যবসায়ী ভোলার অসীম কুমার বাড়ি যাওয়ার আগে শাঁখারীবাজারে আসেন পরিবারের জন্য কেনাকাটা করতে।

তিনি বলেন, “দুর্গাপূজায় কিছু উপকরণ অতি প্রয়োজনীয়, তাছাড়া বাড়ি যাচ্ছি এখান থেকে কিছু কেনাকাটা করে নিচ্ছি, বিশেষ করে শাঁখা, সিঁদুর ও আলতা নিচ্ছি।”

লক্ষ্মী ভাণ্ডার নামে একটি দোকানের মালিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “৬০-৭০ বছরের পুরনো আমাদের দোকান। এখানে শঙ্খ এবং শাঁখা বিক্রি করা হয়। আমাদের দোকান ছোট্ট হলেও নারীদের মোটামুটি ভিড়ই থাকে। শাঁখা দেখিয়ে শেষ করতে পারি না।”

স্বামীকে নিয়ে শাঁখা কিনতে এসেছেন জানিয়ে শান্তা রানী কর্মকার বলেন, “শাঁখারও ভাল-মন্দ আছে। আসলটা দেখে কিনতে হয়। এখানকার দোকানগুলো অনেক পুরনো। আসলটা পাওয়া যায় কিনা, দেখছি।”

ভোলানাথ ভাণ্ডার দোকানের মালিক অমিয় কুমার সুর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বহু টানাপোড়েনের মধ্যেও শাঁখা শিল্পের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। সারা বছর মোটামুটি বিক্রি হয়। এখন দুর্গাপূজা সামনে রেখে বিক্রি বেড়েছে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দোকানেই ব্যস্ত থাকি।”

শাঁখা কিনতে প্রচুর ভিড় দেখা যায় ‘মা মনসা শঙ্খ শিল্পালয়ে’। একসঙ্গে কয়েকজন নারী এখানে বসে শাঁখা পছন্দ করছিলেন। খিলগাঁও থেকে শাঁখা কিনতে এসেছিলেন অর্পনা অপু।

আগে থেকেই হাতে শাখা পরা অপর্ণা বলেন, “পূজার আগে নতুন শাঁখা কেনা অনেকটা রীতি হয়ে গেছে। তাই কিনতে আসা। শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের অন্যদের জন্যও নিবো।”

‘মা তারা শঙ্খ বিতান’ দোকানের মালিক অমৃত পাল জানান, “পূজার সময় মাঙ্গলিক ধ্বনি তুলতে শঙ্খের প্রয়োজন হয়। তাই এখন চাহিদাও বেশি।”

বিপিন চক্রবর্তীর নামে আরেক ক্রেতা বলেন, “ফরিদপুর থেকে শঙ্খ কিনতে এখানে এসেছি। শাঁখারী বাজার তো ঐতিহ্যের অংশ। পূজার অন্য কেনাকাটা যেকোনো জায়গা থেকে সেরে ফেলা যায়। কিন্তু শঙ্খ বা শাঁখা কিনতে হলে আমরা শাঁখারী বাজারেই আসি। এটা বহু বছরের অভ্যাস।”

‘সাজ ঘর’ নামের দোকানের অজিত মণ্ডল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত কয়েক বছর করোনাভাইরাসের জন্য বেচাকেনা তেমন ভালো হয়নি। এ বছর অনেকটা পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি। জিনিসপত্র এর যা দাম! তবে ব্যবসা ভালই হচ্ছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক