Published : 02 May 2026, 03:34 PM
আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে হাইব্রিড, প্লাগ ইন হাইব্রিড ও জাপানের রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানিতে শুল্ক কমানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ রিকন্ডিশন্ড ভেহিক্যালস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশন, বারভিডা।
একই সঙ্গে গণপরিবহন হিসেবে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসের সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহার, পিকআপে শুল্ক কমানো, নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্কায়ন বৈষম্য দূর করা এবং আমদানিযোগ্য গাড়ির বয়সসীমা ৫ বছর থেকে ৮ বছরে উন্নীত করার দাবি তুলেছে সংগঠনটি।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট সামনে রেখে শনিবার ঢাকায় বারভিডার সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি আবদুল হক।
বারভিডার দাবি, রিকন্ডিশন্ড মোটরযান আমদানি ও বিপণন খাতে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার স্থানীয় বিনিয়োগ রয়েছে। সদস্য প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব দেয়। ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজসহ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানও হয়েছে এ খাতকে ঘিরে।
সংগঠনের লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, আমদানি শুল্ক, আয়কর, ভ্যাট ও ‘রোড ট্যাক্স’ দেওয়ার মাধ্যমে তারা কর-জিডিপি অনুপাত বৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে। এ ব্যবসাকে ভিত্তি করে ব্যাংক, লিজিং কোম্পানি ও বীমা কোম্পানির কার্যক্রমও সম্প্রসারিত হয়েছে।
‘বাজার সংকুচিত, কমেছে বিক্রি’
ঢাকার বিজয়নগরের আকরাম টাওয়ারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরে বারভিডা বলেছে, অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক নানা কারণে দেশের অর্থনীতি এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। বৈদেশিক মুদ্রার স্বল্পতা, বিনিময় হার বৃদ্ধি এবং উৎপাদনকারী দেশে গাড়ির মূল্য বাড়ার প্রভাব পড়েছে এই খাতে।
সংগঠনটির মতে, ২০২৪ সালের অগাস্টের পর দেশের সার্বিক পরিস্থিতিতে গাড়ি বিক্রি অনেক কমে যায়, সেই স্থবিরতা এখনও কাটেনি।
বারভিডা বলছে, “দেশের উন্নয়নের সাথে সাথে মোটরযানের বাজার সম্প্রসারণের কথা থাকলেও বাস্তবে সংকুচিত হয়েছে, যা আশংকাজনক। দেশের মোটরযান খাত একটি অর্থনৈতিক নির্দেশক। মোটরযান বিক্রি কমে যাওয়া মানে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।”
সংগঠনটি জানায় ২০২৪ সালের পর বৈদেশিক মুদ্রার সংকট কিছুটা কমলেও শুল্ক ও কর হার অপরিবর্তিত থাকার মধ্যে ‘টাকার অবমূল্যায়নের’ কারণে আমদানিকৃত গাড়ির দাম বেড়েছে। এতে অধিকাংশ ক্রেতার নাগালের বাইরে চলে গেছে গাড়ি, কমেছে বিক্রিও।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাপান থেকে বাংলাদেশে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। কেনিয়া, শ্রীলংকা ও তানজানিয়ার চেয়েও বাংলাদেশে ‘কম’ গাড়ি আমদানি হয়েছে বলে দাবি তাদের।
বিআরটিএর তথ্য তুলে ধরে বারভিডা জানায়, ২০১৫ সালে ২১ হাজার ৯৫২টি, ২০১৬ সালে ২১ হাজার ২৯টি এবং ২০১৭ সালে ২০ হাজার ২৬৮টি গাড়ি নিবন্ধিত হলেও ২০২৩ সালে তা কমে ১০ হাজার ৭৮৪টিতে নামে। ২০২৪ সালে নিবন্ধন হয় ১০ হাজার ৪৯৯টি, আর ২০২৫ সালে তা নেমে আসে ৯ হাজার ৩৮৭টিতে।
বারভিডার মতে, আমদানি ও বিক্রি কমে যাওয়ায় এই খাতের অনেক ব্যবসায়ী ক্রমাগত লোকসানের কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন। এতে খাতসংশ্লিষ্ট প্রায় ৩ লাখ মানুষের জীবিকাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বারভিডার যত দাবি
