Published : 11 Jan 2026, 01:23 AM
সুন্দরবনের বুক চিরে, এমনকি সংরক্ষিত অঞ্চলগুলোর মধ্যে দিয়েও পর্যটকদের নিয়ে বিলাসবহুল জাহাজের বহর ছুটে চলে দিনরাত। বঙ্গোপসাগরের কিনারা ছুঁয়ে বনের পাশে যখন নোঙর করে থাকে, তখনও এসব জাহাজের ইঞ্জিন আর জেনারেটর বন্ধ হয় না।
যে ধনাঢ্য পর্যটকরা এসব জাহাজের যাত্রী, প্রকৃতির নির্মল বাতাস বা শীতের নরম রোদ উপভোগ করার আগ্রহ তাদের সবার নেই। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনের আরাম ছেড়ে তারা বের হন না। কাচের জানালার ওপর থেকে তারা উপভোগ করেন বনভূমির বিস্ময়।
এ ধরনের বেশিরভাগ নৌযানের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু থাকে সারাক্ষণ। পর্যটকেরা কখনো কখনো অল্প সময়ের জন্য ডেকে বের হন। কেউ কেউ ছোট নৌকায় চেপে প্রবেশ করেন বনের সরু খালে। তখনও ইঞ্জিনের শব্দ, কৃত্রিম আলো আর সাউন্ড সিস্টেমের গর্জন যোগ করে নতুন দূষণ।

অক্টোবর থেকে মার্চ—পুরো পর্যটন মৌসুমেই শব্দ ও আলোর দূষণ সুন্দরবনকে ছায়ার মত অনুসরণ করে, ভেঙে খান খান দেয় অরণ্যের চিরায়ত নীরবতা।
কিছু কিছু নৌযানে সুইমিং পুল পর্যন্ত আছে। জাহাজে গোসল, ধোয়ামোছা বা শৌচাগারের জন্য যে পানি লাগে, তা জাহাজের তলায় বিশাল ট্যাংকে করে বহন করতে হয়। আবার সেই পানি তোলার জন্য প্রয়োজন পড়ে শক্তিশালী মোটর।
সুন্দরবনে পর্যটকদের এই বিলাসযাপন জারি রাখতে জ্বলতে থাকে ডিজেল, যা সবচেয়ে ক্ষতিকর দূষকের একটি।
খুলনার পর্যটক হাসানুর রহমান বললেন, “এসব ট্যুর ক্ষতিকর তো বটেই, রোমাঞ্চেরও কিছু নেই। জঙ্গলে যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের মত প্রাণী ঘুরে বেড়ায়, তার কিছুই আপনি এসব বোটে বসে টের পাবেন না। দিনের পর দিন একটা পাখির ডাকও শুনবেন না।”
ঘূর্ণিঝড়প্রবণ বাংলাদেশকে রক্ষা করার সবচেয়ে বড় প্রাকৃতিক বাঁধ সুন্দরবন।
ট্যুর অপারেটর, দর্শনার্থী আর বনকর্মীরা সবাই মানছেন, এই অতিসংবেদনশীল পরিবেশে এমন ক্ষতি আর চলতে দেওয়া উচিত নয়। কিন্তু এ দূষণ থামবে কী করে?
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বললেন, “কতটা বিলাসিতা করা গেল, পর্যটকেরা শুধু সেটাই চায়। আমাদের কথা কেউ কানে তোলে না।”

অবশ্য পর্যটন সুন্দরবনের সবচেয়ে কম ক্ষতিকর খাত। মোংলা বন্দরে বছরে দুই হাজারের বেশি জাহাজ যাতায়াত করে। সেসব জাহাজে করে এক কোটির বেশি টন কার্গো পরিবহন হয়। তেলের ট্যাংকারও আসে, সঙ্গে তেল, এলপিজি, কয়লাসহ নানা জ্বালানি।
পাশাপাশি একটি ১৩২০ মেগাওয়াট শক্তির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিমেন্ট কারখানাসহ নানা দূষণকারী শিল্প রয়েছে সুন্দরবনের কোল ঘেষে।
সুন্দরবনে ডিজেল নির্ভরতা আরও বাড়ছে
খুলনাভিত্তিক ট্যুর এজেন্সি গ্র্যান্ড হলিডেজ-এর মালিক ওয়াহিদুর রহমান বললেন, গত পাঁচ-ছয় বছরে সুন্দরবনে পর্যটন শিল্পের ব্যাপক প্রসার হয়েছে। আর পুরোটাই নির্ভর করছে ডিজেল জ্বালানির ওপর।
বর্তমানে সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম জোনে প্রায় ৭০টি পর্যটকবাহী নৌযান চলছে, যার মধ্যে ২০১৯ সালের পর যুক্ত হয়েছে ৬০টি বিলাসবহুল ভ্রমণতরী। বিশেষ করে পদ্মা সেতু চালুর পর ঢাকা ও বরিশালের অনেক বিনিয়োগকারীর পর্যটন ব্যবসায় আগ্রহ বেড়েছে।
বিলাসবহুল নৌযানগুলোর অর্ধেকই ৭৫ জন যাত্রী বহনে সক্ষম; বাকি নৌযানগুলোতে ৪০–৫০ জন নিতে পারে। জনপ্রিয় তিন দিনের ট্যুরে সাধারণত ৩৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয় এসব নৌযান, যা সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশের মাত্র ৬ শতাংশ (আয়তন ৬ হাজার বর্গকিলোমিটার)।
শোনা যাচ্ছে, নতুন বিনিয়োগকারীরা বনের অন্য অঞ্চলেও নতুন ব্যবসা চালু করতে আগ্রহী।
একটি টুরিস্ট বোটের ম্যানেজার ওয়াহিদুজ্জামান নির্ঝর জানালেন, মাঝারি আকারের একটি নৌযানে এক ট্রিপেই ১,৫০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল লাগে। বড় নৌযানগুলো ট্রিপপ্রতি ২,৫০০ লিটার পর্যন্ত ডিজেল পোড়ায়।

পর্যটকবাহী প্রতিটি নৌযান প্রতি মৌসুমে গড়ে ৩০টি ট্রিপ দেয়। তিন দিনের ট্যুরে জনপ্রতি খরচ ১২ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা।
ট্যুর অপারেটররা বলছেন, এক দশক আগেও বোটের জেনারেটর দিনের কিছু সময় চালু থাকত, রাত ১০টার পর বন্ধ করে দেওয়া হত।
১৯৯০-এর দশকে সুন্দরবনে বিদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে সীমিত পরিসরে বাণিজ্যিক পর্যটন শুরু হয়। পরে তাদের আগ্রহ কমলে স্থানীয় পর্যটনের বিস্তার ঘটে।
সমস্যা হল, স্থানীয় পর্যটকরা নিয়ম মানতে চান না। অনেকে সূর্যাস্তের পরও বনের ভেতর অবস্থান করেন, আগুন জ্বালান, সাউন্ডবক্সে উচ্চশব্দে গান বাজান বলে বনকর্মীরা জানালেন।
ট্যুর অপারেটররা বলছেন, এসব স্থানীয় পর্যটকদের মধ্যে জলবায়ু, পরিবেশ ও সবুজ জ্বালানির পক্ষের অধিকারকর্মীরাও থাকেন। তারা মোবাইল নেটওয়ার্কহীন নির্জন বনের ধারে বোটে বসে বার্ষিক পরিকল্পনা সাজান, অংশীদারদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাদের সঙ্গে সাংবাদিকরাও থাকেন।
পর্যটকবাহী নৌযানগুলো প্লাস্টিক দূষণের বড় উৎস। এসব বোটে থাকে বোতলের পানি এবং নানা মোড়কবন্দি পণ্য।
ট্যুর অপারেটররা দাবি করেন, তারা বনে আবর্জনা ফেলেন না। কিন্তু বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এসব বর্জ্যের বড় অংশই নদী-সাগরে যায়।
অনেক নৌযানে শৌচাগারের নিচের অংশ খোলা থাকে। অর্থাৎ, মানে পয়োঃবর্জ্য সরাসরি নদীতে পড়ে। বিশেষত শেলা নদীতে, এটাই পর্যটনের সবচেয়ে জনপ্রিয় রুট।
