২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৭ কার্তিক ১৪৩৩

এখনও হাঁটা যাচ্ছে মিরপুরের ফুটপাতে

তবে কিছু জায়গায় নতুন করে কিছু হকারকে বসতে দেখা যাচ্ছে, এটা সময়ের ব্যবধানে বাড়ে কিনা, সেই শঙ্কার কথা শুনিয়েছেন পথচারীরা।

এখনও হাঁটা যাচ্ছে মিরপুরের ফুটপাতে

হকার উচ্ছেদের পর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার ফুটপাতে গাছ লাগানো হয়েছে, বসানো হয়েছে ডাস্টবিন।

সাখাওয়াত সুপন কৌশিক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 22 Oct 2026, 08:55 AM

Updated : 22 Oct 2026, 08:55 AM

মিরপুর ১০ নম্বর গোল চত্বর এলাকার ফুটপাতের বেশির ভাগ অংশ এখনও হকারমুক্ত আছে।

উচ্ছেদ অভিযানের পর কোথাও কোথাও গাছ লাগিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি); বসানো হয়েছে ডাস্টবিন।

উচ্ছেদ অভিযানের ২০ দিন পর এসে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে, তাতে পথচারীরা এখনও স্বস্তির কথাই শুনিয়েছেন।

অস্বস্তি যতটুকু, সেটা হলো, কিছু কিছু জায়গায় নতুন করে কিছু হকারকে বসতে দেখা গেছে। এটা সময়ের ব্যবধানে বাড়বে কিনা, সেই শঙ্কার কথা শুনিয়েছেন পথচারীরা।

যারা সুযোগ পেলে দোকান বসাচ্ছেন, তারা বলছেন, এভাবে দোকান বসানোটা যে অবৈধ, সেটা তারা জানেন। কিন্তু সামনে আয়ের আর কোনো বিকল্প নেই।

Image

উচ্ছেদ অভিযানের ২০ দিনের মাথায় এসে মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার কোথাও কোথাও ফুটপাতে দুয়েকটি করে দোকান বসতে শুরু করেছে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুরে ফুটপাতের অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)।

মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে হোপ মার্কেটের দিকে যাওয়া সড়কে এ অভিযান চলে। এর মধ্যে বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটের নিচের দোকান সরানোর সময় ভেকুর আঘাতে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে আগুন ধরে যায়।

আগুন লাগার পর পুলিশ ও সিটি করপোরেশনের কর্মীদের সঙ্গে হকারদের সংঘর্ষ বাধে। একদিক থেকে হকাররা ইটপাটকেল ছুড়তে থাকে। অন্যদিকে কাঁদুনে গ্যাস নিক্ষেপ করে পুলিশ।

সংঘর্ষের সময় সিটি করপোরেশনের তিনটি ময়লার গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। পুলিশের গাড়ি, ভেকু ও কয়েকটি বাসে ভাঙচুরও চলে। সাংবাদিকদের ওপরও হামলার অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনায় চারটি মামলায় বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করে পুলিশ।

এ ঘটনার ১৮ দিনের মাথায় রোববার (১৮ অক্টোবর) মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ফুটপাতের বড় অংশ এখনও ফাঁকা; আগের মতো হকারদের পসরা নেই। নির্বিঘ্নে হাঁটতে পারছেন পথচারীরা।

Image

মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় গত ৩০ সেপ্টেম্বর হকার উচ্ছেদের দিন সিটি করপোরেশনের তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়।

উচ্ছেদ অভিযানের আগে মিরপুর ১০ গোলচত্বর, হোপ মার্কেটের সামনের ফুটপাত ও আশপাশের সড়কের বিভিন্ন অংশেও হকাররা বসতেন।

রোববার হোপ মার্কেট-সংলগ্ন সড়কের প্রবেশমুখের কয়েকটি স্থানে নারী হকারদের বসতে দেখা যাচ্ছে। আর গোলচত্বরে কয়েকজনকে দেখা গেছে ফেরি করে পণ্য বিক্রি করতে।

শিহাব উদ্দিন নামে এক পথচারী বলেন, “আগে ফুটপাত দিয়ে হাঁটার জায়গা পাওয়া যেত না। দোকানের কারণে মূল সড়কে নেমে হাঁটতে হতো। এখন অনেকটা স্বস্তিতে চলাচল করা যাচ্ছে। কিন্তু আবার যদি হকাররা বসতে শুরু করেন, তাহলে আগের সমস্যাই দেখা দেবে।”

আরেক পথচারী রাইমা তানজিলা বলেন, “ফুটপাত মানুষের হাঁটার জায়গা। এটা খালি থাকলে সবাই উপকার পায়। শুধু উচ্ছেদ করলেই হবে না, নিয়মিত নজরদারিও রাখতে হবে। অলরেডি দেখতে পাচ্ছি অনেক হকার এদিক-সেদিক বসার চেষ্টা করছেন।”

ফুটপাতের পাশে গাছ লাগানো ও ডাস্টবিন বসানোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কাজী মুস্তাফিজুর রহমান নামে এক পথচারী।

তিনি বলেন, “ফুটপাত পরিষ্কার থাকলে হাঁটতে ভালো লাগে। গাছ লাগানো হয়েছে, ডাস্টবিনও দেওয়া হয়েছে। গাছগুলো বড় হলে পরিবেশটাই বদলে যাবে।”

‘কই যামু, খামু কী?’

