পাহাড়ে পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের নামে দুই গ্রাম `উচ্ছেদ’ বন্ধের দাবি

“আমরা কেউ উন্নয়নের বিরোধী নই, পর্যটনের বিরোধী নই। কিন্তু পর্যটনের নামে যদি আমাদের উচ্ছেদ করা হয়, আমরা সেই উন্নয়নের বিরোধী।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 21 March 2024, 04:12 PM
Updated : 21 March 2024, 04:12 PM

পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের নামে রাঙ্গামাটির জুড়াছড়ি ও বিলাইছড়ি সীমান্তবর্তী গাছবাগানপাড়া ও থুমপাড়া `উচ্ছেদ’ প্রক্রিয়া বন্ধের দাবি জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের পক্ষে ছাত্র—যুব সংগঠনগুলো।

বৃহস্পতিবার বিকেলে শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের সামনে এক প্রতিবাদ সমাবেশ থেকে এ দাবি জানানো হয়। সমাবেশে শেষে শাহবাগ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্য পর্যন্ত মিছিল করেন সংগঠনগুলোর কর্মীরা।

প্রতিবাদ সমাবেশে বলা হয়, পর্যটন কেন্দ্র স্থাপনের উদ্দেশ্যে ‘জোর-জবরদস্তিমূলকভাবে’ সেখানে দুই গ্রামের অধিবাসীদের উচ্ছেদের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুটি গ্রামের জুম্ম অধিবাসীদে জীবিকার প্রধান অবলম্বন জুমচাষে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। 

সমাবেশে মারমা স্টুডেন্টস কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক অং শোয়ে সিং মারমা বলেন, “আমরা কেউ উন্নয়নের বিরোধী নই, পর্যটনের বিরোধী নই। কিন্তু পর্যটনের নামে যদি আমাদের উচ্ছেদ করা হয়, আমরা সেই উন্নয়নের বিরোধী।”

পাহাড় থেকে অস্থায়ী সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা এবং পার্বত্য শান্তি চুক্তি অনুযায়ী ভূমি ব্যবস্থাপনা জেলা পরিষদের কাছে হস্তান্তর করার দাবি জানান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি জগদীশ চাকমা বলেন, “পাহাড়িদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে উন্নয়ন করাকে আমরা উন্নয়ন হিসেবে দেখি না।”

প্রগতিশীল সকল ছাত্র সমাজকে লড়াই—সংগ্রামে থাকার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন ঢাকা মহানগর শাখার সভাপতি দনওয়াই ম্রো বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রামে দীর্ঘকাল ধরে নিপীড়ন—নির্যাতন করে আসছে দেশের শাসকগোষ্ঠী। আদিবাসীদের জীবনমানের ওপর সবসময় আঘাত হানা হয়। উন্নয়নের নামে পাহাড়িদের উপর রোলার কোস্টার চালানো হচ্ছে।”

পার্বত্য চুক্তি অনুযায়ী জেলা পরিষদের প্রকল্পগুলোতে পাহাড়িদের অংশগ্রহণ নিশ্চিতের দাবি জানান তিনি।

বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরামের সহ—সভাপতি টনি চিরান বলেন, “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন করা হয় নাই। একটি বিশেষ গোষ্ঠীর ইন্ধনে আজ পাহাড়ে ধর্ষণ, নিপীড়ন, গুম চলমান রাখা হয়েছে। তা যদি বন্ধ না হয় পাহাড়—সমতলের রাজপথে আমরা সংগ্রাম জারি রাখব।”

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন সমাবেশে বলেন, যে কোনো উন্নয়ন ওহতে হবে জনবান্ধব।

“সাজেকের লুসাইদের উচ্ছেদ করা হয়েছে, চিম্বুক পাহাড়ে ম্রোদের উচ্ছেদ করার প্রক্রিয়া করা হয়েছিল। আমরা তা বন্ধ করতে পেরেছি। এক ধরনের ব্যবসায়িক গোষ্ঠী লুট করে যাচ্ছে, আর সরকার তা করার জন্য সহযোগিতা প্রদান করবে তা আমরা হতে দেব না।”

ছাত্র মৈত্রীর সভাপতি অতুলন দাস আলো বলেন, “সমতলে যখন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা সরকার করে। কিন্তু পাহাড়ের বিষয়টা অন্যরকম। যেমন খুশি তেমন সাজো একটা অবস্থা। কিন্তু পাহাড়ে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া তো হয় না। উল্টো রাতের বেলা বিশেষ বাহিনীকে পাঠিয়ে পাহাড়িদের ঘুম করে দেওয়া হয়। একটি রাষ্ট্রে দুই নীতি হতে পারে না।”

বাংলাদেশ যুব ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম নানু বলেন, “২৬ বছরেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত হয়নি। পাহাড়ে ভূমি বেদখল বন্ধ হয় নাই, পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি নিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর হয় নাই।

“সীমান্ত সড়ক বানানোর জন্য কেন গ্রামের পর গ্রাম উচ্ছেদ করা হবে। এইভাবে উচ্ছেদ করতে থাকলে পাহাড়িরা কোথায় যাবে?”

সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ যুব মৈত্রীর সভাপতি তৌহিদুর রহমান তৌহিদ বলেন, “বাংলাদেশের আদিবাসীদের সমান অধিকার দিতে হবে। কাপ্তাই বাঁধের মাধ্যমে পাহাড়িদের উদ্বাস্তু করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মাধ্যমে সেসকল উদ্বাস্তুদের পনর্বাসনের কথা বলা হলেও দিন শেষে পার্বত্য চুক্তি এখনও বাস্তবায়ন করা হয় নাই। 

“পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করা হলেও কমিশনের বিধিমালা প্রণয়ন করা হয় না। পর্যটন প্রক্রিয়ায় আদিবাসীদের রাখতে হবে। ইকো ট্যুরিজম নিশ্চিত করতে হবে। যে দুটি গ্রাম উচ্ছেদ করে পর্যটন করার অপচেষ্টা করা হচ্ছে তা বন্ধ করে গ্রামবাসীদের নিরাপত্তা প্রদান করতে হবে।”

সমাবেশ থেকে আট দফা দাবি জানানো হয়—

  • পর্যটনের নামে আদিবাসীদের উচ্ছেদ বন্ধ করা।

  • পর্যটনের নামে ভূমি বেদখল বন্ধ করা।

  • গ্রামবাসীদের নিরাপত্তা বিধান করা।

  • গ্রাম ত্যাগ করার নির্দেশ প্রত্যাহার করা।

  • গ্রাম সংলগ্ন পর্যটন স্থাপন না করা।

  • জুম চাষে কোনো বাধা প্রদান না করা।

  • সীমান্ত সড়ক প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারদের ক্ষতিপূরণ প্রদান করা।

  • পার্বত্য চুক্তি মোতাবেক অবিলম্বে জেলা পরিষদের নিকট পর্যটন খাতকে হস্তান্তর করা।

পিসিপি ঢাকা মহানগর শাখার সাংগঠনিক সভাপতি রুবেল চাকমার সঞ্চালনায় সমাবেশে জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি গৌতম শীল, হিল উইমেন্স ফেডারেশন ঢাকা মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক রিয়া চাকমা বক্তব্য দেন।