৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪ আশ্বিন ১৪৩৩

ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডে মদ, জুয়া, নাইট ক্লাবের বিল দেওয়া যাবে না

এ কার্ড ব্যবহারের আরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডে মদ, জুয়া, নাইট ক্লাবের বিল দেওয়া যাবে না

প্রতীকী ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 29 Sep 2026, 11:08 PM

Updated : 29 Sep 2026, 11:25 PM

ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডে মদ, জুয়া ও নাইট ক্লাবের বিল এবং প্রাপ্ত বয়স্কদের বিনোদনমূলক সেবার ফি পরিশোধ করা যাবে না।

সেই সঙ্গে এ কার্ড ব্যবহারের আরও কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ইসলামি ধারার ব্যাংকগুলোর ‘ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড’ পরিচালনার একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নীতিমালাটি মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এই নীতিমালায় গ্রাহক-ব্যাংক উভয় পক্ষের জন্যই স্পষ্ট কিছু নিয়ম বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এই কার্ডের কার্যক্রম যেন সম্পূর্ণ সুদমুক্ত ও শরিয়াহসম্মত হয়, সে জন্য কী করা যাবে এবং কী করা যাবে না, তা সুনির্দিষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, মদ, জুয়া, নাইট ক্লাব, প্রচলিত বীমা কোম্পানি, অবৈধ ডেটিং বা ম্যাচমেকিং এবং শুকরের মাংস সংক্রান্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে এই কার্ড কার্যকর হবে না।

ইসলামী ব্যাংক, আল–আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকসহ কয়েকটি ব্যাংকের ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড আছে। শরিয়াহসম্মত লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক অধিকার সুরক্ষায় এই নীতিমালা করা হয়েছে বলে সার্কুলারে তুলে ধরা হয়েছে।

শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল লেনদেন বাড়াতে সোমবার এই নীতিমালা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মঙ্গলবার এটি সব ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের কাছে পাঠানো হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা ও ইলেকট্রনিক লেনদেনের সম্প্রসারণের ফলে শরিয়াহসম্মত পেমেন্ট ইন্সট্রুমেন্টের চাহিদাও বৃদ্ধি পেয়েছে। শরিয়াহসম্মত কার্ডভিত্তিক পেমেন্ট সেবা সহজতর করা এবং ইসলামী ক্রেডিট কার্ডের কার্যক্রমকে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ ও দক্ষভাবে পরিচালনা নিশ্চিত করার জন্য ব্যাংকগুলোর ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমের ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

শরিয়াহসম্মত পেমেন্ট ইন্সট্রুমেন্ট বা অর্থ পরিশোধের মাধ্যমের প্রসার, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, গ্রাহকের অধিকার সুরক্ষা এবং কার্যক্রম ও শরিয়াহসম্মতি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংকগুলোর ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমের জন্য ‘ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমের নির্দেশিকা’ প্রণয়ন করেছে।

এই নির্দেশিকা ইসলামী ক্রেডিট কার্ড সেবা প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সময়ে সময়ে জারি করা অন্যান্য প্রযোজ্য আইন, বিধি, প্রবিধান ও নির্দেশনার পাশাপাশি এই নির্দেশিকাও ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, ইসলামী ক্রেডিট কার্ড সেবা প্রদানকারী ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের সকল পণ্য, চুক্তি, লেনদেন, ফি, চার্জ, কার্যক্রম পরিচালনার প্রক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রম ইসলামী শরিয়াহর নীতি ও বিধান এবং এই নির্দেশিকায় উল্লেখিত নিয়মাবলির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তৈরি ও পরিচালিত হচ্ছে।

এছাড়া ইসলামী ক্রেডিট কার্ড কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে যথাযথ শরিয়াহ্‌ গভর্ন্যান্স, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, হিসাব ও তথ্য প্রকাশ এবং গ্রাহক সুরক্ষা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।

এ কার্ড দিয়ে যা করা যাবে না

নীতিমালায়, ইসলামিক ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে শরিয়াহবিরোধী বা বেআইনি কোনো পণ্য বা সেবা কেনা যাবে না। এজন্য ব্যাংকগুলোকে সিস্টেম লেভেলে ‘মার্চেন্ট ক্যাটাগরি কোড’ ব্লক করে রাখতে হবে।

>> মদ ও মদের দোকান

>> জুয়া ও বাজির ব্যবসা

>> প্রাপ্তবয়স্কদের বিনোদনমূলক ব্যবসা

>> নাইট ক্লাব

>> শুকর বা শুকরের মাংস-সম্পর্কিত ব্যবসা

>> সুদভিত্তিক আর্থিক সেবা

>> প্রচলিত/সাধারণ বীমা সেবা

>> ক্যাসিনো, লটারি, বেটিং শপ এবং অর্থের বিনিময়ে বাজি ধরার সুযোগ রয়েছে এমন অনলাইন গেমিং

