২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৭ কার্তিক ১৪৩৩

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ২০ বছর: পথিকৃতের প্রয়াণে হরিষে বিষাদ

২০ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে কর্মীদের কণ্ঠে থাকছে খালিদীর দেখানো পথে এগিয়ে চলার প্রত্যয়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের ২০ বছর: পথিকৃতের প্রয়াণে হরিষে বিষাদ

তৌফিক ইমরোজ খালিদী। এআইয়ের সহায়তা নিয়ে সম্পাদিত ছবি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 23 Oct 2026, 01:04 AM

Updated : 23 Oct 2026, 01:04 AM

দফায় দফায় বৈঠক করে প্রাথমিক পরিকল্পনা সাজিয়ে ফেলা হয়েছিল। স্মরণিকা তৈরি আর অনুষ্ঠানের নকশা চূড়ান্ত করার কাজ চলছিল পুরোদমে। তৌফিক ইমরোজ খালিদী এ আয়োজনের মোটো ঠিক করেছিলেন: ‘অগ্রণী, স্বাধীন, নির্ভীক— ২০ বছর পেরিয়ে!’

বাংলাদেশের সংবাদসেবাকে ডিজিটাল দুনিয়ায় পৌঁছে দেওয়া বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের বিংশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী শুক্রবার। কিন্তু বিশেষ এই মাইলফলক উদযাপনের প্রস্তুতির মধ্যে মাত্র ২১ দিন আগে প্রধান সম্পাদক খালিদী চলে গেছেন না ফেরার দেশে।

সঙ্গত কারণেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বড় আয়োজন পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। পথিকৃতের জীবনাবসানে উদযাপনের লগ্নে মিশেছে শোকের আবহ।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম পরিবার দিনটি ‘পালন’ করতে যাচ্ছে একেবারেই ঘরোয়া পরিসরে। ২০ বছর পূর্তির এই মাহেন্দ্রক্ষণে কর্মীদের কণ্ঠে থাকছে খালিদীর দেখানো পথে এগিয়ে চলার প্রত্যয়।

খালিদীর বিদায়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক হিসাবে দায়িত্ব নেওয়া বিশ্বদীপ দাশ বলেন, “প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই ক্ষণটি তৌফিক ভাইয়ের জন্য হতে পারত এক পরম গর্বের বিষয়। কিন্তু বাংলাদেশের ডিজিটাল সাংবাদিকতার এই দিকপালকে ছাড়াই আজ আমরা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০ বছর পূর্তি উদযাপন করছি।”

Image

তৌফিক ইমরোজ খালিদী, তার প্রিয় বার্তাকক্ষে।

বাংলাদেশের আধুনিক সংবাদসেবার ইতিহাসে অনেক প্রথমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নাম। তার নেতৃত্বেই দুই দশক আগে রচিত হয়েছিল এক ইতিহাস।

শুরুটা হয়েছিল ২০০৫ সালের প্রথমার্ধে। অন্যান্য বার্তা সংস্থার মত ‘বিডিনিউজ’ তখন সংবাদ মাধ্যমগুলোর জন্য খবর সরবরাহ করত। দেশের অন্য সংবাদ সংস্থাগুলো টেলিপ্রিন্টারে খবর সরবরাহ করলেও বিডিনিউজ এ কাজটি শুরু করে ইন্টারনেটের মাধ্যমে।

২০০৬ সালে বার্তা সংস্থাটির মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা বদলের পর এর খোল-নলচে বদলে যায়। ওই বছর জুলাই মাস সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদীর নেতৃত্বে নতুন ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এ সংবাদমাধ্যমকে দেশের প্রথম ডটকম কোম্পানির রূপ দেয়।

২৩ অক্টোবর নতুন আঙ্গিকে শুরু হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২৪ ঘণ্টার পথচলা। বাংলাদেশে ডিজিটাল সংবাদ যুগের সূচনা তখনই।

২০ বছরের পথচলায় সংবাদের মোড়কে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম কার্যত ইতিহাস গ্রন্থনার কাজটিই করে গেছে। নিত্য নতুন উদ্ভাবনে উন্মোচন করে গেছে নতুন নতুন সংবাদ সেবা, যে পথ ধরে পরে এগিয়ে এসেছে আরো অনেকে।

