ওড়িশায় তিন দিনের ঘোরাঘুরি

দূর থেকে চিল্কা হ্রদ দেখতে দেখতে মন কেমন দ্রবীভূত হয়ে উঠছিল। আরো একটা দিন যদি পেতাম তবে দারিংবাড়ি দেখে যেতে পারতাম।

রোদেলা নীলারোদেলা নীলা
Published : 15 Nov 2022, 09:08 PM
Updated : 15 Nov 2022, 09:08 PM

আসামের কামাখ্যা মন্দির দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল ২০১৮ সালে। ওটা নিয়ে নাগরিক ভিডিও প্রতিবেদনও করেছিলাম। এরপর ইচ্ছে ছিল বাকি মন্দিরগুলো দেখব। কিন্তু ভারত তো ছোটখাটো কোনো দেশ নয়। আমার পক্ষে একবারে এতো মন্দির ঘুরে দেখাও সহজ নয়। তবু আসাম ঘোরার পর ভেবে দেখলাম ওড়িশা আমার দ্বিতীয় পছন্দ। তাই আর কিছু না না ভেবে তৈরি হয়ে গেলাম আবারও গেলাম ভারত সফরে।

পুরো ওড়িশা তিন দিনে দেখতে পারব না। তাই না দেখলেই নয় এমন জায়গার নাম রাখলাম ইচ্ছের তালিকায়। সেই ইচ্ছেকে আরো বেশি সহজ করে দিলেন অমিত দাদা। তিনি তিন দিনের একটা ভ্রমণ প্যাকেজ করে ফেললেন। প্রথম দিন থাকব ওড়িশার রাজধানী ভুবনেশ্বরে, দ্বিতীয় দিন পুরিতে এবং তৃতীয় দিন ব্রহ্মপুর।

হাওড়া রেলস্টেশন থেকে ট্রেন ছাড়ল সকাল ৮টায়। সাত ঘন্টার লম্বা পথ। মুঠোফোনে শুধু ফেইসবুক ব্রাউজ না করে ফাঁকে ফাঁকে পড়ে নিলাম ওড়িশা রাজ্য নিয়ে অনেক তথ্য।

রাতে ভুবনেশ্বর রেলস্টেশনে নামার পর ওড়িয়া ভাষার সাথে আমি প্রথম পরিচিত হলাম।বাংলা ভাষার সাথে অনেকখানি মিল পেলাম। এরা প্রত্যেক শব্দের পেছনে একটা করে ও-কার দেয়। যেমন, মন বলে মানে মনো বলেও। ওড়িয়া ভাষায় লেখা বুঝতে না পারলেও, কিছুটা আন্দাজ করা যায়।

ভুবনেশ্বর স্টেশনের সাথেও যেন বাংলাদেশের কমলাপুর রেলস্টেশনের মিল রয়েছে। এখানে সেখানে শুয়ে-বসে আছে যাত্রীরা। আর তার মাঝ দিয়ে আমরা ল্যাগেজ নিয়ে ছুটছি ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে। কলকাতার মতো ওলা এবং উবার সার্ভিস দেখা গেল এখানে। তাই গাড়ি পেতে খুব বেগ পেতে হলো না। নিরিবিলি আর ছিমছাম শহরের ট্রাফিক সিগন্যালে বসে অচেনা শহরের গন্ধ নিলাম।

মন্দিরের শহর ভুবনেশ্বর

আমার ভুবনেশ্বর আসার আসল উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারতের আলোচিত সব মন্দির দেখা। জগন্নাথ মন্দির এর মধ্যে অন্যতম। এখানে এক রাত থেকে পরদিন আশপাশের মন্দির এবং দর্শনীয় স্থান দেখে তারপর আমরা যাব পুরি সমুদ্র সৈকতে।

