Published : 31 Mar 2026, 01:31 AM
বেক্সিমকো গ্রুপের সুকুক বন্ডে ‘বাধ্য হয়ে’ বিনিয়োগ করা তিন হাজার কোটি টাকা লগ্নিকারীরা ফেরত পাবে কি না, সেই শঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আগামী ডিসেম্বরে এ বন্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এর আগে বিনিয়োগের অর্থ ফিরে না পেলে গ্রাহকের অর্থ পরিশোধ করতে গিয়ে বাড়তি আমানত সংগ্রহের চাপে পড়তে হতে পারে ব্যাংকগুলোকে।
এমন প্রেক্ষাপটে বিনিয়োগ বাঁচাতে দুটি ‘পরামর্শ’ বিবেচনার কথা বলছেন ব্যাংক খাতের বিশ্লেষকরা। একটি হল- বন্ডের মেয়াদ বাড়ানো; আরেকটি, বিনিয়োগের টাকায় বানানো তিস্তা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বিক্রি করে দেওয়া।
বিনিয়োগ ফেরত দেওয়ার ক্ষেত্রে ‘সিংকিং ফান্ডও’ বিবেচনায় থাকার কথা বলছেন তারা। যদিও এ তহবিল থেকে বিনিয়োগের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়।
‘বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইসতিসনা’ ছিল বেসরকারিভাবে ছাড়া দেশের প্রথম সুকুক বন্ড।
এ বন্ডের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করতে শুরুর দিকে কয়েকবার সময় বাড়িয়েও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পায়নি বেক্সিমকো গ্রুপ। তখন বন্ডে বিনিয়োগ করতে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা–বিএসইসি নির্দেশ দিলে ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট ব্যাংক মিলে ১৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে।
অন্যদিকে সুকুক বন্ডের বিনিয়োগ ‘পুঁজিবাজার এক্সপোজারের’ বাইরে রাখার সুযোগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কাগুজে এ সুবিধা দিয়ে সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করতে ‘বাধ্য করা হয়’ ব্যাংকগুলোকে।
এখন বিনিয়োগ করে সবচেয়ে বেশি হতাশায় ভুগছে সুকুক বন্ডে ৭৫ শতাংশ অর্থের যোগান দেওয়া ২৭টি ব্যাংক বলে কর্মকর্তারা বলছেন।
চাপ ছিল দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থার
বন্ড মার্কেট সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ২০২১ সালে বাজারে আনা হয় দেশের প্রথম বেসরকারি শরীয়াহ সুকুক বন্ড। পাশাপাশি আরও কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি ও ১১ ব্যাংকের পাপের্চুয়াল বন্ডের অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু করে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা–বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জে কমিশন (বিএসইসি)।
একই বছর ‘বেক্সিমকো গ্রিন সুকুক আল ইসতিসনা’ এর অনুমোদন দেওয়া হয় তিন হাজার কোটি টাকার মূলধন সংগ্রহ করতে।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ এই বন্ডের উদ্যোক্তা। এটির ট্রাস্টি করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশকে (আইসিবি)।
ইস্যু উপদেষ্টা ও ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব পায় সিটি ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি সিটি ব্যাংক ক্যাপিটাল রিসোর্স লিমিটেড। সহযোগী ব্যবস্থাপক হয় অগ্রণী ইক্যুয়িটি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
অবলেখনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ছিল অগ্রণী ইক্যুয়িটি অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, এবি ইনভেস্টমেন্ট ও এআইবিএল ক্যাপিটাল ম্যানেজমেন্ট লিমিটেড।
বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বলা হয়, বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকের অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালু হবে ১০০ টাকা। বন্ডের টাকা দুটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পে বিনিয়োগের কথা জানায় বেক্সিমকো।
এর একটি গাইবান্ধার তিস্তা ২০০ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট; আরেকটি ৩০ মেগাওয়াট সক্ষমতার করতোয়া সোলার লিমিটেড।
এর মধ্যে তিস্তা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে আছে। এ কেন্দ্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে।
দুই বিদ্যুৎকেন্দ্রের বাইরে বেক্সিমকোর বস্ত্র খাতের কারখানা সংস্কার, যন্ত্রপাতি ক্রয় ও সরঞ্জাম কেনার পেছনেও বন্ডের অর্থ ব্যয়ের কথা বলা হয়।

সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ টানতে ওই সময় হঠাৎ বাড়ানো হয় বেক্সিমকো লিমিটেডের মুনাফার পরিমাণ বলে পরে অভিযোগ ওঠে।
সুকুক বন্ড অনুমোদন দেওয়ার আগের অর্থবছরে (২০২০-২১) বেক্সিমকোর মুনাফা এর আগের বছরের চেয়ে এক হাজার ৪০০ শতাংশ বাড়িয়ে ৬৬০ কোটি টাকা দেখানো হয়।
পরের অর্থবছরে (২০২১-২২) মুনাফা আরও বেড়ে হয় এক হাজার ২৫৪ কোটি টাকা হয়। অনুমোদন পাওয়ার পরের বছর থেকে সংকট দেখানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে কোম্পানিটি ৩৬ কোটি টাকা লোকসানের তথ্য দেয় ডিএসইতে।
ভালো লভ্যাংশ দেওয়ায় শুরুর দিকে সুকুকের কুপন হারও ছিল সেই সময়ের ট্রেজারি বন্ডের তুলনায় অনেক বেশি। প্রথম বছর সুকুক কুপনের মুনাফা ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। অন্যদিকে ট্রেজারি বন্ডের সুদহার ছিল তিন দশমিক ৯২ শতাংশ।
তখন সুকুক খুবই লাভজনক দেখাচ্ছিল। তারপরেও বেক্সিমকো সুকুকের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছিল না।
আস্থাহীনতায় বেক্সিমকো সুকুক বন্ডে কাঙিক্ষত বিনিয়োগ না পাওয়ায় কয়েক দফা মেয়াদ বাড়ানো হয়। শেষ ধাপে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশেল (ডিবিএ) সঙ্গে বৈঠকে বসে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
এসব বৈঠকে বিনিয়োগ বাড়ানোর তাগাদা দিয়ে যুক্তি হিসেবে বলা হয়, ব্রোকারেজ কোম্পানিগুলোর ডিলার লাইসেন্সের বিপরীতে বিনিয়োগ নেই।
ডিবিএর পক্ষ থেকে তখন বলা হয়, লাইসেন্স পাওয়া ব্রোকারেজ কোম্পানিগুলোর ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ আছে পুঁজিবাজারে।
পরে সেই ৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ৩ শতাংশ হারে বন্ডে বিনিয়োগ করতে চিঠি দেয় বিএসইসি। এজন্য ২০২২ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় বেঁধে দেয় বিএসইসি।
সেই চিঠিতে বেক্সিমকো সুকুক ও অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় থাকা বেসরকারি ১১টি ব্যাংকের পার্পেচুয়াল বন্ডের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া দেয়া হয়। একইসঙ্গে সব বন্ডকে বাধ্যতামূলক পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত করার নির্দেশ দেয় বিএসইস।
ডিএসই ও বিএসইসির তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে মাত্র বেক্সিমকো সুকুকসহ তিনটি বন্ডে বিনিয়োগের সুযোগ ছিল সবার।
চিঠি পেয়ে সব ব্রোকারেজ কোম্পানি মোট বিনিয়োগের ৩ শতাংশ হারে বেক্সিমকো সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করে। এভাবে দেড়শ কোটি টাকার বিনিয়োগ পায় বেক্সিমকো সুকুক।

