০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৭ আশ্বিন ১৪৩৩

‘সংবাদকে কোনো দিন বস্তুনিষ্ঠতার বাইরে যেতে দেয়নি তৌফিক’

“বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, এইটা যে কত বড় একটা অর্জন, চিন্তা করা যায় না,” বলেন একসময়ের সহকর্মী আফসান চৌধুরী।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 02 Oct 2026, 11:03 PM

Updated : 02 Oct 2026, 11:17 PM

বাংলাদেশের সংবাদ সেবাকে ডিজিটাল দুনিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার পুরোধা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর হঠাৎ চলে যাওয়ার খবরে শোক বিহ্বল হয়ে পড়েছেন তার বন্ধু ও সাবেক সহকর্মীরা।

তারা বলছেন, নানা ঝড়ঝঞ্ঝার মধ্যেও সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব নিয়ে কখনও আপস করেননি তিনি। ডিজিটাল সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে রীতিমত যুদ্ধ করে গেছেন তিনি। আগাগোড়া সাহসী ও লড়াকু এক সাংবাদিক ছিলেন তিনি।

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার অনেক প্রথমের নেতৃত্ব দেওয়া তৌফিক ইমরোজ খালিদী মারা গেছেন শুক্রবার। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের কারণে বৃহস্পতিবার রাত থেকে লন্ডনের সেইন্ট বার্থোলমিউ’স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা ২টা ২৩ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার বয়স হয়েছিল ৫৯ বছর।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক তৌফিক খালিদীর হঠাৎ মৃত্যুর খবরে শোকে বিহ্বল হয়ে পড়েছেন তার এক সময়ের সহকর্মী মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, সাংবাদিক, কলাম লেখক ও শিক্ষক আফসান চৌধুরী।

তিনি বলেন, “আমার জন্যতো এটা একটা ভয়াবহ রকম সংবাদ। আমারতো বিশ্বাস হয়নি, মানে বিশ্বাস হচ্ছেও না বস্তুত পক্ষে। আমি জানতাম সে অসুস্থ ছিল, চোখের প্রবলেম ছিল, আর কোনো অসুখের কথা আমি জানতামও না।

“তৌফিকের সঙ্গে যে আমার কতদিনের সম্পর্ক বলতে পারব না। সে অনেকদিন। আমি ও তৌফিক একসাথে আমরা বহু জায়গায় কাজ করেছি। আমি যখন বিবিসিতে ছিলাম ও তখন বিবিসিতে ছিল।

“তৌফিক যেভাবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দাঁড় করিয়েছে সেটা আর কারও পক্ষে সম্ভব হতো না এবং সে করেছে। আমি যখন কানাডায় চলে গেলাম, তারপরও আমি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরে লিখে গেছি। তারপরে কানাডা থেকে আমি চলে এলাম ২০১২ সালে এবং আমি প্রথম জয়েন করেছি এক্সিকিউটিভ এডিটর হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে। পরে যখন আমি অন্য জায়গায় চলে যাই তৌফিক একটু খুব দুঃখ পেয়েছিল। কিন্তু কি আর করা আমি তো নানা দিকে ঘুরে বেড়াই।”

আফসান চৌধুরী বলেন, “বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম…এইটা যে কত বড় একটা অর্জন চিন্তা করা যায় না। একসময় হয়তো এটা এককভাবে অনলাইন মিডিয়া হিসেবে ছিল এবং সেই কারণে এটা এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের যে ঐতিহাসিক ভূমিকা, যে আধুনিক এই ডিজিটাল মিডিয়া এইটা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর প্রথম করেছে এবং সফলভাবে করেছে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে একসঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, তৌফিকের যে বড় অর্জন যেটা সেটা হচ্ছে যে এর আগে যারা ছিল তারা কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরকে ওভাবে সামাল দিতে পারেনি।

“তৌফিক এসে সেটা করেছিল, প্রচুর মানুষকে অসংখ্য মানুষকে সে অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছিল। এবং ওই সময় যখন আমি জয়েন করেছিলাম। তখন বহু পরিকল্পনা হচ্ছিল এবং বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তখন মানুষকে ডিজিটাল মিডিয়ায় বোঝানো যেত না। তৌফিক ও আমি গিয়ে বোঝাতাম এবং ক্রমে খুব সফল হয়ে গেছিল।

“কিন্তু যে জিনিসটা হল যে অবশ্যই পরিবর্তন হয়, অবস্থা পাল্টায়, রাজনীতির একটা বিষয়ই আছে। কিন্তু তবুও আজকেও আমি মনে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য। আমি কোনো নিউজ এখনও, আজও এত বছর পরেও যদি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর-এ না হয়, আমি অন্য জায়গায় এটা বিশ্বাস করতে পারি না।

“কারণ যে জিনিসটা করতে পেরেছিল অনেকটাই, সেটা হচ্ছে এই নৈবক্তিকভাবে নিউজ করা- এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা অন্যরা পারে না। অন্যরা পার্টিসিপেন্ট হয়ে যায়, অংশীদার হয়ে যায় নিউজের ভালো-মন্দের মধ্যে। কিন্তু বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের নিউজ মেকিংটা সবসময় অবজেক্টিভ ছিল।”