সময়ের উদ্ভাবনী মেজাজকে ধারণ করে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ওয়েবসাইটে যুক্ত হয়েছে ‘মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট’। মোবাইল ফোনে সংবাদ সেবা, ইংরেজি ও বাংলায় ব্রেকিং নিউজ ও নিউজ অ্যালার্ট সেবায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমই বাংলাদেশে পথিকৃৎ। সব বয়সী, সব রুচির পাঠকের জন্যই বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ডিজিটাল মাধ্যমে তৈরি করেছে আলাদা আলাদা ক্ষেত্র।

সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমেও পাঠক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সঙ্গে পেয়েছে সর্বক্ষণ। কোটির বেশি মানুষ এখন ফেইসবুকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের সঙ্গে আছেন।

Image

২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ১৯ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে তখনকার বিএনপি মহাসচিব, বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অতিথিদের নিয়ে কেক কাটেন প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

এত সব প্রথমের জন্ম দেওয়াকে নয়, বরং সাংবাদিকতার মানদণ্ডে অবিচল থাকাকে নিজের মূল গর্বের জায়গা হিসাবে দেখতেন প্রধান সম্পাদক খালিদী।

‘সবার আগে নির্ভুল খবর’ দেওয়ার মন্ত্র নিয়ে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে চালিত করেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

প্রয়াত প্রধান সম্পাদককে স্মরণ করে বিশ্বদীপ দাশ বলেন, “তৌফিক ভাই ছিলেন একজন তুখোড় সাংবাদিক, যিনি অর্থনৈতিক নীতির জটিলতা থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক জীবনের সূক্ষ্মতা—সবখানেই ছিলেন সমান সাবলীল। তার জানার আগ্রহ ছিল বহুমুখী। তিনি যখন যে বিষয়ে মনোযোগ দিয়েছেন, সেখানেই তার তীব্র একাগ্রতা ও সূক্ষ্ম দৃষ্টির ছাপ রেখেছেন; পাশাপাশি পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকদের পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।”

বাংলাদেশের সংবাদসেবায় তৌফিক ইমরোজ খালিদীর অবদান তুলে ধরতে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান সম্পাদক বলেন, “তৌফিক ভাই তার সময়ের চেয়ে ঠিক কতটা এগিয়ে ছিলেন, তা হয়ত অনেকেই ভুলে যান। সংবাদপত্র পড়ার ক্ষেত্রে সাধারণ বাংলাদেশিদের জন্য ব্যয় ও বিতরণ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের যে প্রতিবন্ধকতা ছিল, তা ভাঙতে ইন্টারনেটের বিপুল সম্ভাবনাকে তিনি ঠিকই অনুধাবন করেছিলেন।

“২০০৬ সালে, যখন খুব কম মানুষ অনলাইন সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে পেরেছিল, তিনি তখন দেশের প্রথম সার্বক্ষণিক অনলাইন সংবাদমাধ্যম হিসেবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নবযাত্রার সূচনা করেন।”

তিনি বলেন, বাংলাদেশে ইন্টারনেট যখন দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠল, তখন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমও দেশের সবচেয়ে বেশি পঠিত ওয়েবসাইটগুলোর একটিতে পরিণত হল। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদসেবাকে আরও বিস্তৃত পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে লক্ষ্য তার ছিল, এর মধ্য দিয়ে তা বাস্তব রূপ পেতে থাকল।

Image

২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ‘রক্তরেখায় বাংলাদেশ–অন্তহীন যুদ্ধ: গৌরব, বেদনা আর শিকড়ের ইতিহাস’ সংকলনের প্রথম খণ্ডের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে অতিথিদের সঙ্গে তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

পাঠকের জন্য ২৪ ঘণ্টা দেশ-বিদেশের সর্বশেষ ঘটনার খবর বাংলা ও ইংরেজি–দুই ভাষায় বিনামূল্যে পড়ার সুযোগ নিয়ে আসা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এই পথচলা সবসময় মসৃণ ছিল না।

এক ব্যবসায়ীর মামলা ও বিচার নিয়ে প্রকাশিত পুরোনো খবর সরাতে রাজি না হওয়ার কারণে ডজন ডজন মামলার মুখে পড়েও মাথা নোয়ায়নি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।

প্রভাবশালী একটি মহল রুষ্ট হয়েছিল, তাই প্রধান সম্পাদক খালিদীকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় পাঁচ বছর ধরে হয়রানি করা হয়।

চব্বিশের অগাস্টে বাংলাদেশে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পরে ওই বছরের সেপ্টেম্বরে প্রধান সম্পাদক তৌফিক খালিদীর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার হয়।

একজন সেনাপ্রধানের ভাইয়ের সবার জানা পরিচয় সংবাদ প্রতিবেদনে লেখায় ২০১৮ সালে অবৈধ হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ওয়েবসাইট বন্ধ রাখা হয় কয়েক ঘণ্টা।

পরে আরেক চক্রের ইন্ধনে এমন পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছিল, যে ২০২৩ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ওয়েবসাইট এক মাস বন্ধ থাকে।

তবে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম বন্ধ হয়ে যায়নি, পুরনো গৌরব নিয়েই ফিরে এসেছে নতুন উদ্যামে।

Image

২০১৬ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ১০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানে প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী।

এই পথচলায় ‘গল্প-গুজবভিত্তিক’ প্রতিবেদনের বিপরীতে সঠিক সূত্রের ভিত্তিতে বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার নতুন ধারা তৈরিতে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ভূমিকার কথা সবসময় বলতেন খালিদী।

অষ্টাদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে তিনি বলেছিলেন, “আমার মনে হয় যে, গত ১৮ বছরে আমাদের যে ইতিহাস, সেটা বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, বিভিন্ন কারণে। এটা আমাদের সহকর্মীরা বিভিন্ন সময় বলেছেন।

“বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় বস্তুনিষ্ঠতা, গভীরভাবে ঢুকিয়ে দেওয়ার কাজটা আমরা করতে পেরেছি। চাইলেই এখন কেউ গল্প-গুজবভিত্তিক প্রতিবেদন করতে পারে না। এক সময় বাংলাদেশে রাজনৈতিক প্রতিবেদন মানেই ছিল, যাচ্ছেতাই গল্প। আমরা যখন সূত্র উল্লেখ করে লেখা শুরু করলাম। সেটা রিপোর্টারদের জন্য কঠিন হয়ে গেছে, যা ইচ্ছা লিখে ছেপে দেওয়া।”

২৩ অক্টোবর বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল। প্রধান সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালিদী নিজে সব পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। সেই প্রস্তুতিতে ছেদ টেনে ২ অক্টোবর মাত্র ৫৯ বছর বয়সেই চিরবিদায় নিলেন তিনি।

Image

গত ১০ অক্টোবর বনানীর ওল্ড ডিওএইচএস খেলার মাঠে জানাজার আগে তৌফিক ইমরোজ খালিদীর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়।

বিশ্বদীপ দাশ বলেন, “বাংলাদেশের সাংবাদিকতাকে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবিত করে আসা প্রাতিষ্ঠানিক চাপগুলোর বড় একটি অংশ তৌফিক ভাই নিজেই সামলে নিতেন। যতটা সম্ভব, আশপাশের সহকর্মীদের তিনি সেই চাপ থেকে আড়াল করে রাখতেন। এসবের মধ্য দিয়েই তিনি এমন একটি বার্তাকক্ষ গড়ে তোলার কাজ চালিয়ে গেছেন, যার মানদণ্ড তার অবর্তমানেও সগৌরবে টিকে থাকবে।”

তিনি বলেন, “তার তৈরি করে দেওয়া সেই অবস্থান পুনরুদ্ধার করা এখন আমাদের দায়িত্ব। এর অর্থ হল, তার মূল্যবোধের কেন্দ্রে থাকা সাংবাদিকতার মানদণ্ড সমুন্নত রেখে পরিবর্তনশীল বাস্তবতার মধ্যেও মানুষের কাছে পৌঁছানো, সাংবাদিক হিসেবে তাদের জন্য কাজ করার নতুন উপায় খুঁজে বের করা। সেই দায়িত্ব এখন আমাদের কাঁধে।”