আসন্ন বাজেটকে একটি ‘ব্যবসাবান্ধব ও অর্থনৈতিক গতিশীলতা ফিরিয়ে আনার’ বাজেট হিসেবে দেখতে চায় বারভিডা।
সংগঠনটি বলছে, তাদের প্রস্তাবে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী বাহন ব্যবহারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রথম দাবিতে তারা বলছে, হাইব্রিড ও প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ির শুল্ক কমাতে হবে।
তাদের বক্তব্য, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর গাড়ি থেকে বিশ্ব ক্রমেই হাইব্রিডের দিকে যাচ্ছে। জ্বালানি সাশ্রয়, সহজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং নিরাপত্তার কারণে ১৮০০ সিসি পর্যন্ত হাইব্রিড ও প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ির চাহিদা বেড়েছে।
বারভিডা বলছে, “চার্জিং স্টেশন ছাড়াই বাসায় এসব গাড়ি চার্জ দেওয়া যায় বলে আলাদা অবকাঠামো তৈরির ব্যয়ও কম।”
তাদের ভাষায়, “দেশে জ্বালানি সংকট এবং জ্বালানি ব্যবহারে সরকারের সাম্প্রতিক সংযমী নির্দেশনার প্রেক্ষিতে আমরা জনবান্ধব রাজস্ব নীতি গ্রহণপূর্বক জ্বালানি সাশ্রয়ী ও পরিবেশ বান্ধব হাইব্রিড ও প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ি আমদানিতে কর হ্রাসের অনুরোধ জানাচ্ছি।”
মাইক্রোবাসকে গণপরিবহন হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক কমানো হলেও সম্পূরক শুল্ক বেশি থাকায় আমদানিকৃত মাইক্রোবাসের দাম এখনও অনেক বেশি পড়ে যাচ্ছে বলে দাবি বারভিডার।
তাদের মতে, ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ শিল্পে কর্মী পরিবহন, শিক্ষার্থী পরিবহন, পর্যটন, ব্যক্তিগত ব্যবহার, বিমানবন্দরে যাতায়াত এবং অ্যাম্বুলেন্স হিসেবে মাইক্রোবাসের গুরুত্ব অনেক।
সংগঠনটি বলছে, দেশে ব্যবহৃত মাইক্রোবাসের ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশই সিএনজি বা এলপিজিতে রূপান্তরিত হয়ে পরিবেশবান্ধবভাবে চলছে।
উচ্চ দামের কারণে সম্ভাব্য ক্রেতারা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন দাবি করে বারভিডা বলছে, মাইক্রোবাসের বিক্রি কমছে, সরকারও রাজস্ব হারাচ্ছে। তাই তারা মাইক্রোবাস আমদানির ক্ষেত্রে সম্পূরক শুল্ক প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, কৃষি, পোল্ট্রি ও ডেইরি খাতে পণ্য পরিবহনে মানসম্পন্ন পিকআপের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে বারভিডা বলছে, উচ্চ শুল্ক ও করের কারণে জাপানের মানসম্পন্ন পিকআপ কম আমদানি হচ্ছে, উল্টো নিম্নমানের ও চলাচলে অনুপযুক্ত পিকআপ বাজারে ঢুকছে।
তাদের দাবি, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের কাছে স্বল্পমূল্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে পিকআপ আমদানির শুল্কহার সর্বনিম্ন স্তরে নির্ধারণ করা হোক।
বর্তমান আমদানি নীতি আদেশ ২০২১-২০২৪ অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ বছরের পুরনো কার, জিপ ও বাণিজ্যিক যানবাহন আমদানির সুযোগ আছে। এই সীমা বাড়িয়ে ৮ বছর করার দাবি জানিয়ে আসছে বারভিডা।
সংগঠনটি বলছে, বিশ্বব্যাপী মানসম্পন্ন জাপানি গাড়ির চাহিদা থাকলেও বিভিন্ন দেশে আমদানির বয়সসীমা ভিন্ন। তাদের উপস্থাপনায় বলা হয়, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও থাইল্যান্ডে কোনো বয়সসীমা নেই। পাকিস্তানে ২০২৬ সালের পর বয়সসীমা থাকবে না। নিউজিল্যান্ডে ৮ বছর, কানাডায় ১৫ বছর, হংকংয়ে ৭ বছর।
বারভিডার দাবি, তারা যে জাপানি হোম মডেলের গাড়ি আমদানি করে, সেগুলো বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তির বাহন। পরিবেশ সুরক্ষায় এসব গাড়িতে ‘ক্যাটালিটিক কনভার্টার’ থাকে এবং ইউরো ৪ ও ইউরো ৫ মান অনুযায়ী কার্বন নিঃসরণ করে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “আমরা বিগত কয়েক বছর ধরেই সরকারকে বর্তমান আমদানি নীতিমালা সংশোধন করে ৫ বছরের পরিবর্তে আমদানিযোগ্য গাড়ির বয়স ৮ বছরে উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছি।”