পর্যটকদের ঘোরাঘুরির জন্যে বাস আছে। তবে আগে থেকে ট্রাভেল এজেন্সির সাথে বুকিং করে নিতে হয়। আমরা একটা অটো ঠিক করে নিলাম। সাতটি মন্দির, উদয়গিরি-খণ্ডগিরি আর শেষে নন্দনকানন ঘুরে দেখব। সারাদিনের ভাড়া দুই হাজার রুপি। দুপুরের খাওয়া ড্রাইভার আমাদের সাথেই করবেন। ড্রাইভার স্থানীয়। সব কথা বলতে হয় ইশারা দিয়ে। আমরা আধো বাংলা আধো হিন্দিতে বেশ চালিয়ে যাচ্ছি।

ওড়িশাতে ভাতকে চাউল বলে। খাবারের সময় হতেই পরিমল দাদা আমাকে সতর্ক করলেন, “ভুলেও এখানে গরুর মাংস চেয়ে বসবে না কিন্তু, শেষে মার খাবে।”

ওড়িশাতে হিন্দু সম্প্রদায় অত্যধিক বেশি। যেদিকে চোখ যাচ্ছে কেবল মন্দির আর মন্দির। এক মন্দির দেখা শেষ হতেই অন্য মন্দিরে যাচ্ছি। কোনোটার সাথে কোনোটার আদল মিলছে না। একেকটার কারুকার্য একেক রকম। এতো যুগ আগে কারা যে এমন চমৎকার শিল্পকর্ম করেছিলেন সেটাই অবাক করা ব্যাপার।

রাজারানি মন্দির

সবার আগে আমরা গেলাম রাজারানি মন্দির দর্শনে। টিকিট কেটে বাগানের সরু রাস্তা দিয়ে এগোতেই দেখলাম অসাধারণ কারুকার্য খচিত দুটি মন্দির নিজেদের স্পর্শ করে দাঁড়িয়ে আছে। রাতে এখানে আলোকসজ্জাও হয় বলে জানলাম।

চল্লিশ ডিগ্রি তাপমাত্রায় ক্যামেরার লেন্স বার বার ঘোলা হয়ে যাচ্ছে। আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে ঘামছি আমরা। এরমধ্যেও কাছে থেকে দেখা মন্দিরের কারুকার্য বিমোহিত করছে আমাকে।

লিঙ্গরাজ মন্দির

লিঙ্গরাজ মন্দিরে মোবাইল বা ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ নিষেধ। আমার ক্যামেরার ব্যাটারি এমনিতেও শেষ হয়ে গিয়েছিল। কোথাও থ্রি পিন চার্জার পাইনি। ফলে অমিত দার ক্যামেরার ওপর ভরসা করে চলছিলাম। দূর থেকে ছবি নেওয়াতে ভেতরটা পরিষ্কার বোঝা যায়নি। পূর্ণার্থীদের একে একে স্যান্ডেল খুলে প্রসাদ হাতে মন্দিরে প্রবেশ করতে দেখলাম।

মুক্তেশ্বর মন্দির ও পরশুরামেশ্বর মন্দির

লিঙ্গরাজ মন্দির থেকে কিছু দূরে এগুলে রয়েছে মুক্তেশ্বরমন্দির এবং পরশুরামেশ্বর মন্দির। আমরা সেদিকেই চলতে শুরু করলাম।

মুক্তেশ্বর মন্দিরের অপরূপ কারুকার্য চোখ ধাঁধিয়ে দিলো। এরপর একে একে দেখলাম পরশুরামেশ্বর মন্দির, অনন্ত বাসুদেব মন্দির, ব্রাহ্মেশ্বর মন্দির, নাগেশ্বর মন্দির।

আরো অনেক মন্দির ছিল ঘুরে দেখার। কিন্তু বেলা এতো কড়া হচ্ছিল যে একটু বিশ্রাম না নিয়ে আর ঘোরাঘুরি সম্ভব হলো না। অটোওয়ালাকে বললাম, ”চলুন দাদা, কিছু খেয়ে আবার শুরু করি।”

