০২ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান: হকাররা দোকানও বসায়নি, সরেও যায়নি

“আওয়ামী লীগ বলত, আমরা বিএনপি করি। এখন বিএনপি বলছে, আমরা আওয়ামী লীগ করি; এটা কেমন কথা,” বলেন মিজানুর নামে এক হকার।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 01 Oct 2026, 11:37 PM

Updated : 01 Oct 2026, 11:37 PM

উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে সংঘর্ষের পরের দিন মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর এলাকার ফুটপাতে দোকান না বসালেও আশপাশে আনাগোনা দেখা গেছে হকারদের।

তারা মূলত পুলিশের গতিবিধিসহ পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করছেন। পরিস্থিতি ঠিকঠাক মনে হলে আবার ফুটপাতে দোকান বসানোর পরিকল্পনা আছে তাদের।

বৃহস্পতিবার গোলচত্বর ও আশাপাশের এলাকায় পুলিশ সদস্যদের টহল দিতে দেখা গেছে। সড়কের দুই পাশ থেকে জিনিসপত্র সরানোর কাজ করতে দেখা গেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) কর্মীদের।

আগের দিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুরে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালায় ডিএনসিসি। মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে যাওয়া সড়কে এ অভিযান চলে। এর মধ্যে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচের দোকান সরানোর সময় ভেকুর আঘাতে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন ধরে যায়।

আগুন লাগার পর পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। একদিক থেকে হকাররা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। অন্যদিকে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ।

সংঘর্ষের সময় তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের গাড়ি, ভেকু ও কয়েকটি বাসে ভাঙচুরও চলে। সাংবাদিকদের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত চারটি মামলায় ২৫ জনকে গ্রেপ্তার করার তথ্য দিয়েছে পুলিশ।

ঘটনার পরের দিন দুপুর ১টায় ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাত প্রায় ফাঁকা। মেট্রোরেল স্টেশনের আশপাশে এবং কয়েকটি পয়েন্টে পুলিশের উপস্থিতি ছিল।

ফুটপাত ধরে কিছুটা সামনে এগোলে দু-একজন হকারকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেলেও তাদের স্থায়ীভাবে চৌকি পেতে বা পণ্য সাজিয়ে বসতে দেখা যায়নি।

হকাররা কেউ স্থায়ীভাবে বসছেন না, আবার পুরোপুরি সরেও যাননি। পুলিশের গতিবিধির দিকে নজর রাখছেন।

নীরব মিয়া নামে এক হকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বসি নাই ওইভাবে। আপাতত আছি আরকি। যতক্ষণ দাঁড়ানো যায়। পুলিশের গন্ধ পেলেই দৌড়।”

মুড়ি বিক্রেতা কাওসার মিয়ার সামনেও স্থায়ী দোকানের ব্যবস্থা দেখা যায়নি। তিনি বলেন, “সামনে লোক আছে। পুলিশ আসতে দেখলে খবর দিবে। তবু যদি রক্ষা না হয়, মাইর খাওয়া লাগবে আরকি।”

পিঠা বিক্রেতা শফিক বলেন, “পেটের দায় বড় দায়। যতটা সম্ভব সাবধানে থাকি। মানুষের সমস্যা না কইরা চলার চেষ্টা করি। এরপর যদি ধরা খাই, জেল-জুলুম হয়, ওইটা আল্লাহ বুঝবে।”

ইমরান নামে এক পুলিশ সদস্য বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ এদিকে কোনো গণ্ডগোল হয়নি। এখানে রুটিন ডিউটির পাশাপাশি আলাদাভাবে ৫০ থেকে ৬০ জন পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।”

ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কার করছে ডিএনসিসি

মিরপুর-১০ নম্বর থেকে মিরপুর-১৪ যাওয়ার দিকে এগোলে আগের দিনের অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেট চোখে পড়ে।

এই এলাকাতেও স্বাভাবিক ব্যবসা-বাণিজ্যের চিত্র দেখা যায়নি। সেখানে পোড়া ও ক্ষতিগ্রস্ত অংশের ধ্বংসাবশেষ সরাতে ব্যস্ত ছিলেন সিটি করপোরেশনের কর্মীরা।

বিকাল ৩টার দিকে কথা হয় পরিচ্ছন্নতাকর্মী লাল মিয়ার সঙ্গে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমাদের সাফ করতে বলা হইছে। কাজ প্রায় শেষের দিকে।”

ডিএনসিসির পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শক তুষার চন্দ্র দাস বলেন, “আমাদের কর্মীরা ভোর ৫টা থেকে পরিচ্ছন্নতার কাজ শুরু করেছে। ৯০ শতাংশ কাজ শেষ। বাকিটুকু আগামীকালের মধ্যে অবশ্যই শেষ হবে।”

ফুটপাতের কোথাও কোথাও এখনও দোকানের চৌকি থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, “হকাররা যদি সরিয়ে না নেয়, আমরা ওগুলো তুলে নিয়ে ফেলে দিতে বাধ্য হব।”

পথচারীদের স্বস্তি ও শঙ্কা

ফুটপাত ফাঁকা থাকায় স্বস্তির কথা শুনিয়েছেন কয়েকজন পথচারী। তবে এই পরিস্থিতি কতদিন থাকবে, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তারা।

তানিয়া আহম্মেদ নামে এক নারী বলেন, “ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারলে গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লাগার ভয় থাকে না। তবে এটা যেন কয়েক দিনের জন্য না হয়। সবসময় এরকম ফুটপাত চাই।”