পরে বিএসইসির কথায় সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের নীতিমালায়ও বিশেষ ছাড় দেয়। এ তহবিল থেকে ব্যাংকগুলোকে ঋণ নিয়ে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকে ‘পুঁজিবাজার এক্সপোজারের’ বাইরে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়।
মূলত ব্যাংকগুলোকে বেক্সিমকো সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াতে ওই নির্দেশনা দেওয়া হয় ২০২৩ সালের অগাস্টে।
এভাবে দুই নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে ব্যবহার করে সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ টানা হয়।
এমন প্রেক্ষাপটে তখন সুকুক বন্ডে বিনিয়োগে ব্যাংক, স্টক ব্রোকার ও মার্চেন্ট ব্যাংককে বাধ্য করার পর এখন লোকসানের দায় বিএসইসি নেবে কি না, এমন প্রশ্নে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির মুখপাত্র আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএসইসি মার্কেট সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগে বৈচিত্রতা আনতে মোট বিনিয়োগের ৩ শতাংশ বন্ডে বিনিয়োগ করতে বলেছে।
“বিনিয়োগ যারা করবেন, তারা সিদ্ধান্ত নেবেন, কোন বন্ডে বিনিয়োগ করবেন। সরকারি বন্ডও বাজারে আছে। সুনির্দিষ্ট কোনো বন্ডে বিনিয়োগের জন্য বিএসইসির কেউ বলে থাকলে তার দায় কমিশন নেবে না। কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো নির্দিষ্ট বন্ডে বিনিয়োগ করতে নিদের্শনা দেওয়া হয়নি।’’
তাহলে বিএসইসির নির্দেশনার সঙ্গে কেন ১১ ব্যাংকের বন্ড ও সুকুক বন্ডের তালিকা ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নের কোনো উত্তর দেননি তিনি।
বিএসইসি যখন এই চিঠি দেয় তখন বাজারে সরকারি কোনো বন্ড লেনদেনে আসেনি। বেসরকারি পর্যায়ে মাত্র তিনটি বন্ড তালিকাভুক্ত ছিল। সে কারণে নতুন করে বিনিয়োগের সুযোগ তেমন একটা ছিল না।
চব্বিশের অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে আছেন বেক্সিমকো গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান। এতে চাপে পড়েছে গ্রুপের কোম্পানিগুলো। পরিচালন ব্যয় মেটানোসহ ব্যবসা চালিয়ে নিতে তীব্র অর্থ সংকটে পড়েছে কোম্পানিগুলো। বেশ কয়েকটি কোম্পানি বন্ধও হয়ে গেছে।
এখন পুঁজিবাজারে বন্ডের প্রতি ইউনিটের দাম কমে যাওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি ব্যাংকসহ অন্য প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাও লোকসানের মুখে পড়েছেন।

বন্ড কিনে বড় লোকসানে ব্যাংক
সুকুক বন্ডের পরই বেক্সিমকোর আরেক করপোরেট বন্ড ‘আইএফআইসি আমার বন্ড’ এর দেড় হাজার কোটি টাকার বন্ড বাজারে আসে। এ দুটি বন্ডে ব্যাংকের বিনিয়োগ ছিল ৭৫ শতাংশ।
২০২২ সালে সুকুক বন্ডটি ইউনিট প্রতি ৯৮ টাকা দিয়ে কিনে নেয় ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলো। বেক্সিমকো গ্রিন সুকুকের অভিহিত মূল্য বা ফেসভ্যালু ছিল ১০০ টাকা। সবশেষ ২৪ মার্চ ডিএসইতে বন্ডটি হাতবদল হয় ৬২ টাকায়।
ফলে ৯৮ টাকা দরে বন্ডটি কেনা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান ও মার্চেন্ট ব্যাংকের মধ্যে যেগুলো এখনো তা বিক্রি করেনি তারা বড় অঙ্কের লোকসানের মধ্যে পড়েছে। অথচ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতেও প্রতি ইউনিটের মূল্য ছিল ৮১ টাকা। এভাবে ব্যাংকের বিনিয়োগ করা মূলধনও কমেছে এক তৃতীয়াংশের বেশি।

যেভাবে মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা
সুকুক বন্ডে বিনিয়োগের শতভাগ পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগকারীরা চাইলে পর্যায়ক্রমে বেক্সিমকো লিমিটেডের শেয়ারে রূপান্তরের সুযোগ রাখা হয়। এক্ষেত্রে প্রতি বছর ২০ শতাংশ হারে সুকুক শেয়ারে রূপান্তর করা সুযোগ দেয় বিএসইসি ও বেক্সিমকো।
গুণিতক হারে, অর্থাৎ ৫, ১০, ১৫ ও ২০ শতাংশ রূপান্তরের সুযোগ থাকছে। কোনো বছর শেয়ারে রূপান্তরের সুযোগ গ্রহণ না করলে সেটি পরবর্তী বছরে করা যাবে।
যদি কোনো বিনিয়োগকারী সুকুককে শেয়ারে রূপান্তর করতে না চান, তাহলে পাঁচ বছরে ওই সুকুকের অবসায়ন হবে। এ পর্যন্ত শেয়ারে রূপান্তরের পরিমাণ খুবই সামান্য।
এরপর ২০২৪ সালে 'আইএফআইসি গ্যারান্টিড শ্রীপুর টাউনশিপ জিরো কুপন বন্ড' থেকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা তোলা হয়, যা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করার কথা ছিল।
২০২১ ও ২০২৪ সালে ইস্যু করা দুটি বন্ড থেকে কোম্পানিটি মোট ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এই বিপুল অঙ্কের অর্থ সঠিক খাতে ব্যবহৃত হবে কিনা, তা শুরুতেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল।
গত বছরের ৫ অগাস্টে পট পরিবর্তন হলে আর্থিক খাতের নেতৃত্বেও আসে নতুন নতুন মুখ। তারপরই বিতর্কের জন্ম দেওয়া দুটি বন্ডের টাকা কোথায় বিনিয়োগ হয়, তা তদন্তে নামে বিএসইসি।
ডিএসইর পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বেক্সিমকো সুসুক বন্ডের মাধ্যমে ৭৫০ কোটি টাকা চাইলেও পায় মাত্র ৫০ কোটি টাকা। পরে ব্যাংক ও ব্রোকার প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করা হয় কিনতে।’’
সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র ছাড়া আয় নেই
সুকুক বন্ডে একমাত্র আয় হচ্ছে তিস্তা সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প থেকে। প্রতি মাসে ৫০ কোটি টাকা আয়ের ৭ থেকে ৮ কোটি টাকা ব্যয় হয় পরিচালন বাবদ।
গত অগাস্টের পর থেকে অবশিষ্ট অর্থ নিয়ে নিচ্ছে আইসিবি। ট্রাস্টি হিসেবে ঝুঁকি সামাল দিতে আয়ের একটি অংশ রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির কাছে জমা থাকার শর্ত ছিল।
এর আগে অর্থ না পাওয়ায় এখন পুরোটাই নিয়ে নিচ্ছে তারা। এভাবে আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে আইসিবির কাছে হয়ত ৬৩০ কোটি টাকার মত জমবে। এই টাকা দিয়ে বিনিয়োগকারীদের পুরো অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ হলো, সুকুকের উদ্যোক্তা বেক্সিমকো লিমিটেড এখন লোকসানে রয়েছে।
এমন অবস্থায় বিনিয়োগাকরীদের পাওনা ফেরতের অনিশ্চয়তার বিষয়ে আইসিবির চেয়ারম্যান আবু আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘আগে তো (গত অগাস্টের আগ পর্যন্ত) তারা খুব একটা টাকা-পয়সা জমা দেয় নাই। মাত্র ২০ লাখ টাকার মত দিয়েছিল। এখন আমরা উদ্যোগী হয়ে পুরোটাই নিচ্ছি।
“ট্রাস্টি হিসেবে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ ফেরত দেওয়াটা আমাদের কাজ। আয়ের পুরোটাই জমা করা হচ্ছে ‘সিংকিং ফান্ডে’, যেন বিনিয়োগকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া যায়।’’
পুরো টাকা পরিশোধে বিকল্প কী উদ্যোগ থাকছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘যেহেতু আয় আছে, বন্ডের বিপরীতে অ্যাসেট (তিস্তা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প) আছে, তাই বন্ডের মেয়াদ বাড়ানো যায়। মেয়াদ বাড়ালে তো সমস্যা দেখছি না।’’