তার মৃত্যুতে শোক জানিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, “খুবই খারাপ লাগছে। এইটা শোনার পর থেকে। তার পত্রিকার বর্ষপূর্তি এবং পহেলা বৈশাখে দল, মত নির্বিশেষে সব মানুষের এক হওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে বেশি মিস করবো। কারণ তাকে আর দেখা যাবে না।

“তৌফিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইংরেজি বিভাগের অ্যালামনাইয়ের সেক্রেটারি ছিলেন, উনার অনুরোধ আমি সভাপতির দায়িত্ব নিয়েছিলাম।”

তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব মাহবুবা ফারজানা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সহপাঠী। সরকারের এই সচিব বলেন, “আমার ভীষণ মনখারাপ হয়েছে। সে আমরা ক্লাসমেট, ওর সাথে পড়েছি সাত বছর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একদম একই ক্লাসে আমরা পড়তাম, আমার ক্লাসমেট এবং সে অত্যন্ত ট্যালেন্টেড ছিল। সেই ট্যালেন্টটা তার আগেই, ছাত্রজীবনেই। এরকম ট্যালেন্ট ছিল।

“আমরা খুব ভালো ব্যাচমেট ছিলাম। অনেক সময় দেখা যেত যে, একসাথে আলোচনা করে পরীক্ষা দিতাম, পড়াশোনা করতাম। তাকে পড়াশোনা করতে বলতাম, যে তুমি বইটা নিয়ে বসো। অনেক সময় বলতাম।“

তথ্য সচিব বলেন, “মাঝখানে যখন লন্ডন থেকে ফিরল, আমি ওকে বলতাম তুমি কী করবা? তুমি এত এত মেধানী অর্থাৎ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম করার আগে। তখন আমি বলতাম, তুমি যে আসলা বিবিসি থেকে, তুমি এখন কি করবা? তোমার তো একটা জায়গায় যাওয়া উচিত। তো বলে আমি জানি না কী করব। তো যাই হোক সে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম যখন করল, তখন আমার খুব ভালো লেগেছে। সে একটা জায়গায় গেল। মানে আমার খুব তখন ভালো লাগত।”

তৌফিক ইমরোজের এই সহপাঠী বলেন, “তারপর সচিব হওয়ার পরে তো তার সাথে আমার যোগাযোগটা আরও বাড়লো। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমি যাই, সে আমাকে অত্যন্ত সম্মান করত, অত্যন্ত। বন্ধু হিসেবে খুব ভালো একটা বন্ধু ছিল। একটা বন্ধু হারালাম এবং আসলে খুব ট্যালেন্টেড সাংবাদিক ব্যক্তিত্ব হারালাম। আল্লাহ যেন তাকে বেহেশ নসিব করেন। আসলেই আমরা তাকে মিস করব।”

বিবিসিতে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর সাবেক সহকর্মী ও অন্তর্বর্তী সরকারের গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ ফেইসবুকে লিখেছেন, “লন্ডনে গতকাল হঠাৎ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর আজ কিছুক্ষণ আগে তৌফিকের চলে যাওয়ার খবর পেলাম। মনটা খুবই খারাপ হলো।…

“অনেকদিন ধরেই তার শরীরে নানারকম রোগ বাসা বাঁধতে শুরু করেছিল। সম্ভবত গত পয়লা বৈশাখে ওর বাসাতেই আমার সঙ্গে শেষ দেখা। ফিনানান্সিয়াল এক্সপ্রেস আর বিবিসিতে একসঙ্গে কাজ করার বহু স্মৃতি এখন চোখে ভাসছে। ঢাকায় তৌফিকের পরিবার বলতে তার প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিক ও সহকর্মীরা। তাদের সবার প্রতি শোক ও সমবেদনা জানাই। তৌফিকের আত্মার শান্তি কামনা করি।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদীর আকস্মিক প্রয়াণে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য মুশতাক হোসেন গভীর শোক প্রকাশ করে তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির সময় থেকে শুরু করে বিবিসিতে সাক্ষাৎকার দেওয়া এবং পরবর্তীতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে নিয়মিত যোগাযোগের কথা তিনি স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, “তৌফিক অনলাইন সাংবাদিকতাকে একটি মানসম্মত ও প্রতিশ্রুতিশীল জায়গায় নিয়ে গেছেন। প্রায় বন্ধ হতে যাওয়া বিডিনিউজকে তিল তিল করে গড়ে তুলে আন্তর্জাতিক মানের একটি নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে রূপান্তর করেছিলেন।

“দ্রুত বা চটকদার খবর না দিয়ে কিছুটা দেরিতে হলেও শতভাগ যাচাই করা সত্য খবর প্রকাশ করাই ছিল বিডিনিউজের মূল নীতি, যেন কোনো খবর ভুল প্রমাণিত হয়ে তা প্রত্যাহার করতে না হয়। এমনকি টেলিভিশনের অনুমোদন পাওয়ার সুযোগ থাকার পরেও দুর্নীতির গন্ধ পেয়ে তৌফিক সেদিকে পা বাড়াননি।”

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিডিনিউজের সহকর্মীরা এই শোক কাটিয়ে উঠে এই বস্তুনিষ্ঠ ধারা বজায় রাখবেন এবং তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদানের কথা বর্তমান প্রজন্মের কাছে তুলে ধরবেন।