হাতিরঝিলে এখন দম নেওয়া দায়

কেবল বৃষ্টির পানি আসার কথা থাকলেও পানি নিষ্কাশন লাইন হয়ে পয়োবর্জ্য পড়ছে হাতিরঝিলে।

ওবায়দুর মাসুম, জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদকবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 26 July 2022, 07:13 PM
Updated : 26 July 2022, 07:13 PM

বাসাবাড়ির পয়োবর্জ্য, শিল্পের বর্জ্য আর কারওয়ান বাজারের মাছ আড়তের পানি ঢুকে সয়লাব হয়েছে হাতিরঝিল; আর তাতে দম নেওয়া কঠিন ঠেকছে ঢাকার অন্যতম এ বিনোদন কেন্দ্রে।

এসব পানি পয়োনিষ্কাশন নালা হয়ে শোধনাগারে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের জন্য সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসার স্টর্ম স্যুয়ার লাইন হয়ে বর্জ্য চলে আসছে হাতিরঝিলে। ফলে নোংরা হচ্ছে হাতিরঝিল, পরিবেশ দূষণ হয়ে বাড়ছে দুর্গন্ধ।

দূষণের মাত্রা এতটাই যে হাতিরঝিলের পানি শোধনের যন্ত্রও এ অতি নোংরা পানি শোধন করতে পারছে না বলে জানাচ্ছে রাজউক। ছড়িয়ে পড়া উৎকট গন্ধে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন হাতিরঝিলের আশপাশের এলাকার বাসিন্দা এবং হাতিরঝিলের নৌযানে করে চলাচলকারী যাত্রীরা। আর যান্ত্রিক জীবনে প্রশান্তির হাওয়া খেতে মানুষরাও পড়ছেন বিড়ম্বনায়।

হাতিরঝিল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রামপুরা, গুলশান, মহানগর প্রকল্পের কাছে ঝিলের পানি সবুজাভ। পানিতে তেমন দুর্গন্ধ নেই। তবে মধুবাগ, এফডিসির সামনের অংশ, দিলু রোড এবং সোনারগাঁও হোটেলের মাঝখানের অংশের পানি কুচকুচে কালো; তীব্র দুর্গন্ধ।

ইস্কাটনের বিয়াম গলির বাসিন্দা আকরাম হোসেন একটা টং দোকান চালান ভেঙে ফেলা বিজিএমইএ ভবনের সামনে। আকরাম বলছিলেন, প্রায় সারাবছরই এই পানিতে দুর্গন্ধ থাকে।

“যখন সেনাবাহিনী আছিল তহন এমুন দুর্গন্ধ দেহি নাই। তারা চইল্লা যাওনের পর পানির অবস্থা খারাপ হয়্যা গ্যাছে। বৃষ্টি হইলে দুর্গন্ধ কিছুডা কমে। কিন্তু এইবার বৃষ্টিও কম হইতাছে, গন্ধ বেশি।”

রাজধানীর বাড্ডার বাসিন্দা আহমেদ হোসেনের অফিস কারওয়ান বাজারে। হাতিরঝিলে চলাচলকারী বোটে যাতায়াত করেন তিনি।

তিক্ততার কথা বলতে গিয়ে আহমেদ হোসেন বলেন, “এফডিসির সামনে থেকে বোটে উঠি। বোটে যেতে সময় কম লাগে, ঝক্কি নেই। কিন্তু পানিতে চরম দুর্গন্ধ, পেট ফুলে আসে। ওদিকটায় আবার তেমন গন্ধ নাই।”

পানিতে কেন দুর্গন্ধ

ঢাকা শহরের বৃষ্টির পানি প্রথমে গিয়ে পড়ে সিটি করপোরেশনের নালায়। তা থেকে সেই পানি ঢাকা ওয়াসার নিষ্কাশন নালা হয়ে নদী, খাল বা লেইকে পড়ে। আর বাসবাড়ির গৃহস্থালির বর্জ্য, মনুষ্য বর্জ্য ঢাকা ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইন হয়ে চলে যাওয়ার কথা শোধনাগারে।

তবে রাজধানীর বেশিরভাগ এলাকায় স্যুয়ারেজ লাইন না থাকায় পয়োবর্জ্যের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে পানি নিষ্কাশন লাইনে। হাতিরঝিলে কেবল বৃষ্টির পানি আসার কথা থাকলেও পানি নিষ্কাশন লাইন হয়ে এসব বর্জ্য চলে আসছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানিয়েছে, তেজগাঁও, মহাখালী, পান্থপথ, কারওয়ান বাজার, কাঁঠালবাগান, মধুবাগ, নিকেতনসহ কয়েকটি এলাকার বৃষ্টির পানি ১১টি পয়েন্ট হয়ে হাতিরঝিলে পড়ে। হাতিরঝিলের এসব স্থানে এসএসডিএস (সলিড স্যুয়ারেজ ডাইভারশন স্ট্রাকচার) নির্মাণ করা হয়েছে।

রাজউক বলছে, সবচেয়ে বেশি পানি আসে সোনারগাঁও হোটেলের পেছনে পান্থপথের দিক থেকে আসা বক্স কালভার্ট হয়ে। এ বক্সকালভার্ট হয়ে পানিতে বেশি দূষিত হচ্ছে হাতিরঝিলের পানি। এছাড়া কারওয়ান বাজার, দিলু রোড, এফডিসির সামনের অংশ, মধুবাগ দিয়ে আসা পানিতে বেশি দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।

