Published : 29 Jan 2026, 08:56 AM
দুই মাস ভোগান্তির পর গ্রিসে ন্যাশনাল ব্যাংকের নিজস্ব মানি ট্রান্সফার এজেন্সির মাধ্যমে পাঠানো প্রবাসীদের রেমিটেন্সের অর্থ বুঝে পেয়েছেন স্বজনরা।
ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ জটিলতায় গত ২৫ নভেম্বর থেকে ২৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বেশিরভাগ সময় গ্রিসে থাকা এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানের প্রধান ফটক তালাবন্ধ ছিল।
তাতে দেশিটিতে থাকা ৩০৬ জন প্রবাসী বাংলাদেশির পাঠানো ৬ কোটি ৬২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা আটকে যায়। গ্রিস থেকে অর্থ পাঠালেও দেশে থাকা স্বজনরা তা সময়মত বুঝে পাননি।
বিষয়টি শেষ পর্যন্ত গড়ায় গ্রিসে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসে। রাষ্ট্রদূত তা অভিযোগ আকারে জানান অর্থমন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও পররাষ্ট্র মন্ত্রালয়ে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পক্ষ থেকেও গত দুই দিন ন্যাশনাল ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগে যোগাযোগ করা হয়।
অবশেষে বুধবার প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স বুঝে পেয়েছেন দেশে থাকা স্বজনরা।
ন্যাশনাল ব্যাংক দাবি করেছে, আগের কর্মকর্তার মেয়াদ শেষ হওয়ায় এবং ভিসা জটিলতার কারণে নতুন কর্মকর্তার দায়িত্ব বুঝে নিতে দেরি হওয়ায় অর্থ ছাড় করা সম্ভব হয়নি।
নতুন কর্মকর্তা যাওয়ার পর গত মঙ্গলবার ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক পর্ষদের বৈঠকে বিষয়টি তোলা হয়। এরপর প্রবাসীদের পাঠানো সাড়ে ৬ কোটি টাকার বেশি অর্থ বুধবার ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
‘কত কষ্ট যে হয়েছে, বোঝানোর ক্ষমতা নাই’
ন্যাশনাল ব্যাংক গ্রিস থেকে প্রবাসী আয় সংগ্রহ করে সরাসরি নিজেদের সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠান ‘এনবিএল মানি ট্রান্সফার পেমেন্ট ফাউন্ডেশন, এসএ গ্রিস’ এর মাধ্যমে। সেখানে তাদের দুটি শাখাই রাজধানী এথেন্সে।
বাংলাদেশি ব্যাংক হওয়ায় গ্রিস প্রবাসীদের বড় অংশ ন্যাশনাল ব্যাংকের মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠিয়ে থাকেন। হঠাৎ করে গত ২৫ নভেম্বর থেকে জটিলতা শুরু হয়।
ভুক্তভোগী প্রবাসীদের একজন মোহাম্মদ ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তার অসুস্থ স্ত্রী ঢাকার হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। ডিসেম্বরের ২১ তারিখ জরুরিভাবে ২ হাজার ইউরো (প্রায় ৩ লাখ টাকা) এথেন্সের ওমোনিয়ায় অবস্থিত এনবিএল মানি ট্রান্সফার এজেন্সির 'এনবিএল কুইক পে' সেবার মাধ্যমে পাঠান তিনি। কিন্তু সে টাকা তার পরিবারের কাছে পৌঁছেনি।
টাকা আটকে যাওয়ার পর মোহম্মদ ইসলামের মত আরো অনেকে লিখিত আকারে গ্রিসের বাংলাদেশ দূতাবাসে জানান। পরে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা রহমান সুমনা অভিযোগটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠান।
দেড় মাস পর টাকা পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রবাসি কামরুজ্জমান কবির বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “গত ১৭ ডিসেমবর টাকা পাঠিয়েছিলাম। তখন বলেছিল, সপ্তাহ খানেকের মধ্যে টাকা পেয়ে যাবে। তিন সপ্তাহ ঘুরেও টাকা পায়নি। শুরুতে বিভিন্ন অজুহাতে সময় পার করেছেন তারা।
“বলেছিল, একটু সমস্যা হয়েছে, জানুয়ারি ১৯ তারিখের মধ্যে পেয়ে যাবে। মাঝে তো এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগই করা যায়ানি, তালা মারা ছিল গ্রিসের প্রধান অফিসে। আমি শেষ পর্যায়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে অভিযোগ দিই। টাকা আদৌ ফেরত পাবে কি না, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলাম।’’
গত মঙ্গলবারও এনবিএল মানি ট্রান্সফার এজেন্সির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছিল বলে জানান তিনি।
বুধবার বেলা ২টা ৪৭ মিনিটে বাংলাদেশে টাকা পাওয়ার কথা জানিয়ে ভুক্তভোগী প্রবাসী রফিক মিয়া জানান, “কষ্ট করে কাজ করি শুধু পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। দেশের বাড়িতে বাবা অসুস্থ, চিকিৎসার জন্য টাকা পাঠিয়েছিলাম। দেড় মাস হয়ে গেল, টাকা সময় মত পৌঁছায়নি। কত কষ্ট যে হয়েছে, আমাদের বোঝানোর ক্ষমতা নাই। আপনাদের মাধ্যমে আজ ব্যাংক অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকছে।”
আরেক প্রবাসী শরিফ হোসেন বলেন, “বিদেশে আমরা কেউ বড়লোক না। মাস শেষে বেতন পাঠাই দেশে। সেই টাকাই যদি এভাবে আটকে যায়, তাহলে বিদেশে থাকার মানে কী? এজেন্সিতে গেলে দরজা বন্ধ, কারও কোনো খোঁজ না পেয়ে হতাশ হয়ে গিয়েছিলাম। এখন টাকা পেয়ে স্বস্তি লাগছে।”
যা বলছে ন্যাশনাল ব্যাংক
প্রবাসীদের রেমিটেন্স ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের। সবশেষ চলতি জানুয়ারি মাসে এক সার্কুলার দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলেও উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে অর্থ স্থানান্তর করতে হবে।
কোনো কারণে দেরি হলে তা উপকারভোগীদের জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দুই মাসের বেশি সময় কেন লাগল তা জানতে গত দুই দিন ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করলে বুধবার ব্যাংকটির উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান আহমেদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে একটি লিখিত বক্তব্য দেন।
সেখানে বলা হয়, “ব্যাংকের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী দেশের বাইরে অবস্থিত ন্যাশনাল ব্যাংকের নিজস্ব এক্সচেঞ্জ হাউসসমূহে ডেপুটেশনে কর্মরত কর্মকর্তাদের নির্দিষ্ট সময় পরপর বদলি করা হয়। কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে ও গ্রাহক সেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে বিধায় আমাদের গ্রীসের এক্সচেঞ্জ হাউস এনবিএল মানি ট্রান্সফার এসএ গ্রিস-এ সিইও হিসেবে কর্মরত শওকত নূর আবেদীকে দীর্ঘ সময়ে ট্রান্সফার করা সম্ভব হয়নি।
“ফলশ্রুতিতে, কর্মকর্তা আবেদী সেখানে গত প্রায় ১২ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। ব্যাংকের প্রচলিত নিয়ম পরিপালনে সম্প্রতি (ডিসেম্বর, ২০২৫) তাকে ট্রান্সফার করে দেশে ফেরৎ আনা হয় এবং আগে থেকেই সেখানে কর্মরত আরেকজন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব পালন করতে বলা হয়।”
ইমরান আহমেদ বলেন, “দায়িত্ব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সম্পাদনের অংশ হিসেবে রেকনসিলিয়েশন করতে গিয়ে কিছু অপরিশোধিত পেমেন্ট চিহ্নিত করা হয় এবং এ বিষয়ে করণীয় ঠিক করতে ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট পরিচালনা পর্ষদের শরণাপন্ন হয়।
“সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হতে কিছুটা সময় প্রয়োজন হয়। উল্লেখ্য যে, পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদনক্রমে উক্ত অপরিশোধিত পেমেন্টসমূহ ইতোমধ্যে নিষ্পন্ন করা হয়েছে।’’
২০১২ সাল থেকে গ্রিসে ন্যাশনাল ব্যাংকের দুটি শাখা রয়েছে জানিয়ে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “আশা করা যাচ্ছে যে, ভবিষ্যতেও এই প্রতিষ্ঠানটি পূর্বের মতই সন্তোষজনক সেবা অব্যহত রাখতে সক্ষম হবে।”
আগের দিনও কথা বলতে রাজি না হওয়া এনবিএল গ্রিস এক্সচেঞ্জের নতুন দায়িত্ব পাওয়া প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এসএম রনি মাহমুদ বুধবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “রেকনসিলিয়েশনের ৬ কোটি ৬২ লাখ ৯৫ হাজার টাকা আগে পরিশোধ করা যায়নি। পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পর আজকে ৩০৬ জন প্রবাসীর পুরো টাকাই অর্থাৎ ৬ কোটি ৬২ লাখ ৯৭ হাজার টাকা উপকারভোগীদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। কোনো গ্রাহকের টাকা বাকি নেই।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কারণ ছাড়া রেমিটেন্স আটকে রাখার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগ খোঁজ নেয়ার পর বিধি অনুযায়ী পদক্ষেপ নেবে।”