ফুটপাতের জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি নন অনেক হকার। তাদের একজন শিল্পী বেগম; যিনি ১৭ বছর ধরে মিরপুর-১০ নম্বরে ফুটপাতে কাপড় বেচার কথা বলেছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “এই খানেই জীবন পার করলাম। পেট তো চলে না বাবা। কই যামু? মারলে মারবো।”

তার সঙ্গে থাকা আরেক নারী বলেন, “সবসময় বসি না। সুযোগ পাইলে আইসা বসি। পুলিশ ধাওয়া দিলে চইলা যাই।”

Image

ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ অভিযানের ২০ দিন পর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার চিত্র।

রাবেয়া নামে এক নারী বলেন, “এই দুনিয়ায় আমার কেও নাই। কে কইরা খাওয়াইবো? এইখানে বইতে না দিলে আমি খামু কী?”

সড়কের ধারে দাঁড়িয়ে চিপস বিক্রি করা আহম্মদ বলেন, “আমরা তো গাড়ি নিয়ে বসি না। এক জায়গায় বসেও থাকি না। এখন এখানে বসলাম, ১০ মিনিট পর অন্য জায়গাতে যাব।”

তবে হকারদের সবাইকে দরিদ্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করে নিজেকে মিরপুর-১০ ফাহাদ মার্কেটের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “খোঁজ নিয়ে দেখুন, এদের (হকার) কেও গরিব না। স্যুট-টাই পরে যারা অফিস করেন, এদের বেশির ভাগই তাদের অনেকের চেয়ে বেশি আয় করে মাসে।”

Image

অভিযানের দিন মিরপুরের বায়তুল কুদ্দুস জামে মসজিদ মার্কেটে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে আগুন ধরে যায়।

উপার্জন বন্ধ অনেক হকারের

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) মিরপুর এলাকার ২০২ জন হকারকে ডিজিটাল পরিচয়পত্র বা ‘হকার কার্ড’ দিয়েছিল। তাদের একজন মিজানুর রহমান।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "অভিযানের আগের দিন ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকার মাল ঢুকাইসি। মাল সব অচল পইড়া আছে ঘরে। আমার মাল ওরা নিতে পারে নাই। অনেক হকারের ৩/৪ লাখ টাকার মাল নিয়ে গেছে। আমি এখন হাওলাত করে চলতেছি। আমার ৩টা বাচ্চা, ওদের নিয়ে এখন বাঁচবো ক্যামনে?"

অভিযান ঘিরে সংঘর্ষের ঘটনায় যে চারটি মামলা হয়েছে, তার তিনটি মিরপুর মডেল থানায়; আরেকটি হয়েছে কাফরুল থানায়।

মিরপুর মডেল থানার তিনটি মামলার দুটিতে বাদী হয়েছে পুলিশ; আরেকটির বাদী ডিএনসিসি।

এছাড়া গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে কাফরুল থানায় যে মামলাটি হয়েছে, সেটার বাদীও ডিএনসিসি। এসব মামলায় নামে-বেনামে ৪০০ থেকে ৫০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

নতুন করে দোকান বসালে এসব মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হতে পারে, এমন ভয়ও আছে হকারদের মধ্যে।

মিজানুর রহমান বলেন, “অনেকে টুকটাক জিনিস নিয়ে এদিক-সেদিক বসার চেষ্টা করেন। আমার কাপড়ের ব্যবসা হওয়াতে আমি সেটাও করতে পারি না। আর পুলিশ তো ধরলেই সব মামলায় নাম পড়বে একসঙ্গে।"

ফুটপাতের পরিস্থিতি নিয়ে মিরপুর-১০ সার্কেলে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশের সদস্য আইয়ুব আলী বলেন, “বসে না। মাঝেমাঝে এদিক সেদিক বসে। আমরা কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।”

Image

ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ অভিযানের ২০ দিন পর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার চিত্র।

পরিকল্পনা ও নজরদারি

বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকজন হকার এখনও বসার চেষ্টা করছে জানালে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর আবদুর রাজ্জাক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এ সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ওখানে চারজন লোক রাখা আছে। আমি আরেকবার চেক করে নিব।”