আরেক পথচারী গাউসুর রহমান বলেন, “গতকাল যা হয়েছে, সেটা খুবই খারাপ। সাধারণ মানুষ তো আর এসবের মধ্যে পড়তে চায় না। আমরা শুধু শান্তিতে পথ চলতে চাই।”

সমুদ্র চৌধুরীর চোখে ফাঁকা ফুটপাত স্বস্তির হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তিনি বলেন, “আজ ফুটপাত ফাঁকাই দেখা যাচ্ছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে এমন থাকবে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। আর শুধু এই এলাকা হকারমুক্ত হবে? পথচারীবান্ধব নগরব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হলে সমগ্র ঢাকা ফুটপাতমুক্ত করতে হবে।”

শুধু পুলিশ মোতায়েন করে ফুটপাত কতদিন ফাঁকা রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন পথচারী আবু জাফর খলিফা।

তিনি বলেন, “পুলিশ পাহারা দিয়ে কয়দিন ফাঁকা রাখা যাবে? কয়দিন পর এত পুলিশ আর থাকবে না। যে কয়জন থাকবে, তারা যে কম্প্রোমাইজ করে ফেলবে না, তার নিশ্চয়তা কী? স্থায়ী সমাধান ছাড়া এগুলো সবই হবে নাটকের অংশ।”

হকারদের ভাষ্য ও অভিযোগ

বুধবারের সংঘর্ষের পর পুলিশি হয়রানি হওয়ার অভিযোগ তুলেছেন কোনো কোনো হকার। তারা বলছেন, হামলায় যারা জড়িত ছিল, পুলিশ চাইলে সিসিটিভি ভিডিও বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্ত করতে পারে।

মিরপুর-১০ এলাকার হকার মিজানুর রহমান বলেন, “এখন আমরা ১০ নম্বরের (বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেট) বিষয়ে কেউ কিছু জানি না, ওদিকে যাচ্ছিও না। আমাদের কথা হলো ভিডিওতে যাদের অপরাধী হিসেবে পাওয়া যায়, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু এখন তো ঘরে বসে থাক হকারদেরও ধরা হচ্ছে।”

বুধবারের সংঘর্ষের পেছনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হাত রয়েছে বলে দাবি করেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।

তবে হকারদের তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।

মিজানুর বলেন, “আমরা কী করব, আমাদের তো কিছু করার নেই। আওয়ামী লীগ যখন ছিল, তখন বলত আমরা বিএনপি করি। এখন বিএনপি বলছে, আমরা আওয়ামী লীগ। এটা কেমন কথা? আমরা যদি রাজনীতি বা কোনো দলের সঙ্গে জড়িত থাকতাম, তাহলে কি ফুটপাতে দোকানদারি করতাম?”

তিনি বলেন, “আগে কামাল মজুমদার বলেছিলেন, ‘ফুটপাতের লোকজন বিএনপি।’ এখন মিল্টন ভাই বলছেন, ফুটপাতের সবাই আওয়ামী লীগ, স্বৈরাচার।”

এদিকে হকারদের নিজেদের মধ্যেও ফুটপাতের জায়গা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা সমস্যার কথা শোনা যায়।

নাম প্রকাশ না করে আরেক হকার বলেন, “ফুটপাতে কে বসবে, কে বসবে না, এটা আমরা নিজেরা ঠিক করতে পারি না। অনেক সময় জায়গা নিয়ে ঝামেলা লাগে, আবার নতুন প্রভাবশালীদের কথায় নতুন লোক বসে। আমরা যারা ছোট ব্যবসা করি, তারা এসবের মধ্যে বিপদে পড়ি।”

তিনি বলেন, “উচ্ছেদ হইলে আমাদের মালামাল যায়, মামলা হইলেও আমাদেরই ভয়। কিন্তু যারা জায়গা নিয়ন্ত্রণ করে, তাদের কিচ্ছু হয় না। চান্দার টাকাও আমরা দেই, মাইরটাও আমরাই খাই।”

৪ মামলায় গ্রেপ্তার ২৫

মিরপুর মডেল থানায় দায়ের করা তিনটি মামলায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ২৫ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছেন ওসি হাফিজুর রহমান।

সংঘর্ষের ঘটনায় মিরপুর মডেল থানায় হওয়া তিনটি মামলার মধ্যে দুটির বাদী পুলিশ এবং একটি করেছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

এসব মামলায় মোট ১৭ জনের নাম রয়েছে। অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে। এসব পুলিশের ওপর হামলা, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের গাড়ি ও ট্রাফিক পুলিশ বক্স ভাঙচুর, সিটি করপোরেশনের গাড়িতে অগ্নিসংযোগ এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধনের অভিযোগ আনা হয়েছে।

আরেকটি মামলা হয়েছে গাড়ি পোড়ানোর; কাফরুল থানায় করা মামলার বাদীও ডিএনসিসি। এ মামলায় অজ্ঞাত ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে। তবে ওই মামলায় এখনও কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।

ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার বলেন, "আমরা এটা নিয়ে কাজ করছি।"

আরও পড়ুন

মিরপুরে সংঘর্ষের নেপথ্যে ‘অগ্নিকাণ্ড’ দেখছে হকাররা, ডিএনসিসি দেখছে ‘ফ্যাসিস্ট’

মিরপুরে হকার উচ্ছেদ অভিযান: সিটি করপোরেশনের তিন গাড়িতে আগুন

মিরপুর সংঘর্ষের ঘটনায় সমন্বয়ের অভাব ছিল: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী