স্বপ্ন ছুঁতে চায় তৈলারদ্বীপ গ্রামের ফুটবলকিশোরীরা

মোহাম্মদ ওয়াসিম
Published : 5 Feb 2021, 11:07 AM
Updated : 5 Feb 2021, 11:07 AM


শঙ্খ নদী লাগোয়া গ্রামটির নাম তৈলারদ্বীপ। এই গ্রামের হাই স্কুলের মাঠে ফুটবল খেলছে ১৫ জন কিশোরী। সবার পরনে বুট আর সাদা-নীল জার্সি।  সমাজ আর দৃষ্টিভঙ্গির বাঁধা ডিঙিয়ে  গ্রামের মাঠে কিশোরীদের এমন ফুটবল খেলার অনুশীলন ময়মনসিংহের  কলসিন্দুরের ফুটবলকন্যাদের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

তৈলারদ্বীপের এই কিশোরীরা নিলুফার কাইছার স্মৃতি মহিলা ফুটবল একাডেমির সদস্য। একদিনে এই একাডেমি হয়ে উঠেনি। বঙ্গমাতা স্কুল টুর্নামেন্টের সাফল্য থেকে নজরে আসে ফাহিমা সুলতানা। এরপর একজন থেকে কয়েকজন। এভাবে পুরো একটি টিম।

গত ৩১ জানুয়ারি বিকালে অনুশীলন করছিলেন এ দলের অধিনায়ক ফাহিমা সুলতানা। কথা হতে জানালেন, ছোটবেলা থেকেই খেলার প্রতি বিশেষ আগ্রহ ছিল তার।

ফাহিমা বলেন, "স্বপ্ন দেখতাম একদিন আমিও মাঠ দাপিয়ে ফুটবল খেলবো। কিন্তু তা হয়ে উঠত না। এরই মাঝে শুনলাম স্কুল পর্যায়ে বঙ্গমাতা ফুটবল টুর্নামেন্ট হবে। আগ্রহ থেকে নাম জমা দেই। খেলিও। সবাইকে তাক লাগিয়ে আমরা সেইবারে চ্যাম্পিয়ন হই।"

তবে এরপর নিয়মিত অনুশীলন চালিয়ে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করে এই কিশোরীরা।

"বছরে একবার টুর্নামেন্টে নিয়ম রক্ষার খেলায় সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে আমাদের ফুটবল খেলার স্বপ্ন। তাই একদিন এলাকায় স্থানীয় ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব আজিজুল হক আজিজ ও মো. এরশাদকে বিষয়টা জানাই। ওনারা আমাদের একাডেমি করে দেওয়ার স্বপ্ন দেখালেন। স্বপ্নটি আমাদের সহসা পূরণ হলো", বললেন ফাহিমা।

"তারপর আমি স্কুল থেকে আমার মত আরও যারা খেলতে আগ্রহী তাদের তালিকা সংগ্রহ করে অনুশীলন শুরু করলাম। সবার পরিশ্রমে আজ আমরা চট্টগ্রামে একমাত্র মহিলা ফুটবল একাডেমি। প্রতিযোগিতায় পুরো চট্টগ্রামে চ্যাম্পিয়ন হয়েছি। ঢাকার বিভাগীয় পর্যায়ে খেলছি, সিলেটে খেলছি। তাছাড়া আমাদের একজন বিকেএসপিতে সুযোগ পেয়েছে। এভাবে আমরা একদিন দেশের হয়ে বিশ্বের বুকে লাল-সবুজের পতাকা উচিয়ে ধরবো।"

ওই দলে ফাহিমার সাথে খেলেন সাদিয়া তাবাসসুম, তানজিনা খানম, শ্রিপা দাশ, পূর্ণিমা দাশ, জান্নাতুল মাওয়া রিকি, তাহিয়া সুলতানা, আলিয়া আকতার, সানজিদা সুলতানা, মনোয়ারা বেগম মনি, পূজা দাশ, অন্তু দাশ, দিলরুবা খানমসহ আরও এগার জন।

তৈলারদ্বীপ এরশাদ আলী হাইস্কুলের মাঠে সপ্তাহে তিনদিন অনুশীলন করে তারা। তাদের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আবহনী ফুটবল দলের সাবেক গোলরক্ষক ও ফুটবল কোচ মো. আলী।

তিনি বলেন, "আমাদের দেশে মনে করা হয় ফুটবল ছেলেদের খেলা। মানুষের সেই চিরায়ত ধারণাকে ভুল প্রমাণ করে এগিয়ে চলছে মেয়েরা। তারা উপজেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণের অপেক্ষায় আমাদের মেয়েরা। অধ্যবসায় ও স্বপ্ন ছোঁয়ার তীব্র ইচ্ছে তাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে।"

তবে একই সঙ্গে ক্ষোভ জানিয়ে এই  ফুটবল প্রশিক্ষক বলেন, "চট্টগ্রাম একমাত্র মহিলা ফুটবল একাডেমি এটি। এমন উদ্যোগটি ব্যক্তি পর্যায়ের সহায়তা দিয়ে চলছে। অথচ যাদের দায়িত্ব তাদের কোনো খোঁজ নেই। এমনকি যা বরাদ্দ পাওয়ার কথা তা থেকেও মেয়েদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।"

এই মহিলা ফুটবল একাডেমির দুই উদ্যোক্তা স্থানীয় ইউপি সদস্য আজিজুল হক আজিজ ও ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব মো. এরশাদ একাডেমির চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্টাতা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করছেন। মূলত এই দুজনই ব্যক্তি পর্যায়ে সহায়তা নিয়ে ফুটবল খেলার স্বপ্ন দেখা মেয়েদের নিয়ে একাডেমি গড়েছেন। তাদের খেলার বুট-জার্সি দিয়েছেন।

একাডেমির নামকরণ করা হয়েছে সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের অর্থ সম্পাদক ওয়াসিকা আয়শা খানের মা মহায়সী নারী নীলুফার কায়সারের নামে। ওয়াসিকা আয়েশা খান প্রয়াত বর্ষিয়ান আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানের কন্যা।

নীলুফার কায়সার চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহসভাপতি, চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় মহিলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি ছিলেন। মহিলা একাডেমি গড়ার উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে শুরুর থেকেই পৃষ্টপোষকতা করে আসছেন তিনি।

কিশোরী ফুটবল দলটিকে নিয়ে কথা হওয়ার সুযোগ হলো কিশোরী ফুটবল চট্টগ্রাম জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে। তিনি এই ফুটবলকন্যাদের কথা ইতোমধ্যেই জেনেছেন বলে জানালেন।

ফুটবল দলটির প্রশংসা করে আ জ ম নাছির উদ্দীন বলেন,  "তারা অঙ্গীকারবদ্ধ ও আন্তরিক। একজন খেলোয়াড় হওয়ার জন্য এই গুণগুলো আবশ্যক।

"প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে উঠে এসে চট্টগ্রামে মহিলা ফুটবলের প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা করেছে তারা। আলো ছড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের পাশে আমি আ জ ম নাছির উদ্দীন ও জেলা ক্রীড়া সংস্থা সবসময় থাকবে। তাদের যে ধরনের সহায়তা দরকার তা আমাদের জানালে আমরা সর্বোচ্চভাবে পাশে থাকবো।"

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক