৩০ অক্টোবর ২০২৬, ১৫ কার্তিক ১৪৩৩

তাহসিফের পরিচয় শনাক্তে যেভাবে কাজে দেয় তার ফোন

“তদন্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থে ফোনটি উদ্ধারের পর থেকে কীভাবে সংরক্ষণ, পরিচালনা ও পরীক্ষা করা হয়েছে; তার যথাযথ ডকুমেন্টেশন এবং চেইন অব কাস্টডি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।”

নাজমুল হাসান সাগর

Published : 30 Oct 2026, 06:46 PM

Updated : 30 Oct 2026, 06:46 PM

মৃতদেহের সঙ্গে উদ্ধার করা হয় একটি মানিব্যাগ, হাতঘড়ি ও বন্ধ আইফোন। উদ্ধার হওয়া মরদেহটির নাম-পরিচয় তখনও অজানা। নৌ পুলিশ পরিচয় শনাক্তে তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছিল। আর তখনই মুশকিল আসান ঘটায় আইফোনটি।

ওয়াটারপ্রুফ ফোনটি চার্জে লাগানোর পর সচল হয়। এরপর ফোনটিতে একটি কল আসে। অপর প্রান্তে যিনি ছিলেন, তিনি নিজেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহের এক স্বজন বলে পরিচয় দেন।

তার সঙ্গে কথা বলেই উদ্ধারকারী পুলিশ সদস্যরা নিশ্চিত হন, নদ থেকে উদ্ধার হওয়া মরদেহটি বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির।

লাশ উদ্ধারের পর তাহসিফের পরিচয় শনাক্তের ঘটনা এভাবেই বর্ণনা করলেন টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফোনটি চার্জে লাগানোর একটু পরে যখন সচল হয়, তখন প্রথম কলটিই দেয় তার একজন রিলেটিভ।

“তার সঙ্গে কথা বলার পর আমরা ভিক্টিমের পরিচিয় নিশ্চিত হতে পারি। অবশ্য তার ফোনের ওয়ালপেপারের নিজের ছবি রেখেছিলেন তিনি।”

বুধবার বিকালে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে বিমান বাহিনীর সাবেক ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তাহসিফ সাউরির লাশ উদ্ধার করে টঙ্গী নৌ পুলিশ ফাঁড়ি।

মরদেহ উদ্ধারের পরেই নৌ পুলিশের টঙ্গী ফাঁড়ির ইনচার্জ ফিরোজ উদ্দিন বলেন, জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ খবর পেয়ে বিমান বাহিনীর সাবেক ওই কর্মকর্তার লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

“আমরা তার লাশ ভাসমান অবস্থায় পাই। তার কাছে একটা মোবাইল ফোন ছিল। সেটির মাধ্যমে আমরা তার পরিচয় শনাক্ত করি।”

এ আইফোন দিয়ে কি টনার রাতে তাহসিফের চলাচলসহ অন্যান্য কার্যকলাপের হদিশ পাওয়া সম্ভব? আইফোন মৃত্যুরহস্য উন্মোচনে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে?

এ বিষয়ে সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কৌঁসুলি তানভীর হাসান জোহা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ফোন চার্জ দিয়ে চালু করে পরিচয় শনাক্ত করার বিষয়টি তদন্তের একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে পরিচয় শনাক্তকরণ এবং পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ফরেনসিক পরীক্ষা দুটি ভিন্ন বিষয়।

“উদ্ধারকৃত আইফোনটির যথাযথ ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে কল হিস্ট্রি, সম্ভাব্য লোকেশন ডেটা, যোগাযোগের তথ্য, অ্যাপ অ্যাক্টিভিটি এবং সংশ্লিষ্ট ক্লাউড অ্যাকাউন্ট থেকে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব তথ্য ঘটনার আগের সময়ের একটি ডিজিটাল টাইমলাইন তৈরিতে সহায়ক হতে পারে। তবে ফোনটির প্রযুক্তিগত অবস্থা, তথ্যের প্রাপ্যতা এবং ফরেনসিক পরীক্ষার সীমাবদ্ধতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।”

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, “আমার মতে, তদন্তের স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বার্থে ফোনটি উদ্ধারের পর থেকে কীভাবে সংরক্ষণ, পরিচালনা ও পরীক্ষা করা হয়েছে; তার যথাযথ ডকুমেন্টেশন এবং চেইন অব কাস্টডি নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ।

“এখানে কারও তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে আগাম প্রশ্ন তোলা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সর্বোপরি, ডিজিটাল ফরেনসিক ফলাফল, ময়নাতদন্ত, সিসিটিভি, টেলিকমিউনিকেশন রেকর্ড এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক আলামতের সমন্বিত বিশ্লেষণই একটি নির্ভরযোগ্য তদন্তে সহায়ক হতে পারে।”

তাহসিফের ‘বন্ধুস্থানীয় ছোটভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপকে নিয়ে শুক্রবার দুপুরে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকা পরিদর্শন করেছেন পিবিআই কর্মকর্তারা। ‘মাদকস্পট’ হিসেবে পরিচিত এলাকাটি থেকে সকালে থেকে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়, যেটি তাহসিফের বলেই মনে করছেন পিবিআই কর্মকর্তারা।

পিবিআই ঢাকা মেট্রোর (উত্তর) অতিরিক্ত ডিআইজি এনায়েত হোসেন মান্নান বলেন, “দীপ বলছে, তাদের পুলিশের পোশাক পরা কেউ ধাওয়া দিয়েছে। কে ধাওয়া দিল, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

“তারা মাদকাসক্ত ছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের পর জানা যাবে। দীপ অনেক কিছু বলেছে, আমরা সব কিছু যাচাই-বাছাই করছি।”