ওড়িশাতে ভাত পেতে মুশকিল হয়নি। সাথে সবজি-মুরগিও মিলে গেল। ভুবনেশ্বর মিষ্টির জন্যে বিখ্যাত তা আগেই জেনে এসেছি। রসালো মিঠাইয়ের স্বাদ না নেওয়ার মতো ভুল করিনি।

ঢালু রাস্তা থেকে কিছুটা টিলার ওপর অটো দাঁড় করালেন ড্রাইভার। রাস্তা পার হতে উদয়গিরি-খণ্ডগিরি দেখা যাচ্ছে। এদিকে সারাদিন মন্দিরে মন্দিরে হাঁটাহাটি করে গরমে আমি একেবারে সিদ্ধ হয়ে আছি। তাই দাদাদের বললাম, “আপনারা গিরির ওপরের দিকটা যান। আমি এই গাছের নীচ থেকে কিছু ছবি নিয়ে নেব।“

তারা রাজি হলেন।আমি স্থানীয় গাইড ডেকে তার কাছ থেকে ইতিহাস জেনে নিলাম। আর সাথে চলতে থাকল আমার মোবাইলে ছবি তোলা।

উদয়গিরি ও খণ্ডগিরির গুহাতে প্রবেশ করতে টিকিট কিনতে হয়। আমি অবশ্য ভারতীয়দের সাথে বেড়ানোর সুবিধা নিচ্ছিলাম ।

বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামার পথে। অটোওয়ালা আমাদের এবার শহরের বাইরে নিয়ে চলেছে। রেলস্টেশন থেকে ১৭ কিলোমিটার দূরে নন্দনকাননের দিকে। নন্দনকানন নিয়ে আগে কিছু ধারণা ছিল আমার। এবার তা মিলিয়ে নিচ্ছি চোখে দেখে ।

ওড়িশার ভুবনেশ্বরে জুওলজিক্যাল পার্ক নন্দনকাননের বিরাট ফটকের সামনে এসে অটো নামিয়ে দিল আমাদের। এখানে আছে ট্রয় ট্রেন, রোপ ওয়ে দিয়ে পুরো চিড়িয়াখানা দেখার সুযোগ।

৬০ বছরেরও বেশি পুরনো এই চিড়িয়াখানা বেশ খোলামেলা। মুক্ত আকাশের নিচে প্রাণিরা নিজেদের মতো করে দিব্যি আছে। আমাদের হাতে সময় কম তাই হেঁটে যতোটা পারা যায় সেভাবে এগুচ্ছি। কিছু দূর যাবার পর দেখলাম, কয়েকটি বানর বাদাম খাচ্ছে। সেদিকে ক্যামেরা তাক করতেই ধেয়ে এলো আমার দিকে। কামড়ে ছিঁড়ে নিল জামার কিছু অংশ। আমার মন খারাপ হলেও ভ্রমণ সঙ্গীদের অট্টহাসিতে নন্দনকানন তখন ভরপুর। আমি সাদা বাঘ আর সাপ দেখার ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে ফিরে এলাম অটোতে। কুলফি কিনে খেলাম, তাতে যদি মেজাজ ঠাণ্ডা হয়।

সমুদ্র শহর পুরি

রাতে মন খারাপ নিয়েও ঘুম হলো দুর্দান্ত। সারাদিনের হাঁটাহাঁটিতে ক্লান্ত শরীর জিরিয়ে নিলো ঘুমে।  ভোরে সকালের নাস্তা করবার আগেই পুরির পথে বাস ধরলাম। প্রায় তিন ঘন্টা পর সমুদ্র শহর পুরিতে বাস থামল। আমরা একটা অটো নিয়ে নিলাম। শহরে থাকব না। সমুদ্রের কাছাকাছি কোনো হোটেল দেখতে হবে। নয়তো রাত হলে সাগরের গর্জন শোনা যাবে না। চলতে চলতে একেবারেই শেষ মাথায় চলে এসেছি। সবই চিনেছি ইন্টারনেটের কল্যাণে। আগে থেকে বুকিং ছিল না তাই ভাড়া চাইছে চড়া।  অনেক দরকষাকষির পর একটা হোটেল পেয়ে গেলাম দুই রুমের।বাংলাদেশের কক্সবাজারের মতো এতো আধুনিক হোটেল না হলেও মোটামুটি।

