শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বাস সেবা কেন নয়?

গুঞ্জন রহমান
Published : 13 Dec 2021, 05:52 PM
Updated : 13 Dec 2021, 05:52 PM

টিকাটুলির শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয় এবং আজিমপুর গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজকে ২০১৬ সালে চারটি বাস উপহার দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস করা যায় কি না, তা  সরকার ও পরিবহন মালিকদের ভেবে দেখাটা জরুরি হয়ে উঠেছে। ঢাকা শহরের যে সকল রুটে গণপরিবহন চলাচল করে, সেই একই রুটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার অনুপাতে আলাদা  বাস সেবা চালু করা যেতে পারে, যে বাসে ছাত্রছাত্রী ছাড়া আর কেউ উঠতে পারবেন না। বাস ভাড়া নির্ধারিত থাকবে, যা অন্যান্য বাসের ভাড়ার অর্ধেক। এতে পরিবহন মালিকদের যে ঘাটতি থাকবে, তা পূরণে ভর্তুকি দেবে সরকার।পাবে

বিভিন্ন জেলায় যেভাবে গেটলক সার্ভিস চলে, সেই মডেলে শিক্ষার্থীদের বাসের ডিউটি রোস্টার ও রাউটিং নির্ধারণ করা যেতে পারে। অর্থাৎ কোনো জেলার পরিবহন সংস্থায় যতগুলো বাস নিবন্ধিত থাকে, তাদের মধ্যে পালাক্রমে কিছু বাসকে বর্ধিত ভাড়ায় বিরতিহীন গেটলক হিসেবে চালানোর সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। এতে করে সব বাসই দিনে একবার বা সপ্তাহে একাধিকবার গেটলক সার্ভিসে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবে। সুবিধা হচ্ছে, এই সার্ভিসে ভাড়া পূর্বনির্ধারিত, কাউন্টার থেকে সব টিকিট বিক্রি হবে, রাস্তা থেকে বা মাঝপথে যাত্রী নিতে বিরতি দিয়ে অযথা সময় নষ্ট হবে না। লোকাল সার্ভিসের চেয়ে ভাড়া বেশি হওয়ায় মালিক পক্ষের লাভ হয় এতে।

এই মডেল অনুসরণ করে কোনো রুটে চলমান পঞ্চাশটি বাস থেকে রোজ পালাক্রমে দশটি বাসকে শিক্ষার্থীদের জন্য বাস হিসেবে চালানো যেতে পারে। ওই দশটি বাস ওই নির্দিষ্ট দিনে অন্য যাত্রী তুলতে পারবে না, নির্ধারিত ভাড়ার অর্ধেক ভাড়া আদায় করবে এবং ওই ট্রিপগুলোর জন্য সরকার এবং/অথবা মালিক সমিতির কাছ থেকে ভর্তুকি পাবে।

এতে করে ছাত্রছাত্রীদের অন্যান্য যাত্রীদের সাথে গাদাগাদি করে চলাচল করতে হবে না। অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে পিষ্ট হতে হবে না। তাদের স্টপেজ বা কাউন্টার আলাদা হওয়ায় সাধারণ যাত্রীদের সাথে প্রতিযোগিতা করে বাসে ওঠার জন্য ধাক্কাধাক্কি করতে হবে না।

সর্বোপরি অর্ধেক ভাড়ার জন্য বাসের ভেতর বচসাও হবে না। আরেকটি সুবিধা হচ্ছে, যেহেতু এই  বিশেষ সেবা শুধুই ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত, তাই এই বাসগুলো চলাচল করবে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে, কেননা সাধারণ যাত্রী ওঠানামার জন্য তাদের যত্রতত্র থেমে থাকতে হবে না।


রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজকে ২০১৮ সালে পাঁচটি বাস দেওয়া হয় প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। ছবি: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