‘স্লো পয়জনিং’
পর্যটকবাহী এসব নৌযান থেকে সবসময় তেল নিঃসরণের ঝুঁকি থাকে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে নেদারল্যান্ডসের সাময়িকী এলসেভিয়ারে প্রকাশিত এক গবেষণায় শেলা নদীর তলদেশে ১৫ ধরনের ভারী ধাতু শনাক্ত করা হয়, যার উৎস মূলত তেল দূষণ।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও উড টেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, সুন্দরবনের বৈশিষ্ট্য হল, দিনে দুইবার জোয়ার-ভাটায় এ বন ধুয়ে যায়। তাতে ছড়িয়ে পড়া তেল জোয়ারের সঙ্গে ভেসে বনের বিভিন্ন নদী, খাল, পুকুরে ছড়িয়ে পড়ে। এসব জলাধার সুন্দরবনের মোট আয়তনের প্রায় ৩০ শতাংশ।
ধীরে ধীরে মাটির ওপরে তেলের স্তর জমে। ডুবে থাকা অবস্থায় ম্যানগ্রোভ গাছের যে বায়ূমূল শ্বাস নেয় এবং পলিমাটি ধরে রেখে ভূমি তৈরি করে, সেগুলো তেলের আস্তরে ঢেকে যায়।
পানির ওপরে তেলের আস্তরণ সূর্যের আলো প্রকেশে বাধা দেয়। তাতে জলজ প্রাণী এবং পুরো প্রতিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দূষণ সুন্দরবনের সংবেদনশীল বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি, বিশেষ করে শেলা নদীর জন্য, যা বিপন্ন ইরাবতী ডলফিন ও গাঙ্গেয় ডলফিনের সবচেয়ে বড় আবাসস্থল। বনজীবী মানুষের জীবন-জীবিকাও এই দূষণের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

২০১৪ সালের ডিসেম্বর শেলা নদীতে ৯৪ হাজার গ্যালন তেল ছড়িয়ে পড়ার পর নদীটি পুরো বিশ্বে আলোচনায় আসে।
ডাচ সাময়িকী ব্রিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে এক প্রতিবেদনে জানায়, বাংলাদেশে জাহাজ ও স্থলভিত্তিক উৎস থেকে বছরে ২,৫০০ টনের বেশি তেল ছড়ায়।
হালকা ট্যাংকারের ধাক্কা খেয়ে বড় দুর্ঘটনার ঘটনা বেশি। অন্যদিকে মোংলা বন্দর বছরে প্রায় ২৭,৪৬০ টন বর্জ্য তৈরি করে, যার ৮৯ শতাংশই তৈলাক্ত।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “এমন মূল্যবান বন রক্ষার গুরুত্ব আমরা এখনো বুঝতে পারিনি, দায়িত্বশীল পর্যটন বা ব্যবসাও শিখিনি।”
মোস্তাফিজুর রহমানের তত্ত্বাবধানে এক গবেষণায় প্রাণীর মলে ব্যাপক মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
ভিয়েতনামের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, কিছু এলাকায় নৌকার ইঞ্জিন বন্ধ রাখতে হয়, পর্যটকদের দাঁড় বেয়ে চলতে হয়।
এশিয়ার অনেক জায়গা আছে, যেখানে পর্যটকদের সঙ্গে কিছু বহন করাও নিষেধ। আর এ সবই করতে হয় পর্যটনের দায়িত্বশীলতার জায়গা থেকে।
এক টুকরো ক্ষীণ আশা
ক্ষীণ আশার আলো দেখ যাচ্ছে এমন এক জায়গায়, যেখানে আসলে কিছু প্রত্যাশাই করা হয়নি। সুন্দরবনে ছোট, পুরনো মাছ ধরা নৌকাগুলো এখন সোলার প্যানেল ব্যবহার করছে।
গরিব জেলেরা এই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার করে বাতি জ্বালান, মোবাইল চার্জ করেন। বিলাসিতার জন্য তাদের ডিজেল পোড়াতে হয় না। শিক্ষিত, পয়সাওয়ালা পর্যটক বা তাদের সেবাদানকারী অপারেটররা সেই শিক্ষা নেন না।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম বলেন, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, উদ্ভাবন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে সুন্দরবনে এ ধরনের দূষণ অনেকটাই কমানো যেত।
তার ভাষায়, “আমাদের দ্রুত অন্যদের থেকে শিখতে হবে। আরও দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।”