পুরি দেখতে ছবিতে যতো সুন্দর বাস্তবে তার কিছু না; এখানকার সমুদ্র সৈকত যথেষ্ট নোংরা।সারা বছরই পুরিতে লাখ লাখ পর্যটক ঘুরতে আসেন। এদের মধ্যে বাংলাদেশের পর্যটকের সংখ্যাও নেহায়েত কম না।

প্রায় মধ্যরাত অব্দি সাগরের পানিতে হাঁটাহাঁটি করলাম। তারপর খেলাম রূপচাঁদা মাছ ভাজা আর টুনা মাছ। ডাবের পানিও বিক্রি হচ্ছে বেশ। বোঝাই যাচ্ছে পুরো সৈকত একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ শপিং মল। জায়গায় জায়গায় ছোট ছোট মন্দির আছে। কীর্তন শুনতে শুনতে রুমে ফিরলাম।

পরদিন সকালে রিকশা ধরে চলে এসেছি জগন্নাথ মন্দিরে।ফটকের বাইরে আমাকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। এখানে হিন্দু ছাড়া আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না ।তাই বাইরের ছবি নেওয়া ছাড়া আর উপায় নাই। আর আমাকে একা রেখে আমার দাদা মশাইরাও ভেতরে গেলেন না।

আমরা রওনা দিলাম কোনারকের সূর্য মন্দির দেখতে। একটা অটো ভাড়া নিলাম ৭০০ রুপিতে, সারাদিনের জন্য। প্রায় এক ঘন্টার যাত্রা। সমুদ্রের পাশ দিয়ে পিচ ঢালা পথের ওপর চলছে অটো। স্নিগ্ধ বাতাসে বেশ লাগছে আমার। আমাদের কক্সবাজারের রিভার সাইডের অনুভূতি পাচ্ছি যেন। এখানে ততো পাহাড় নেই। যতোটা চোখ যায় কেবল গাছ আর গাছ। সবুজে মোড়ানো একটা চমৎকার বাগানে এসে অটো ভিড়ল।আমাদের নেমে যেতে হবে এখানে। বাকিটা পথ পায়ে হেঁটে পৌঁছে গেলাম কোনারকে। এবারো টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হলো।

কোনারকের সূর্য মন্দির

সেদিন বুঝি ভুবেনশ্বরে সব চাইতে তীব্র গরম পরেছিল।চারদিকে রোদের তেজ পুড়িয়ে দিচ্ছে। কিছু দূরের গাছ দেখতে ঠিক করে তাকানো যাচ্ছে না। এমন আরো কিছুক্ষণ খোলা জায়গায় থাকলে যে কেউ জ্ঞান হারাবে। তাই কোনারক দেখার সিদ্ধান্ত স্থগিত করে বার হবার রাস্তা ধরলাম। এ পথটাও বেশ গোছানো। চারদিকে সবুজ গাছ। কুলফি-ডাব বিক্রি হচ্ছে। দেব-দেবীর মূর্তি, কাঁচের মালা সবই পাওয়া যাচ্ছে। আমারও খুব কিনতে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু মুসলমান বাড়িতে এগুলো রাখলে নির্ঘাত মার খেতে হবে। তাই লোভ সামালে একটা রেস্টুরেন্টে বসে খানিক জিরিয়ে নিলাম। ওখানেই দুপুরের খাবারও শেষ করে নিলাম। এবার যেতে হবে পুরি হয়ে চাঁদিপুর।