স্যুয়ারেজের বর্জ্য যেন হাতিরঝিলে না পড়ে, সেজন্য হাতিরঝিল প্রকল্পের দুপাশ ঘেঁষে দুটি লাইন চলে গেছে। প্রতিটি লাইনে ছয় ফুট ব্যাসের দুটি করে পাইপ বসানো হয়েছে। একটি লাইন সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশ থেকে দিলুরোড, মধুবাগ, মহানগর প্রজেক্ট হয়ে রামপুরা এবং আরেকটি পাইপলাইন নিকেতন থেকে পুলিশ প্লাজা হয়ে রামপুরা পর্যন্ত গেছে। বিভিন্ন এলাকার পয়োবর্জ্য সংযোগ এই দুটি পাইপলাইনের মাধ্যমে রামপুরা হয়ে দাসেরকান্দিতে ঢাকা ওয়াসার পয়োশোধনাগারে চলে যাওয়ার কথা।

তবে দাসেরকান্দির ওই শোধনাগার এখনও চালু হয়নি। ফলে পয়োবর্জ্য চলে আসছে হাতিরঝিলে।

রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (অব.) সামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাতিরঝিল প্রকল্পের আওতায় পাইপ লাইন নির্মাণ হলেও দাসেরকান্দিতে এখনও সংযোগ দেওয়া যায়নি। আর বৃষ্টির পানি আসার নালায়ও নোংরা পানি চলে আসছে।

“সবচেয়ে বেশি পানি আসে বক্সকালভার্ট হয়ে। সোনারগাঁওয়ের কাছ দিয়ে সবচেয়ে বেশি দূষিত, গন্ধযুক্ত পানি আসে। কারওয়ান বাজার এলাকার পানিও আসে। ওই পানির সঙ্গে আসে মাছের আড়তের পানিও। ফলে দুর্গন্ধ বেশি হয়।”

মেজর সামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, হাতিরঝিলে এখন যত পানি আসছে তা আসার কথা ছিল না। অতিরিক্ত পানি শোধন করা যাচ্ছে না।

“এটা যখন ডিজাইন করা হয়েছিল, তখন এত স্যুয়ারেজ বা স্টর্ম ওয়াটার আসার কথা ছিল না। অনেক বেশি পানি ছাড়ছে, যা শোধন করা যাচ্ছে না। দুর্গন্ধযুক্ত পানি বেশি আসছে বক্সকালভার্ট হয়ে।

“ফলে হাতিরঝিলের সোনারগাঁও হোটেলের পেছনের অংশ, দিলু রোড এবং এফডিসির সামনের অংশ, মধুবাগ অংশের পানিতে দুর্গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। ওই পানিটাই আবার রামপুরা যেতে যেতে প্রাকৃতিকভাবেও কিছুটা শোধন হচ্ছে, দুর্গন্ধ কমে যাচ্ছে।”

বৃহস্পতিবার রাজউকে ‘হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের পানি নিষ্কাশনের জন্য মেইন ডাইভারশন স্যুয়ার লাইন এবং লোকাল ডাইভারশন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ’ সংক্রান্ত সভা হয়েছে। সেখানে ঢাকা ওয়াসা, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, ঢাকা মহানগর পুলিশ এবং বুয়েটের প্রতিনিধিরা ছিলেন।

বৈঠকের আলোচ্য বিষয় নিয়ে মেজর সামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, স্যুয়ারেজ লাইন এবং স্টর্মস্যুয়ার লাইনের অতিরিক্ত ময়লা মিশ্রিতি পানি হাতিরঝিলে আসার বিষয়টি ওয়াসার প্রতিনিধি এবং সিটি করপোরেশনের প্রতিনিধিরাও বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

“সমস্যা সমাধানে করণীয় কী, কার দায়িত্ব কী- সেসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওয়াসাকে তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টি বলা হয়েছে।”

জানতে চাইলে ঢাকা ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী কামরুল হাসান বৃহস্পতিবার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ঢাকা শহরের পানি শোধন করার জন্য দাসেরকান্দি শোধনাগার করা হয়েছে। ওই শোধনাগার পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হলে সব এলাকার পানি সেখানে নিয়ে যাওয়া হবে। হাতিরঝিলে আর পানি যাবে না।

মাস তিনেকের মধ্যে ওই শোধনাগার চালু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. আতিকুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, পানি নিষ্কাশনের ড্রেনে অনেক বাড়ির মালিক অবৈধভাগে স্যুয়ারেজ বর্জ্যের সংযোগ দিয়েছেন। এসব বন্ধে কাজ করছে ডিএনসিসি। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে রাজধানীর অভিজাত এলাকায় অভিযান শুরু করবে ডিএনসিসি।

“আমরা পানি নিষ্কাশনের নালা তৈরি করেছি বৃষ্টির পানি যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেখানে অবৈধভাবে এসব (পয়োবর্জ্য, শিল্পবর্জ্য) সংযোগ দেওয়ায় সেগুলো খাল, লেইকে গিয়ে পড়ছে। কিন্তু আমি এভাবে চলতে দেব না।

“ইতিমধ্যে গুলশান, বনানী, বারিধারার বাড়ি মালিকদের বলা হয়েছে, সোক ওয়েল এবং সেপটিক ট্যাংক তৈরির জন্য। ওইসব এলাকায় আমরা ১ সেপ্টেম্বর থেকে অভিযানে যাব, না পেলে জরিমানা করা হবে। পর্যায়ক্রমে ঢাকার অন্যান্য এলাকায়ও করা হবে।”

২০০৭ সালে হাতিরঝিল সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়, যা শেষ হয়েছে ২০১৯ সালে। এ পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি টাকা।

৩১১ একর জমি নিয়ে গড়ে তোলা দৃষ্টিনন্দন এ পুরো স্থাপনা ২০২১ সালের ৩০ জুন রাজউককে বুঝিয়ে দেয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক