Published : 25 Feb 2020, 12:06 PM

এবারের বইমেলায় অন্যপ্রকাশ থেকে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার গণহত্যা নিয়ে '১৯৭১ বিধ্বস্ত বাড়িয়ায় শুধুই লাশ এবং' শিরোনামে বই প্রকাশিত হয়েছে। বইটির ভূমিকা লিখেছেন খ্যাতিমান লেখক সেলিনা হোসেন। আর বইটির লেখক মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে লেখালেখির জন্য বজলুর রহমান স্মৃতিপদক ও কবিতার জন্য সিটি আনন্দ আলো পুরস্কার প্রাপ্ত ইজাজ আহমেদ মিলন।
বইটির উপজীব্য গাজীপুরের বাড়িয়ার গণহত্যা। ১৯৭১ সাল। ১৪ মে। শুক্রবার। দুপুর একটার মিনিট দশেক আগে হঠাৎ করেই পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ করে বাড়িয়া এলাকায়। মিশন মাত্র চার থেকে পাঁচ ঘন্টার। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় হিন্দু অধ্যুষিত গাজীপুরের বাড়িয়া। তিন দিকে বেলাই বিলে বেষ্টিত বাড়িয়ায় নির্বিচারে চালানো হয় গণহত্যা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নৃশংসতম এই গণহত্যার ঘটনায় কতজন প্রাণ হারিয়েছেন তার সঠিক পরিসংখ্যান না জানা গেলেও প্রাপ্ত উপাত্ত থেকে ধারণা করা হয় সেদিন অন্তত দু শ' মানুষ শহীদ হন। দুঃখজনক হলেও সত্যি এদের কারোরই ঠাঁই হয়নি স্বাধীনতাযুদ্ধের দলিলপত্রে।
বইটির লেখক শ'খানেক শহীদের একটি নামের তালিকা ধরে প্রায় তিন বছর অনুসন্ধানের পর বাড়িয়া গণহত্যা গ্রন্থভুক্ত করেছেন। '১৯৭১ বিধ্বস্ত বাড়িয়ায় শুধুই লাশ এবং' বইটি মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে রচিত ইজাজ আহমেদ মিলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য মনে হয়েছে একটি এলাকাকে ঘিরে তার বর্ণনা একদিকে হৃদয়বিদারক, অন্যদিকে সাহসী চেতনায় দীপ্ত। স্বাধীনতা অর্জনের সময়ে পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যার বিবরণের পাশাপাশি বাঙালির যুদ্ধে যাওয়ার অনুপ্রেরণার নানাদিক সুলিখিত ভাষায় বর্ণিত হয়েছে।
প্রতিটি লেখার একটি শিরোনাম দিয়েছেন ইজাজ মিলন। শিরোনামগুলো ধরে বর্ণিত বিবরণ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের দলিল হয়ে থাকবে। একটি শিরোনাম 'রক্তে লাল হয়ে যায় বেলাইয়ের জল' গণহত্যায় জীবনদানকারী মানুষের রক্ত স্বদেশের জন্য ধরা প্লাবিত করেছে। আরেকটি শিরোনাম 'পড়ে থাকে শিয়ালে খাওয়া বুলু আর ফুলুর বীভৎস দেহ' এমন দৃশ্যও চিত্রিত হয়েছে স্বদেশের মাটিতে।
আরেকটি শিরোনাম 'বাকেরের মুখে মৃত মায়ের স্তন, পাশেই পড়ে আছে তিন সন্তানের লাশ' গনহত্যার নির্মমতা এভাবেই সংঘটিত হয়েছে। এমন আরও অনেক বর্ণনা আছে এই বইয়ে। আরেকটি শিরোনাম 'গামছা চিড়া মুড়ি নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন আব্দুর রশিদ চিনু'; িএমন অসংখ্য মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন যুদ্ধে।
বইটির সপ্তম আখ্যানটি বড় হৃদয়বিদারক; সান্ত্বনা ও বঞ্চনার করুণ গল্প। একাত্তরের ১৪ মে বাড়িয়া গণহত্যার দিন পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে শহীদ হন কফিল উদ্দিন মিয়া। কলেমা পড়তে জানা মুসলিম হয়েও তার রক্ষা হয়নি। স্বামীকে হারানোর পর স্ত্রী শহর বানু ও তার চার সন্তানের ওপর নেমে আসে স্বজনদের চাপিয়ে দেওয়া বঞ্চনার অভিশাপ। বাড়ি ছাড়া এমনকি গ্রাম ছাড়তেও বাধ্য হন শহর বানু।
এত বঞ্চনার মধ্যেও সান্ত্বনা একটাই; মুক্তিযুদ্ধে কফিল উদ্দিনের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি তার স্ত্রী শহর বানুর কাছে একটি চিঠি পাঠান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বইটির প্রাক-কথনের প্রথম কয়েক লাইনেই এক ট্রাজিক আখ্যানের সাক্ষ্য মেলে। বিধ্বস্ত বাড়িয়ায় শহীদ হওয়া সকল নারী-পুরুষ ও শিশুদের নানা অজানা অধ্যায় ও বীভৎস সেই ঘটনার রোমহর্ষক বর্ণনা উঠে এসেছে পুরো গ্রন্থে।
এই গ্রন্থের প্রতিটি পাতাই ভেজা। প্রতিটি শব্দেই যেন লেগে আছে ছোপ ছোপ রক্ত। প্রতিটি বাক্যই সাক্ষ্য দিচ্ছে-বইটা যেন একাত্তরের বধ্যভূমি।
বইটির প্রচ্ছদ করেছেন মোস্তাফিজ কারিগর। বিনিময় মূল্য রাখা হয়েছে ৪৫০ টাকা।