১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

এলএনজি টার্মিনাল: স্বচ্ছতা চায় যুক্তরাষ্ট্র, মার্কিন কোম্পানিকে ‘সর্বোচ্চ গুরুত্বের’ আশ্বাস বাণিজ্যমন্ত্রীর

মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে ‘অত্যন্ত আগ্রহী’ বলে দাবি রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেনের।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Sep 2026, 08:31 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:56 AM

দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে সরকারের তরফে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনে অগ্রাধিকার দেওয়ার আলোচনার মধ্যে এ ক্ষেত্রে ‘স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক’ পরিবেশ ধরে রাখার বার্তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এফএসআরইউ স্থাপনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক হলে, তাতে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হওয়ার পাশাপাশি মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে ‘অত্যন্ত আগ্রহী’ হবে বলেও ভাষ্য ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেনের।

এ দাবির প্রেক্ষিতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, “দ্রুততম সময়ে এফএসআরইউ নির্মানের সক্ষমতা দেখাতে পারলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। স্বল্প সময়ে কার্যকর এলএনজি সরবরাহ পরিকল্পনা উপস্থাপন, তাদের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।”

রাজধানীতে ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই কার্যালয়ে সোমবার বাণিজ্যমন্ত্রী আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেন ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন। সেখানে তাদের মধ্যে এফএসআরইউ বিষয়ে এসব কথা হয় বলে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। 

বৈঠকে ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেন, “বড় অবকাঠামো নির্মান উদ্যোগে একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা গেলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।”

মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে ‘অত্যন্ত আগ্রহী’ দাবি করে তিনি উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। 

সমুদ্রপথে আনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি গ্রহণ ও সংরক্ষণ করা হয় ভাসমান টার্মিনাল বা এফএসআরইউতে। সেখানে এলএনজিকে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে পাঠানো হয়।

দেশে বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি এক্সিলারেট এনার্জির, আরেকটি সামিট এলএনজি টার্মিনালের। তাদের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা যথাক্রমে ৬০০ ও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে দিনে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করা হয়।

এর মধ্যে দেশীয় ক্ষেত্র থেকে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যায়। আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।

ফলে কোনো এফএসআরইউ বন্ধ বা বিকল হলে দেশের সার্বিক গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়ে। 

সবশেষ গত ২১ জুলাই এক্সিলারেটের টার্মিনালের বৈদ্যুতিক ক্যাবলে আগুন লেগে ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।

দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর ৬ অগাস্ট টার্মিনালটি আংশিক চালু হয়। পরে কারিগরি সমস্যা ও কার্গোর স্বল্পতায় সেখানকার সরবরাহ কয়েক দফা ওঠানামা করে।

এরজন্য বাসাবাড়ির গ্যাস সরবরাহসহ শিল্পে গ্যাস সরবরাহ করা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। এ সংকট কাটাতে সরকার ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনার কথা বলেছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলছেন, “এর জন্য পায়রা, মোংলা ও হিরনপয়েন্টে টার্মিনাল বসানোর সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। এ জন্য বিনিয়োগকারীও খোঁজা হচ্ছে।”

এরমধ্যে খবর প্রকাশ হয়েছে, সরকার তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে দিতে যাচ্ছে। তবে এরজন্য বর্তমানে গ্যাস নিতে যে ব্যয় হচ্ছে, তার চেয়ে ৩৫-৩৭ শতাংশ বেশি দিতে হবে।

গত ১৯ জুন চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি (সিএনইই) মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি অফশোর এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। যেখানে রিগ্যাসিফিকেশন (অত্যন্ত ঠান্ডায় এলএনজিকে আবার তাপ দিয়ে গ্যাসে রূপান্তরের প্রক্রিয়া) সক্ষমতা ধরা হয়েছে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট এবং সর্বোচ্চ সক্ষমতা ৭৫০ ঘনফুট।

খবর অনুযায়ী, ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় এফএসআরইউ নির্মানের জন্য সিএনইই প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার নেবে। বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির এফএসআরইউ বাবদ দৈনিক ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার খরচ হয় সরকারের।

এদিকে বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের আমদানি নীতি প্রসঙ্গে রাষ্ট্রদূত বলেন, “নতুন নীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, যা প্রশংসনীয়। তবে কিছু ধারা আরও ব্যবসাবান্ধব করা সম্ভব।”

জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “আমদানি নীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাজার ও অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।”

জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে রাষ্ট্রদূত ক্রিস্টেনসেন আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘গানভর’-এর সঙ্গে চুক্তিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন। 

বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, “সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে। ভবিষ্যতেও তা বজায় থাকবে।”

বৈঠকে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মুস্তাফিজুর রহমান এবং মার্কিন দূতাবাসের ইকোনমিক চিফ অ্যাঞ্জেলো পালাজ্জেলো উপস্থিত ছিলেন।