>> ব্রুয়ারি, ডিস্টিলারি, ওয়াইনারি এবং যেসব পানীয়ের দোকানের প্রধান ব্যবসা অ্যালকোহল

>> বার, ট্যাভার্ন, ককটেল লাউঞ্জ ও ডিসকোথেক

>> ম্যাসাজ পার্লার, এসকর্ট সার্ভিস এবং ডেটিং বা ম্যাচমেকিং সেবা

>> প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তৈরি কনটেন্ট, প্রকাশনা, ভিডিও ও ইন্টারনেট সেবা

>> তামাকজাত পণ্য এবং যেসব দোকানের প্রধান ব্যবসা তামাক বা তামাক-সম্পর্কিত পণ্য

>> সুদভিত্তিক কার্যক্রম পরিচালনাকারী পন শপ/বন্ধকী দোকান

>> অন্য ধর্মের মূর্তি, প্রতিমা এবং উপাসনাসংক্রান্ত সামগ্রী বিক্রির ব্যবসা

>> জ্যোতিষশাস্ত্র, ভাগ্য গণনা, অলৌকিক/অকল্পনীয় বিষয় এবং সংশ্লিষ্ট সেবা

>> হালাল নয় এমন মাংসের প্রক্রিয়াজাতকারী ও কসাইখানা এবং যেসব দোকানের প্রধান ব্যবসা শূকর বা শূকরের উপজাত পণ্য

এবং

>> ক্রিপ্টো সম্পদের লেনদেন এবং জল্পনামূলক মার্জিন ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, কোনো গ্রাহক এ ধরনের কোনে বেআইনি লেনদেন করলে ব্যাংক অবিলম্বে কার্ড বাতিল করবে এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে জানাবে।

ব্যাংকগুলোকে যা করতে হবে

নতুন নির্দেশনা অনুসারে, ব্যাংক শুধু কার্ড ইস্যু, নবায়ন, প্রতিস্থাপন, নেটওয়ার্ক সুবিধা এবং হিসাব রক্ষণাবেক্ষণের মতো নির্দিষ্ট সেবার জন্য নির্ধারিত ‘উজরহ’ বা মাশুল নিতে পারবে। এই মাশুল কোনোভাবেই গ্রাহকের বকেয়া স্থিতি, ঋণের সীমা বা পরিশোধের বিলম্বের ওপর ভিত্তি করে পরিবর্তন করা যাবে না।

গ্রাহক সময়মত বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে ব্যাংক কোনো ‘বিলম্ব জরিমানা’ নিজের আয় হিসেবে নিতে পারবে না। তবে গ্রাহক চুক্তির সময় একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দাতব্য সংস্থায় দান করার প্রতিশ্রুতি (ইলতিজাম বি আত-তাবাররু) দেবেন। ওই অর্থ ব্যাংকের মূল আয়ের বাইরে একটি পৃথক দাতব্য হিসাবে জমা হবে এবং শরিয়াহ কমিটির তত্ত্বাবধানে তা দান করা হবে।

সুরক্ষা ও নিরাপত্তা

নতুন কার্ড চালুর আগে ওয়ান-টাইম পাসওয়ার্ডভিত্তিক সম্মতি নিতে হবে। কার্ডের তথ্য সম্পূর্ণ গোপন রাখতে হবে। হারিয়ে যাওয়া বা চুরি হওয়া কার্ড ব্লকের অনুরোধ পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে অননুমোদিত লেনদেনের অর্থ ফেরত দিতে হবে। এ ছাড়া কার্ডে ‘টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন’ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

নীতিমালায় বলা হয়েছে, শরিয়াহসম্মত লেনদেন ব্যবস্থার উন্নয়ন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহক অধিকার সুরক্ষায় এই নীতিমালা করা হয়েছে। ইসলামিক ক্রেডিট কার্ডের মূল ভিত্তি হবে ‘কর্জ হাসান’ (সুদমুক্ত ঋণ) এবং ‘উজরহ’ (সেবামূল্য)। প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডের মতো এটিকে গ্রাহকের ঋণের ওপর ভিত্তি করে ব্যাংকের আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। গ্রাহক যাতে সাধ্যের অতিরিক্ত ব্যয় না করেন, তা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ বাংকে নিবন্ধিত যেকোনো ইসলামি ব্যাংক বা সাধারণ ব্যাংকের ইসলামিক উইন্ডো বা শাখা এই কার্ড ইস্যু করতে পারবে। বৈদেশিক মুদ্রা বা দ্বৈত মুদ্রার কার্ডের ক্ষেত্রে ব্যাংকটিকে অবশ্যই অনুমোদিত ডিলার হতে হবে।