বন্ড অনুমোদনের সময়ে ব্যাংক খাতে সুদের হার ছিল ৯ শতাংশের মধ্যে। এখন তা বেড়ে ১২ শতাংশের বেশি। ফলে মেয়াদ বাড়ালে মুনাফার হারে পরিবর্তন আনার দাবি তুলতে পারেন বিনিয়োগকারীরা।
এ বিষয়ে আবু আহমেদ বলেন, ‘‘সেটা তো অবশ্যই আলোচনা করে নেওয়া যেতে পারে। বন্ড রিডেমশন (মেয়াদ শেষে টাকা ফেরত) আগামী বছরে হবে, সেটা ধরে নিয়ে তো অনেক বিনিয়োগকারী ভিন্ন খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে রেখেছেন।
“এখন মুনফার হার নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে মেয়াদ বাড়ানো হলে। তাতে যদি কারো না পোষায় তাহলে, তারা চাইলে চলে যেতে পারেন, সবাই হয়ত যাবে না। কিন্তু একটি অংশের পুরো টাকা দেওয়া যাবে সিংকিং ফান্ড থেকে।’’

আপত্তি জানাবে ডিবিএ
বন্ডে বাধ্যতামূলক বিনিয়োগের সার্কুলারটি এখনো রয়েছে। এতে বিনিয়োগকারীদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। আগামীতে কোথায় বিনিয়োগ করবে তার সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ও দায়ভার সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগকারীকেই দিতে সার্কুলারটি তুলে নেয়ার দাবি তুলবে ডিএসই ব্রোকারেজ অ্যাসোসিয়েশন (ডিবিএ)।
বিএসইসিতে অংশীজনদের বৈঠকে সেই প্রস্তাব তুলতে চান সংগঠনের সভাপতি সাইফুল ইসলাম।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘টাকা যার, সিদ্ধান্ত তারই হয় সব সময়। এখানে তো সব কিছু জোর করে করা হয়েছে। বিনিয়োগ করে যারা লোকসানে আছেন, তাদের দায়ভার কি কেউ নেবে। তাই আমরা এই সার্কুলার প্রত্যাহার চাই।’’
এদিকে ২৭ ব্যাংকের বিনিয়োগ বাঁচাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ডেপুটি গভর্নরের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সবশেষ সভায় দুটি পরামর্শ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
এর মধ্যে একটি হচ্ছে বেক্সিমকো সুকুক বন্ডের মেয়াদ আরো ৫ বছর বাড়াতে বিএসইসির কাছে চিঠি লেখা। আরেকটি হচেছ, উপযুক্ত বিনিয়োগকারী পেলে তিস্তা সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বেচে দেওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘ব্যাংকগুলো চাইলে তো নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকে ভূমিকা রাখতে হবে।’’
বন্ডে বিনিয়োগ সংক্রান্ত সার্কুলার প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘এখন ব্যাংকের বিনিয়োগ না ফেরা পর্যন্ত হয়ত সুযোগ থাকবে না। তবে বিষয়টি প্রয়োজনে পর্যালোচনা করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।’’
লোকসানে থাকা বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ দিতে সরকারের সঙ্গে তিস্তা সোলার প্রকল্পের ২০ বছরের চুক্তি আছে। কেবল তো কয়েক বছর (প্রায় চার বছর) হলো। প্রকল্পের ভ্যালু এখন ৫ হাজার কোটি টাকা। বিক্রি করে দিলেও বিনিয়োগকারীদের টাকা দেওয়া সম্ভব হবে।
‘‘এখন তো দুঃসময় চলছে। বেক্সিমকো কোনোমতে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। সবাই সহযোগিতা করলে বিনিয়োগকারীদের টাকা ফেরত দেওয়াটা সমস্যা নয়।’’
সুকুক বন্ডে বেক্সিমকো লিমিটেডের বিনিয়োগ থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রকল্পের উদ্যোক্তাও বেক্সিমকো। এ থেকে পাওয়া আয় বেক্সিমকোরও পাওয়ার কথা। কিন্তু আয়ের কোনো অংশই দেওয়া হচ্ছে না। সব আইসিবি নিয়ে যাচ্ছে। সেখান থেকে কিছুটা পেলেও বেক্সিমকো লিমিটেড চলতে পারত।