সামগ্রিক হকার নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে তিনি বলেন, “সামনে আরও কিছু টার্গেট আছে, কিন্তু হকারদের দিকেও তাকাতে হবে। সব জায়গা থেকে বিতাড়িত করলে ওদের জীবিকানির্বাহ হবে কীভাবে? পরিকল্পনামাফিক আমরা সিদ্ধান্ত নেব।”

এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “নগরবাসীর জন্য ভালো হয়, এমন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে সিটি করপোরেশন।”

হকার উচ্ছেদ কার্যক্রমের পরবর্তী পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “অবশ্যই নগরবাসীর জন্য যেটা ভালো, সেটা করা হবে। এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নাই। এই প্ল্যান ডেফিনেটলি আছে। এটা দেখতেই পাচ্ছেন। কার্যক্রম চলবে ইনশাল্লাহ।”

তবে হকারদের পক্ষ থেকে ভিন্ন প্রস্তুতির কথা বলেছেন বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়নের সভাপতি আবুল হাশেম কবির।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, "মিরপুর ১০ নম্বরে হকাররা দ্রুত একসঙ্গে বসে একটা সিদ্ধান্ত নিলে আমরা ওখানে একটা প্রোগ্রাম করব। এরপর ওদের নিয়ে ডিএনসিসি প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেব। এরপর পরিস্থিতি বুঝে বাকি চিন্তা।"

Image

ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ অভিযানের ২০ দিন পর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার চিত্র।

ফুটপাত ‘হকারপথ’ নয়

মিরপুর-১০ এলাকার ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের উদ্যোগকে সঠিক পদক্ষেপ মনে করছেন দেখছেন নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান।

তবে এ সাফল্য ধরে রাখতে পরিকল্পনা তুলে ধরা, নজরদারি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সম্পৃক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “রাষ্ট্রের যদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে এবং জনগণের জন্য ভালো কিছু করার আগ্রহ থাকে, রাষ্ট্রের পক্ষে যেকোনো ভালো কাজ করা সম্ভব। গত ১৫-২০ বছর ধরে হকারদের যে বাড়াবাড়ি হয়েছে, তাতে আমরা ভুলেই গিয়েছি যে ফুটপাতগুলো হাঁটার জন্য।

“ঢাকা শহরের দারিদ্র্যের সমাধান ফুটপাতে হকার বসানো নয়, বাংলাদেশের সব দরিদ্র লোককে ঢাকার ফুটপাত ধারণ করতে পারবে না। কারণ এর নাম ফুটপাত, হকারপথ না।”

উচ্ছেদ হওয়া হকারদের সবাইকে একইভাবে বিবেচনার বিপক্ষে মত দিয়ে এই পরিকল্পনাবিদ বলেন, “ডিএনসিসির ক্ষেত্রে তাদের পুরো এলাকা নিয়ে হকারদের বিষয়ে কী পরিকল্পনা, সেটাও আস্তে আস্তে সবার সামনে তুলে ধরা উচিত। এ পর্যন্ত যা হয়েছে, তা ডিএনসিসির জন্য আশাব্যঞ্জক হতে পারে। চাইলে এটাকে তারা ধরে রাখতে পারে; এটা শুধু সাময়িক সাফল্য নয়, ধরে রাখাও সম্ভব।”

Image

ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ অভিযানের ২০ দিন পর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকার চিত্র।

সাফল্য ধরে রাখতে শুধু পুলিশি নজরদারির ওপর নির্ভর না করে এলাকার নিয়মিত ও বৈধ দোকানদারদের সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন আদিল মুহাম্মদ।

তিনি বলেন, “কমিউনিটি বা আশপাশের যারা নিয়মিত দোকানদার, তাদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারলে আমার মনে হয় যে বিষয়টাকে টেকসই করা সম্ভব।”

ফুটপাত দখলমুক্ত রাখার বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “হকারদের যারাই আসতে চায়, তাদেরকে কোনোভাবেই প্রধান সড়কগুলোতে, যেখানে আমরা ফুটপাতগুলো ফেরত এনেছি, এসব জায়গাতে অ্যালাউ করার সুযোগ নাই।”

হকারদের জন্য সরকারের বিকল্প পরিকল্পনা থাকতে পারে, তবে সে কারণে ফুটপাত দখলের সুযোগ দেওয়া উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।

তার ভাষায়, “সরকারের ফিলোসফিতে থাকা উচিত যে, ফুটপাত হচ্ছে পায়ে হাঁটার পথ, হকারদের জন্য নয়। দরিদ্র হকারদের সহায়তায় সরকারের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বা ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি কাজে লাগানো যেতে পারে।”