চাঁদিপুর সমুদ্রতটে

পুরি থেকে বাসে করে চাঁদিপুর পৌঁছাতে সময় লাগল প্রায় দুই ঘণ্টা। সৈকত এলাকায় আমাদের স্বাগত জানাল এক সারি পাম গাছ। সমুদ্রের জলে পা রেখে আমার এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো। যেন আমার চোখের সামনেই সমুদ্র পিছু হটতে শুরু করল; নিমেষেই পিছিয়ে গেল কয়েক কিলোমিটার। কাঁকড়ার দলের সাথে খেলছে শত শত মানুষ।অলস জেলেরা শুকনো বালিতেই জাল ফেলে রাখল। জল ফিরে এলে আপনা আপনি মাছ এসে ফেঁসে যাবে জালে।  

সমুদ্র এখানে ভীষন শান্ত । সেই সাগরবেলায় ঝিনুক কুড়ানোর দিনে যেন ফিরে যাচ্ছি।খুব নির্জন চারপাশ। তেমন পর্যটকের ভিড় নেই। মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে বুড়িবালাম নদীর তীর। অনেকে বলেন চষাখণ্ড। কোথাও সম্ভবত পড়েছিলাম, এই অংশে বুড়িবালাম গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরে সাথে।

নীলগিরি রাজবাড়ি এবং পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দিরও দেখা হলো এ যাত্রায়। তবে প্রায় ২৪০টি সিঁড়ি বেয়ে আমার পক্ষে উপরে উঠা সম্ভব নয়। আমি তাই দূর থেকে দেখে তৃষ্ণা মেটালাম।

এখনও বাকি চিল্কা হ্রদ

রাতে পুরি ফিরে সমুদ্রের পাশে একটা তারকা হোটেলের লবিতে বসে চা খেতে খেতে পরের দিনের প্ল্যান করলাম। দারিংবাড়ি যদি যেতে হয় তবে ওখানে এক রাত থাকতে হবে; তাই ওই জায়গা বাদ দিলাম ট্যুর প্ল্যান থেকে।বাকি থাকল গোপালপুর সমুদ্র সৈকত আর চিল্কা হ্রদ। আর এখানে যেতে হলে সকাল সকাল বাস ধরে পৌঁছতে হবে ব্রহ্মপুর । সুতরাং রাখো চা, থামাও আড্ডা এবং দাও ঘুম।   

ব্রহ্মপুর সড়ক পথে এবং রেলপথে দুভাবেই যাওয়া যায়।আমরা বাস নিয়েছি। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করবার পর একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাস পেয়েছি। কিন্তু রাস্তার কোথাও কোনো প্রক্ষালন কেন্দ্র পেলাম না।  অনেক দূর চলার পর বাস থামিয়ে ছেলেরা প্রাকৃতিক কাজে লেগে গেল। আর আমাকে অবাক করে দিয়ে মেয়েরাও সেই একই কাজ করল কিছু দূরে খোলা জায়গায় গিয়ে। পাশে বসা অমিত দাদা আমাকে উস্কানি দিলেন, ”তুমিও যাবে নাকি?” আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, ”ছিহ।” দাদা হেসেই খুন, ”ইমার্জেন্সি বলে কথা।” খুব বিরক্ত হয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলাম, ”কোনো পেট্রল পাম্প নেই সামনে?” সে নির্বিকার উত্তর দিল, ”বহরমুর হে।”

ঘন্টা তিনেকের মধ্যে বাস এসে থেমে গেল শহরের বড় রাস্তায় । সিটি হোটেল খুঁজে পেতে আমাদের খুব বেগ পেতে হয়নি। স্থানীয়রাই দেখিয়ে দিল। আমি রুমে ঢুকেই জানালা খুলে দিলাম। এই কাজটা আমি সব জায়গায় করি; স্থানীয় বাতাস নিতে আমার বেশ লাগে। ফ্রেশ হয়ে নিচে নামলাম। ওদের নিজস্ব রেস্তোরাঁ আছে। সেখানেই তিনটা থালি নিলাম। দিল্লিতে থালি খেয়েছিলাম প্রথম। এরপর নেপালে। ওদের থালির সাথে ওড়িশার খাবারে খানিক ভিন্নতা আছে। এদিকটায় দুধ দিয়ে খাবারের প্রচলন বেশি। আমার অম্ল হয় না তাই গোগ্রাসে গিলে নিলাম সবটা।

বেলা পড়ে আসছিল। ঠিক করলাম চিল্কা হ্রদ দেখে সন্ধ্যাবেলা কাটাব গোপালপুর সৈকতে। সেভাবেই স্থানীয় অটো ভাড়া করে নিলাম। এরা একেকজনের কাছ থেকে একেক সময় একেক রকম ভাড়া নেয়। তাই ভাড়া কত ছিল তা উল্লেখ করছি না। হোটেলের ভেতর কাস্টমার কেয়ারে পেয়ে গেলাম শাড়ি পড়া দুজন নারীকে।ওদেরকেও সাথে নিয়ে নিলাম। দারুণ বন্ধুত্ব হয়েছে আমাদের।

দূর থেকে চিল্কা হ্রদের বালি চিক চিক করছিল। রোদ বালিতে পড়তেই আরো বেশি জ্বলে উঠছিল। ইচ্ছে করছিল নৌকা নিয়ে পুরো হ্রদ ঘুরে বেড়াই। কিন্তু পরদিন সকালেই কলকাতা ফেরার টিকিট হয়ে আছে।  যেভাবেই হোক আজকের মধ্যে বাকি জায়গা দেখে নিতে হবে। তাই ফিরতে হলো গোপালপুরে।

ওড়িশায় তিন দিনে সব চাইতে প্রশান্তির সময় কাটিয়েছি গোপালপুরে। সমুদ্রের পানি কতোটা নীল হতে পারে তা গোপালপুর না এলে কোনো দিন জানাই হতো না । এখানকার প্রশাসন নিয়ম করে ঘন্টায় ঘন্টায় সৈকত পরিষ্কার করে। কোথাও কোনো চিপসের প্যাকেট বা টিস্যু ফেলা অবস্থায় পেলাম না।এখানে  আধুনিক প্রক্ষালন কেন্দ্রও আছে। ডুবন্ত সূর্যের হালকা আভায় জেগে ওঠা সমুদ্র যেন বার বার আমাকে ডেকে বলছিল, আরো একটু সময় থাকো আমার কাছে। যান্ত্রিক জীবনে এটুকু সময় পাওয়া তো বড় বেশি কঠিন আজকাল।এখানে যদি আমি সারা রাত বসেও থাকি তবু ক্লান্তি স্পর্শ করবে না। কিন্তু ফিরতে হবে নিজ দেশে। ফিরতে হবে ঢাকায় ।

ফেরার কথা

পরদিন খুব ভোরে আমরা ব্রহ্মপুর রেলস্টেশনে চলে এলাম। জানি না কোথায় কোন ট্রেন এসে থামবে। তবে অপেক্ষা করতে হয়নি বেশিক্ষণ। দশ ঘন্টার লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে বলে খাবার নিয়ে নিলাম। যদিও ট্রেনে খাবার দেওয়া হয়। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ট্রেনে উঠে দেখলাম বহু যাত্রী কেবল ঘুম থেকে উঠেছে। তার মানে এটা সারারাত ধরে ছুটে চলেছে। আমরা ওঠার সাথে সাথে হুইসেল বেজে উঠল। দূর থেকে চিল্কা হ্রদ দেখতে দেখতে মন কেমন দ্রবীভূত হয়ে উঠছিল। আরো একটা দিন যদি পেতাম তবে দারিংবাড়ি দেখে যেতে পারতাম। অনেক আশ্চর্য অনুভূতি প্রাপ্তির সাথে একটু অতৃপ্তি নিয়েই ফিরতে হলো।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক