Published : 17 Sep 2026, 02:15 PM
দুই বছরের বেশি সময় ধরে কারাগারে থাকা সালমান এফ রহমান বেক্সিমকো গ্রুপের তিন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরে যাচ্ছেন।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই তিন কোম্পানি হল বেক্সিমকো (বাংলাদেশ এক্সপোর্ট ইমপোর্ট কোম্পানি) লিমিটেড, বেক্সিমকো ফার্মাসিটিউক্যালস ও শাইনপুকুর সিরামিকস পিএলসি।
নতুন করে পরিচালনা পর্ষদ সাজানোর উদ্যোগের কথা জানিয়ে পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনকে চিঠিও দিয়েছে বেক্সিমকো।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি বিষয়ক বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান এই তিন কোম্পানিরই ভাইস-চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। ২০২৪ সালের অগাস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গ্রেপ্তার হয়ে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
কোম্পানি আইন অনুযায়ী, পরিচালক নিয়োগ বা বাদ দেওয়ার জন্য বিএসইসির অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। সাধারণ সভা ডেকে সদস্যদের মাধ্যমে পরিচালক নিয়োগ দিতে হবে।
তবে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় পরিচালনা পর্ষদ গঠনের পরে বিএসইসিকে অবহিত করতে হবে। আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা জানাতে হবে।
পর্ষদের এক পঞ্চমাংশ বা ন্যূনতম দুই জন স্বতন্ত্র পরিচালক দেওয়া হয়েছে কি, না তা দেখার দায়িত্ব কমিশনের।
তাহলে কেন পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের আগেই কমিশনকে জানাল বেক্সিমকো? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সারের সঙ্গে একাধিকবার ফোন করেও তার সাড়া পাওয়া যায়নি।
বিএসইসির মুখপাত্র আবুল কালাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তিন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠনের বিষয়ে কমিশনকে একটি চিঠি দিয়েছে বেক্সিমকো গ্রুপ। এখানে কমিশনের করার কিছুই নেই। কমিশন পরিচালক নিয়োগ বা বাতিল করবে না। সব কোম্পানি আইন অনুযায়ী করতে হবে।
“তারা পরিচালক নিয়োগ দেওয়ার পরে কমিশনকে শুধু অবহিত করবে। আইনি প্রক্রিয়া যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা যাচাই করে অনাপত্তি দিবে কমিশন।”
বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড দেশের পাশাপাশি যুক্তরাজ্যের লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জের অল্টারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট মার্কেটে (এআইএম) গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিট (জিডিআর) হিসেবে তালিকাভুক্ত।
চব্বিশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে বেক্সিমকো ফার্মায় ৯ জন স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়েছিল বিএসইসি। সেই সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে কোম্পানি আদালতে যায়।
এরপর থেকে কোম্পানির আর্থিক ফলাফল প্রকাশের জন্য পর্ষদের কোনো সভা হচ্ছিল না। ফলে গত বছর জুনে লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে বেক্সিমকো ফার্মার তালিকাচ্যুত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
পরে বিএসইসি কোম্পানিটির পর্ষদ সভা করার এবং বকেয়া হিসাব অনুমোদনের অনুমতি দিলে সমস্যার সমাধান হয়।
বেক্সিমকো ফার্মা বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করার তারিখ এখনো আদালতের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
সালমান এফ রহমান এবং তার ভাই সোহেল এফ রহমান মিলে সত্তরের দশকে বেক্সিমকো গড়ে তোলেন। শুরুতে রপ্তানি-আমদানি ব্যবসা দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও পরে গ্রুপটি বস্ত্র, ওষুধ, সিরামিক, আর্থিক সেবা ও অন্যান্য খাতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে।
দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানির ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন সালমান। আর তার ভাই সোহেল কোম্পানির চেয়ারম্যান।
২০২৪ সালের অগাস্টে গ্রেপ্তার হওয়ার পর জুলাই আন্দোলনকেন্দ্রিক বিভিন্ন হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলায় সালমান এফ রহমানকে আসামি করা হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়েছে।
জনতা ব্যাংক থেকে ইডিএফ সুবিধায় বেক্সিমকোর বিভিন্ন কাগুজে কোম্পানির নামে প্রায় ২৮ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ‘আত্মসাতের’ অভিযোগে দুদক সালমান ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা করেছে। এর আগে একই ব্যাংক থেকে ১৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আরও ৫টি মামলা করেছিল দুদক।
‘ভুয়া’ রপ্তানি বিল ও এলসি ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশে প্রায় হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) সালমান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে ১৭টি মামলা করেছে।
শেয়ারবাজারে কারসাজি, বিনিয়োগকারীদের অর্থ আত্মসাৎ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে বিএসইসি তাকে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে আজীবনের জন্য অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে।
বেক্সিমকো সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে সোয়া চারশ কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ব্যাংক হিসাব ও বিও হিসাব জব্দ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর বেক্সিমকো গ্রুপের আর্থিক সংকটের প্রেক্ষাপটে কোম্পানি পরিচালনা, ঋণ, শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন এবং ব্যবসা পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছিল। এবার বেক্সিমকোর তিন কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ থেকে সালমান এফ রহমানের সরে দাঁড়ানোর পরিকল্পনার খবর এল।