সংগঠনটির মতে, বয়সসীমা বাড়ানো হলে বৈদেশিক মুদ্রা ‘সাশ্রয়’ হবে, বাজারে গাড়ির দাম কমবে, শুল্ক-কর ও ভ্যাট বাবদ সরকারের ‘আয় বাড়বে’, নতুন ‘বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের’ সুযোগও তৈরি হবে।
ইভি অবকাঠামোতে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান
দেশে ইলেকট্রিক গাড়ির বিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে তুলে ধরে বারভিডা বলছে, সরকার ‘ইলেকট্রিক ভেইকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৫’ করেছে এবং এ খাতে কর ছাড় ও প্রণোদনাও দিয়েছে।
তবে সংগঠনটির মতে, পর্যাপ্ত চার্জিং অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বৃষ্টিজনিত জলাবদ্ধতায় চলাচল সক্ষমতা এবং সার্ভিসিং নেটওয়ার্কের মতো বিষয়গুলো এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার।
দেশে ইলেকট্রিক গাড়ির ব্যবহার বাড়ানোর আগে এসব বিষয় ধাপে ধাপে কার্যকর করতে হবে, বলছে সংগঠনটি।
একই সঙ্গে তারা বলছে, হাইব্রিড ও প্লাগ ইন হাইব্রিড গাড়ি যেহেতু ইলেকট্রিক গাড়ির সমবৈশিষ্ট্যসম্পন্ন, তাই ইভির জন্য দেওয়া সুবিধা ও প্রণোদনার প্রেক্ষাপটে এসব গাড়ি এবং জাপানের রিকন্ডিশন্ড ইভি আমদানিতেও শুল্ক-কর হ্রাস করা উচিত।
‘সমন্বিত মোটরযান উন্নয়ন নীতিমালা’ দাবি
দেশে গাড়ি তৈরির লক্ষ্যে ‘অটোমোবাইল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২১’ এবং ‘ইলেকট্রিক ভেহিকেল শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা ২০২৫’ প্রণয়নকে স্বাগত জানিয়েছে বারভিডা।
তবে তাদের মতে, রিকন্ডিশন্ড মোটরযান খাতে স্থানীয় বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং মানসম্পন্ন জাপানি গাড়ির চাহিদা বিবেচনায় রেখে একটি ‘সমন্বিত মোটরযান উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রয়োজন।
জাইকার বরাত দিয়ে সংগঠনটি বলছে, দেশে নতুন গাড়ি শিল্প প্রতিষ্ঠা যুক্তিযুক্ত হতে হলে অভ্যন্তরীণ বাজার ১ লাখ ইউনিট হতে হবে। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশের গাড়ির বাজার বছরে ২৫ থেকে ৩০ হাজার ইউনিট।
এ অবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি ‘মাস্টারপ্ল্যান’ করে এগোনোর পরামর্শ দিয়েছে বারভিডা।
শুল্কায়নে বৈষম্যের অভিযোগ
নতুন ও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির শুল্কায়ন মূল্যে বৈষম্যের অভিযোগও তুলেছে বারভিডা।
তাদের দাবি, শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় ‘অসামঞ্জস্যতা ও দুর্বলতার’ কারণে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, আবার রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীরাও ‘অসম’ প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছেন।
সংগঠনটির লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, “রিকন্ডিশন্ড মোটরযান আমদানির ক্ষেত্রে আমরা ন্যূনতম ১২৯% এবং সর্বোচ্চ ৮২৬% পর্যন্ত শুল্ক প্রদান করছি।”
তাদের দাবি, এই বৈষম্যের কারণে কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন গাড়ির চেয়েও রিকন্ডিশন্ড গাড়ির দাম বেশি পড়ে যাচ্ছে।
বারভিডা চায়, মোটরযান আমদানির জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কর কাঠামো নির্ধারণ করা হোক, যাতে বিনিয়োগকারীরা নিশ্চিন্তে পরিকল্পনা করতে পারেন এবং গ্রাহকদের অনিশ্চয়তাও কমে।
ভ্যাট প্রক্রিয়াতেও জটিলতার অভিযোগ করে সংগঠনটি এনবিআরকে জরুরি ভিত্তিতে বিষয়গুলো পর্যালোচনা ও সমাধানের অনুরোধ জানিয়েছে।