লোকাল বাসে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে জানি, দীর্ঘ সময় বাস স্টপেজে বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা, বাস আসলে ধাক্কাধাক্কি করে ওঠা, ওঠার পর সিট না পাওয়া, অতিরিক্ত যাত্রীর চাপে ঠিকমতো দাঁড়াতেও না পারা, ভাড়া আদায় নিয়ে যাত্রী-কন্ডাক্টরের বচসা, মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করা ইত্যাদি নানান যন্ত্রণা করে গন্তব্যে পৌছুঁনোর পর মেজাজ  খিঁচড়ে থাকে। তাতে  যে কাজে বার হই তা করার মতো এনার্জি আর অবশিষ্ট থাকে না।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গামী ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের তাহলে শারীরিক ও মানসিক অবস্থা কেমন থাকে যখন তারা নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছায়?

কতবার এরকম হয়েছে যে, ভিড়ের বাসে উঠতে না পেরে অফিসে দেরিতে পৌঁছুতে বাধ্য হয়েছি, জরিমানা গুনতে হয়েছে তার জন্য। ছাত্রছাত্রীদেরও নিশ্চয়ই ক্লাস-পরীক্ষায় দেরি হয়ে যায়। ক্লাসে বসেও তারা এক-দেড় ঘণ্টার দুঃসহ সফরের ভোগান্তি ভুলে পড়ায় মনোযোগ দিতে পারে না।

তাছাড়া, বিশেষত ছাত্রীদের গণপরিবহনে যেভাবে হয়রানীর শিকার হতে হয়, তা বলাই বাহুল্য। ইভটিজিং থেকে শুরু করে নানা রকম যৌন হয়রানি সহ্য করেই তাদের পাবলিক বাসে চলাচল করতে হয়।

এরকম আরও অনেক রকম ভোগান্তিই দূর করা সম্ভব যদি ছাত্রছাত্রীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিস চালু করা যায়। এসব কথা বিবেচনা করে ছাত্রছাত্রীদের তথা আমাদের সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা ভেবে আমাদের আন্তরিক হওয়ার প্রয়োজন আছে বৈকি।

শিক্ষার্থীদের আলাদা বাস সেবা চালু করা গেলে তাদের জন্য নিয়মিত রুটের মাসকাবারি টিকেটের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে। এরকম অনেক কিছুই করা যায়। কর্তৃপক্ষ আন্তরিকতার সাথে ভেবে দেখলে এই সার্ভিস চালু করা খুব সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছর পূর্তি উদযাপন করছে যে জাতি তাদের আচরণে আধুনিকতার প্রকাশ থাকা উচিত। থাকা আবশ্যক। পঞ্চাশ বছরে আমরা একটি আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি। এদেশে এখনও রাস্তাঘাটে শৃংখলা বলে কিছু নেই। ব্যস্ততম রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে অদক্ষ চালকেরা, যাদের অধিকাংশের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। আর যাদের আছে, তারা সেগুলো পরীক্ষা দিয়ে অর্জন করেনি বরং পেয়েছে হয় সমিতির জোরে, নয়তো ঘুষ দিয়ে।

এই শহরে বয়স্ক যাত্রীদের জন্য গণপরিবহন এক বিভীষিকা। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য নামেই শুধু আসন বরাদ্দ; বাস্তবে ওই বরাদ্দকৃত আসন তাদের ভাগাভাগি করতে হয় মহিলা, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের এবং তার চেয়েও বড় কথা, ওই আসন পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে যে  ধাক্কাধাক্কি করে বাসে উঠতে হবে, সেটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। মহিলা, বয়স্ক ও শিশুদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। অথচ শারীরিকভাবে দুর্বল যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস সার্ভিসই থাকা উচিত ছিলো।

যথাযথ কর্তৃপক্ষ প্রস্তাবটির নানা দিক বিবেচনা করে, সুবিধা-অসুবিধাগুলো খতিয়ে দেখে, কারিগরি দিকগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে অবিলম্বে একটি কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন বলে আশা করছি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক